ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়। ১০০০ বছরেরও বেশি পুরনো শহর। ৮০ লক্ষ মানুষের সেই শহরের মূল কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত ‘মারকিউর’ হোটেল। গত মাসের (জুলাই) ৭ তারিখের অপরাহ্ন। হোটেলের ৩০২ নম্বর রুমে ব্যাগ-ব্যাগেজ রেখে যতটা দ্রুত সম্ভব বাথরুম-গোসল সেরে নিচের ডাইনিং রুমে এসে বসলাম। দীর্ঘ বিমান যাত্রার ক্লান্তি ইতোমধ্যে বেশ কিছুটা দূর হয়েছে। ডাইনিং রুমে যারা রয়েছেন তাদেরকে খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে দেখলাম। একজন ওয়েট্রেস এসে জেনে গেলো কি খাবো। সামান্য কথাবার্তাও হলো তার সাথে। চেয়ারে হেলান দিয়ে পাশের বড় কাঁচের দেয়ালের ভেতর দিয়ে তাকালাম বাইরের রাস্তাঘাট ও দৃশ্যপটের দিকে। আমার চোখ, কান, নাকসহ ইন্দ্রিয় শক্তির সবটুকু সহযোগে গিলে খাওয়ার মতো করে অনুভব করতে চেষ্টা করলাম বিপ্লবী চেতনা-জাগানিয়া ‘ভিয়েতনাম, আমার ভিয়েতনাম’-এর অস্তিত্বকে। এটিই হলো আমার প্রথম ভিয়েতনাম দর্শন।
কাঁচের দেয়ালের ওপাশেই হোটেল সংলগ্ন পেভমেন্টে ইউরোপীয় (ফরাসী) কায়দায় ক্যানপী ধরনের বড় ছাতার নিচে ছোট ছোট র্যাট আইরনের গোলটেবিল ঘিরে বৃত্তাকারে সাজানো হালকা চেয়ারে বসে কয়েকজন মানুষ গল্প করতে করতে ডাইনিং রুম থেকে এনে স্যুপ, বিয়ার, চা-কফি খাচ্ছে। তাদের মধ্যে দু’চারজন বিদেশিও আছে। তার পাশেই বড় রাস্তা। রাস্তা খুব বেশি চওড়া নয়। রাস্তার দু’পাশের ফুটপাথ ধরে মৃদু-মন্দ গতিতে হেঁটে চলেছে মানুষজন। সব মানুষই হালকা-পাতলা গড়নের। তাদের চোখেমুখে সহজ-সরল ও নরম ভাবের প্রকাশ। অনেক মেয়ের মাথায় অতি পরিচিত পরিষ্কার ছনের ভিয়েতনামী মাথাল। কয়েকজন আবার কাঁধে ভার ঝুলিয়ে ফল-মূল, শাক-সবজি ও অন্যান্য সামগ্রীর সওদা নিয়ে ফেরী করে বেড়াচ্ছে। ফুটপাথের পাশে ৩০/৪০ গজ দূরে দূরে পরপর সব ছোট ছোট খাওয়ার দোকান। সেখানে ছোট টেবিলের পাশে নিচু টুলে বসে খোলা রাস্তায় কিছু মানুষ দুপুরের খাওয়া সেরে নিচ্ছে, বা ধীরে ধীরে চা পান করে চলেছে।
চৌরাস্তার একেবারে কোণায় দু’পাশে বিস্তৃত আমাদের হোটেলটি একটি পুরনো স্টাইলের ১০ তলা বিল্ডিং। রাস্তা বরাবর দু’ধারেই সবুজ গাছের সারি। মৃদু বাতাস বইছে একটানা। মেঘাবৃত আকাশ থেকে হালকা রোদ্দুর এসে মায়াবী সোনালী আভা ছড়িয়ে দিয়েছে চারিদিকে। সব দিকের রাস্তা দিয়ে গাড়ি আসা-যাওয়া করছে অনবরত। গাড়ির চেয়ে মোটরবাইকের সংখ্যাই বেশি। কখনো কখনো গাড়ি বা মোটরবাইক এসে থামছে, তা থেকে মানুষ নামছে বা তাতে উঠে বসে রওনা হচ্ছে। শহরের জীবন চলছে বাধাহীন তীব্র গতিতে, অথচ কোনো কিছুতেই কোনোরকম তাড়াহুড়ো, হট্টোগোল বা উত্তেজনা নেই। চতুর্দিকে নিঃশব্দতার আবহ। গোটা পরিবেশে একটি ছিমছাম স্বপ্নময় মফস্বলের আমেজ।
হ্যানয় আমাকে আজ ভরিয়ে তুললো স্নিগ্ধ প্রশান্তির অনুভূতিতে। ভিয়েতনামের এরূপ ছবি আমার কল্পনায় ছিল না। ভাবলাম, এই তবে আমার তারুণ্যের বিপ্লব-স্পন্দিত চেতনার সেই বীরত্বের স্পর্ধিত রণাঙ্গনের বর্তমান রূপান্তরিত নতুন চেহারা! বীর প্রসবিনী রক্তাক্ত ভিয়েতনাম কি তবে আজ যুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছে? নাকি, সে লিপ্ত আজ নতুন আরেক ধরনের যুদ্ধে?
ভিয়েতনাম নামের সাথে যুক্ত হয়ে আমাদের চোখে ভেসে উঠতো যে ছবি তা হলো— নাপাম বোমার আগুন, অগ্নিদগ্ধ মাই লাই গ্রাম ও পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে তার উলঙ্গ শিশু-কন্যার দু’হাত ছড়িয়ে বাঁচার জন্য ছুটে চলা, মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে ভিয়েত কং গেরিলাদের গুলি করে হত্যা করা, বি-৫২ মার্কিন বোমারু বিমানের কার্পেট-বোম্বিং, আদিগন্ত ধান-ক্ষেত ও গ্রাম-গ্রামান্তর জুড়ে এজেন্ট-অরেঞ্জসহ রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে উর্বর জমিকে বিষাক্ত করে তোলা—আর এসবের মাঝেই বীর গেরিলা যোদ্ধাদের একের পর এক অকুতোভয় বিজয়ী অভিযান, রাইফেল কাঁধে কৃষকের জমি চাষ করা, ক্ষেতের আইলে স্থাপন করা বিমান বিধ্বংসী এ্যাক-এ্যাক গান, পথে পথে বুবী-ট্র্যাপ, পাহাড়ে-জঙ্গলে গেরিলা ক্যাম্প, অস্ত্র ও গেরিলা যাতায়াতের জন্য দুর্ভেদ্য সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক, কাঁধে বহন করা ভারে সবজির নিচে রাইফেল-গ্রেনেডের সাপ্লাই ইত্যাদি। প্রবল শক্তিধর সুপার পাওয়ার আমেরিকা ও তার সর্বাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত সেনাবাহিনী-মেরিনবাহিনীর বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া মাছ-ভাত খাওয়া, হালকা-পাতলা গড়নের, সরল-শান্ত প্রকৃতির মানুষের দুর্ধর্ষ সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠতো ভিয়েতনাম নামের সাথে। সে দুর্ধর্ষ গেরিলা যোদ্ধার দেশের প্রতিচ্ছবি আজ আর নেই। ভিন্নতর এক মায়াবী প্রশান্তির চেহারায় ভিয়েতনাম আজ আমার সামনে উন্মোচিত হলো।
ভিয়েতনামের দু’টি পরিচয়ই সত্য। দু’টোই তার গর্বিত অর্জন। ভিয়েতনাম ও ইন্দো-চীনের অন্যান্য দেশকে (লাওস, কাম্পুচিয়া) ৪ দশকের বেশি সময় ধরে ঔপনিবেশিক শাসন ও সাম্রাজ্যবাদী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম চালাতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে প্রাণ গেছে লক্ষ লক্ষ মানুষের। নেমে এসেছে ধ্বংসের মহাপ্রলয়। শুধু ভিয়েতনামের উপরে যে পরিমাণ বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে তা গোটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জুড়ে পৃথিবীব্যাপী ব্যবহূত বোমার পরিমাণের চারগুণ। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত এ্যাটম বোমার ধ্বংস ক্ষমতার ৭৫০ গুণেরও বেশি পরিমাণের বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ভিয়েতনামে। আমেরিকানরা বর্বরতার কোনো পন্থা ও মানববিধ্বংসী কোনো অস্ত্র ব্যবহার থেকে বিরত থাকেনি। তারা ডায়ক্সিন নামের বিষাক্ত রাসায়নিক-জৈবিক মারণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এই বিষের মাত্র ১৮ গ্রাম দিয়ে গোটা নিউইয়র্কের সব অধিবাসীকে হত্যা করা সম্ভব। তার ২০ হাজার গুণ, অর্থাত্ ৪০০ কিলোগ্রাম ডায়ক্সিন আমেরিকা ভিয়েতনামে প্রয়োগ করেছে। এর ফলাফল হিসেবে আজও জেনেটিক সমস্যা সম্পন্ন বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে। এই ট্র্যাজেডি শেষ হতে কতোগুলো প্রজন্ম পার হয়ে যাবে তা কেউ বলতে পারে না। আমেরিকার বোমাবর্ষণ ও রাসায়নিক-জৈবিক অস্ত্র প্রয়োগের কারণে ভিয়েতনামের ৪৫ শতাংশ জমি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এই অবস্থা থেকে উত্তরণও সময়সাপেক্ষ। ভিয়েতনামের উপরে আমেরিকার নিক্ষিপ্ত অবিস্ফোরিত বোমাগুলোর সব অকেজো করতে ৩০০ বছর লেগে যেতে পারে বলে অনেকে অনুমান করে থাকেন।
হ্যানয়ের সামরিক যাদুঘর এবং হো চি মিন যাদুঘর ঘুরে দেখার সময় আমেরিকার ধ্বংসযজ্ঞের বিভিন্ন নিদর্শন যেমন দেখতে পেয়েছি, তেমনি দেখতে পেয়েছি তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধে বীর গেরিলাদের যুদ্ধ কৌশল ও তাদের ব্যবহূত হরেক রকম অস্ত্র এবং সরঞ্জামাদির নিদর্শনও। কি কৌশলে তারা ক্যামোফ্লেজ করে চলাফেরা করতো, ঘরোয়া অস্ত্র দিয়ে কিভাবে তারা শত্রুকেই ঘায়েল করতো, শত্রুকে ধোকা দেয়ার জন্য উল্টা করে স্যান্ডেল পরে যাতায়াত করাসহ কোন সব কায়দা-কৌশল অবলম্বন করতো, কিভাবে বুবি-ট্র্যাপ তৈরি করতো ইত্যাদি দেখতে পেয়ে শৈশবের চেতনায় যে ভিয়েতনাম স্থান করে নিয়েছিল তার প্রতিচ্ছবি কিছুটা ফিরে এলো।
ষাট ও সত্তরের দশকে ভিয়েতনামের তিনজন ব্যক্তি বিশ্বব্যাপী অসাধারণ জনপ্রিয়তা ও পরিচিতি লাভ করেছিলেন তারা হলেন— হো চি মিন (আংকেল হো), জেনারেল গিয়াপ এবং ম্যাডাম থি বিন। কমরেড হো চি মিন প্রয়াত হয়েছেন ৪৪ বছর আগে। তাঁর মরদেহ সংরক্ষিত করা আছে মোসোলিয়ামে। তা দেখতে হাজার হাজার অপেক্ষায় থাকা মানুষের লাইন ভেঙ্গে বিশেষ মর্যাদায় আমাদেরকে গার্ড সহযোগে নিয়ে যাওয়া হলো। আমরা পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করলাম। হ্যানয়ে হো চি মিনের নামে স্থাপিত জাদুঘর ঘুরে দেখে অনেকটাই আবিষ্ট হয়ে পড়লাম ভিয়েতনামের মুক্তি সংগ্রামে তার নেতৃত্ব প্রদানের অসংখ্য নিদর্শন দেখে। হ্যানয়ের সামরিক জাদুঘরও অনুভব করলাম হো চি মিনের উপস্থিতি। তবে, কমরেড হো চি মিনের জীবন্ত স্পর্শ যেন পেলাম হ্যানয়ের ‘রাষ্ট্রপতি প্রাসাদ’ ও তার সন্নিকটে তার বসবাসের বাড়ি পরিদর্শন করতে যেয়ে। ফরাসিদের ঔপনিবেশিক সদর দপ্তর হিসেবে যে প্রাসাদোপম অট্টালিকাটি ব্যবহার করা হতো, ১৯৫৪ সালে উত্তর ভিয়েতনাম স্বাধীন হওয়ার পর হো চি মিনের বাসস্থানের জন্য সেটিকে বরাদ্দ করা হয়েছিল। তিনি সেই প্রাসাদে থাকতে অস্বীকার করে সেটিকে রাষ্ট্রপতির দপ্তর হিসাবে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের থাকার জন্য অনতিদূরে ১২ ফুট বাই ১৫ ফুটের মতো মাপের ২/৩ টি রুমের এক তলা পাকা ঘর তৈরি করেন। একান্ত অপরিহার্য ব্যতীত প্রায় আসবাবশূন্য সেই বাড়িতেই তিনি থাকতেন। পাশে বড় পুকুর। পুকুরে তিনি মাছ পালতেন। পুকুরের পাড় দিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেন। প্রকৃতির আরো কাছাকাছি থাকার আগ্রহ থেকে এক সময় গাছপালা বেষ্টিত পুকুরের অপরপাড়ে আমাদের দেশের ফরেস্ট বাংলার মতো, কাঠের দোতলা ঘর নির্মাণ করে তিনি সেখানে থাকা শুরু করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এক সময় প্রবল হয়ে ওঠে ও উত্তর ভিয়েতনামে ভয়ঙ্কর বোমাবর্ষণ শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে হো চি মিনের হার্ট এ্যাটাক হয়। তখন সন্নিকটে শক্ত কংক্রিটের নতুন সুরক্ষিত একতলা দালানে (মাটির নিচে শক্ত বাংকারসহ) তার থাকার ব্যবস্থা স্থানান্তর করা হয়। এখানে থাকতে শুরু করার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি পরলোক গমন করেন।
জেনারেল গিয়াপ এখনো জীবিত আছেন। জেনারেল গিয়াপ বিশ্বের একজন শ্রেষ্ঠ বীর সেনাপতি। দু’দুটি বড় যুদ্ধে সামরিক নেতৃত্ব দিয়ে তিনি জয়লাভ করেছেন। প্রথমটি হলো ফরাসি ঔপনিবেশিক বাহিনীর বিরুদ্ধে ১৯৪৬ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত চলা প্রথম ইন্দো-চীন যুদ্ধ। দ্বিতীয়টি হলো, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অত্যাধুনিক সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে ১৯৬০ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত চলা রক্তক্ষরা ভিয়েতনাম যুদ্ধ। ১৯৫৪ সালে দিয়েন বিয়েন ফুর সমর, ১৯৬৮ সালের সাড়া জাগানো টেট (নববর্ষ) অফেনিসভ, ১৯৭২ সালের সফল ইস্টার অফেনিসভ এবং সর্বশেষ ১৯৭৫ সালে সাইগন (এখন যার নাম হো চি মিন সিটি) দখলের জন্য চূড়ান্ত অভিযান—এগুলো জেনারেল গিয়াপের অমর কীর্তি। এখন তাঁর বয়স ১০২ বছর। বিছানায় চলত্শক্তিহীনভাবে পড়ে আছেন। তার সাথে দেখা করার সুযোগ নেই, তাই দেখা হলো না।
দেখা হলো এবং ফল-মূল চা খেতে খেতে লম্বা সময় ধরে কথা হলো, অজেয় ভিয়েতনামের বীর কন্যা কিংবদন্তী নেত্রী ম্যাডাম নগুয়েন থি বিন-এর সাথে। ৮৬ বছর বয়সেও তিনি আজও সক্রিয়ভাবে নানা দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও প্রাণশক্তিতে ভরপুর এই বীর নারী অনর্গল স্পষ্ট উচ্চারণে কথা বলে গেলেন। ইতিহাসের কথা, কমিউনিজমের কথা, ভিয়েতনামে সমাজতন্ত্র নির্মাণে নানা অভিজ্ঞতার কথা, শান্তি আন্দোলনের কথা, মার্কসাবদের তত্ত্ব কথা—কতো কি! বললেন—কানে একটু কম শুনি, তাছাড়া ভালই আছি। ১৯৭৩ সালের পহেলা জানুয়ারি ঢাকায় ভিয়েতনাম সংহতি মিছিলে পুলিশের গুলিতে মতিউল ও কাদেরের শহীদ হওয়ার ঘটনা এবং সেই রক্তদানের ফলশ্রুতিতে একটি অকমিউনিস্ট দেশ হিসাবে বাংলাদেশ যে সর্বপ্রথম দক্ষিণ ভিয়েতনামের অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছিল এবং বাংলাদেশ সরকারের খরচে ঢাকায় তার মিশন খোলার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল— সেসব কথা তাঁর স্মরণে আছে বলে তিনি জানালেন। তিনি তরুণ বয়সেই কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন, ফরাসিদের কারাগারে বন্দী হন, মুক্তি পেয়ে ভিয়েত কং বাহিনীতে যোগ দেন, ১৯৬৯-এ অস্থায়ী বিপ্লবী সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান, প্যারিসে ভিয়েতনাম শান্তি আলোচনায় অস্থায়ী সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং ১৯৭৩ সালে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষে তিনি পুনঃএকত্রিত দেশের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
ভিয়েতনাম স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু ভিয়েতনামবাসীর সংগ্রাম শেষ হয়নি। এখন চলছে সমাজতন্ত্রের পথে দেশ গড়ার সংগ্রাম। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। একই সাথে জনগণের জীবনের মান ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। আঁকা-বাঁকা পথে, বিশ্ব বাস্তবতায় ও ভিয়েতনামের দারিদ্র্য ও পশ্চাত্পদতা অতীতের বাস্তবতায় নানা ম্যানুভারের পথ ধরে তাদেরকে সমাজতন্ত্রের পথে এগুতে হচ্ছে। তাদের সাফল্যের অনেক বৃত্তান্ত শুনলাম। নিজ চোখে দেখলাম। ভিয়েতনাম এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম চাল রপ্তানিকারী দেশ। কফি রপ্তানিতে তাদের স্থান ব্রাজিলের পরেই। তারা অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। বিদ্যুত্ উত্পাদনে ৯৫% স্বনির্ভরতা ইতোমধ্যে অর্জিত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সেবা ইত্যাদি ক্ষেত্রে তারা বিপুল অগ্রগতি সাধন করেছে। ক্রমান্বয়ে ভারি শিল্প গড়ে তোলার পথে তারা রয়েছে। প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বর্তমানে বড় স্থান করে আছে। গার্মেন্টস শিল্প আছে। যে শার্টের বাজার দাম ১৩.৫ ডলার, তার প্রায় ৩৮% অর্থাত্ ৫ ডলার মূল্য সংযোজন ভিয়েতনামীরা করে থাকে। ভিয়েতনামে গার্মেন্ট শ্রমিকদের মজুরি বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় চারগুণ। তারপরেও ভিয়েতনামের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতির পথে সমস্যার অন্ত নেই। সেসব সমস্যা, ঘাটতি, দুর্বলতার কথা খোলামেলা আলাপ করতে ভিয়েতনামের নেতাদের মধ্যে কোনো দ্বিধা-সংকোচ দেখলাম না।
ভিয়েতনামে এটিই আমার প্রথম পদার্পণ। গিয়েছিলাম বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের শুভেচ্ছা দলের সদস্য হিসেবে, ভিয়েতনাম শান্তি কমিটির আমন্ত্রিত অতিথিরূপে। সে দেশের শান্তি আন্দোলনের সাথে সম্পর্কিত একাধিক সংগঠনের নেতাদের সাথে আমাদের সাক্ষাত্ ও কথাবার্তা হলো। আমার সাথে ভিয়েননামের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব পর্যায়ের একজন কমরেডের সাথে একটি একান্ত বৈঠকেরও সুযোগ হলো। তাদের থেকে অনেক কথা জানতে পারলাম।
ফাঁক পেলেই ট্যাক্সি নিয়ে চলে যেতাম আমাদের গাউছিয়া বা মৌচাক এলাকার মতো দোকানপাট ও মানুষে গিজ গিজ করা এলাকায়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে, মানুষের চলা ফেরা, ভাবভঙ্গী—এসব দেখে ভিয়েতনামকে জানা যায় ভালো করে। সেই আগ্রহেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা পথে পথে শুধু হেঁটেছি।
একটি দুঃখ রয়ে গেছে। পথের পাশের দোকানের টুলে বসে নুডলস সমেত মাছ বা মুরগির স্যুপ এবং তার সাথে সস্-এ ডুবিয়ে সিদ্ধ করা ভুট্টা অথবা চালের আটার পাতলা রুটিতে মোড়া ভেজিটেবল রোল খাওয়া হয়ে উঠলো না। সুযোগ পেলে সামনের বার এটি মিস করবো না, এ কথা ভাবতে ভাবতে ১২ জুলাই ঢাকার পথে বিমানে চড়ে বসলাম।
লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি
E-mail : [email protected]
