[ রা জ নী তি ]

ঈদে আনন্দ, ঈদ পরবর্তী শঙ্কা

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৩, ২২:১৫
সামনে ঈদ। ঈদকে সামনে রেখে এখন রাত-দিন বিরামহীনভাবে কেনাকাটা চলছে। গ্রাম থেকেও অসংখ্য মানুষ ছুটে আসছে নিকটবর্তী উপজেলা, জেলা, বিভাগীয় অথবা রাজধানী ঢাকা শহরে পছন্দের কেনাকাটা করতে। এবার বিদ্যুত্ সরবরাহ বেশ ভালো। তাই মানুষ সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পছন্দের পণ্য কেনার জন্যে দোকান থেকে দোকানে বা শপিংমলে ছুটে বেড়াচ্ছেন। পরিবহনগুলোও এ মুহূর্তে বেশ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। দিনেরবেলাতেও কেনাবেচা হচ্ছে। তবে গরম বেশি হওয়ায় মানুষ রাতকেই বেশি বিবেচনায় নিচ্ছে। আইনশৃঙ্খলাও এখন ভালো বলা চলে। তাই আগামী ঈদের কেনাকাটায় এখন সব শ্রেণি-পেশার মানুষ মহাব্যস্ত। আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে ঈদ পালন করতেও অসংখ্য মানুষ শহর ছাড়ছেন। কেউবা পরিবারের নারী-বৃদ্ধ এবং শিশুদের আগে-ভাগে গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। পরিবারের কর্তা-ব্যক্তি সময়-সুযোগ মতো গ্রামে যাবেন। সারা দেশেরই চিত্রটি মোটামুটি এরকম। বলাচলে ঈদের উত্সবের প্রস্তুতি নিয়ে সকলেই যার যার মতো ব্যস্ত আছেন। আমাদের জাতীয় জীবনে ঈদুল ফিতর ধর্মীয় এবং সামাজিক চরিত্রে অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ উত্সবে পরিণত হয়েছে। ধনী-দরিদ্র প্রায় সবাই এই ঈদকে আনন্দের সঙ্গে পালন করার চেষ্টা করে থাকে। ঈদের দিন বা ঈদ-সংলগ্ন দিন দুই এই আনন্দ অব্যাহত থাকে। কেননা, আত্মীয়-স্বজনসহ নিকটজনদের সঙ্গে মেলামেশা করার একটি বিশেষ সুযোগ এই ঈদেই ঘটে থাকে। আশা করি এবারের ঈদেও এর ব্যত্যয় কিছু ঘটবে না। তবে যেটি মানুষকে এবার বেশ শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে তা হচ্ছে ঈদ পরবর্তী দেশের রাজনীতি। জামায়াত-শিবির ইতোমধ্যে হাইকোর্ট কর্তৃক তাদের দলের নিবন্ধনকে অবৈধ বলে রায় দেয়ার প্রতিবাদে ঈদের পর পর অর্থাত্ ১২-১৩ আগস্ট দু’দিন, ৪৮ ঘন্টার হরতাল ডাক দিয়ে রেখেছে। ঐ সময় শহর থেকে যেসব মানুষ ঈদ-উপলক্ষে গ্রামে গেছেন তাদের শহরে আবার ফিরে আশার তুঙ্গ সময়। কয়েক কোটি মানুষকে ঐ সময় শহরে আবার ফিরে আসতে হবে। কাজে যোগ দিতে হবে, নিজের ঘরে ফিরে আসতে হবে। বিষয়টি নিয়ে তাই ভাবতেই এবার খুব অবাক হতে হয়। এতো বড় একটি ধর্মীয় উত্সব শেষে কোটি কোটি মানুষের গন্তব্যের ফিরে আসার মুহূর্তে জামায়াত-শিবিরের এভাবে হরতাল দিয়ে রাখাটি কেউ কল্পনা করতে পারে কি না। হরতালটা তারা কার বিরুদ্ধে ডেকেছেন—এ প্রশ্নের সোজা উত্তর হচ্ছে আদালতের বিরুদ্ধে। যেহেতু রায়টি দেশের হাইকোর্টের। অবশ্য আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে এ সংগঠনটি এ বছর আরো বেশ কিছু হরতাল ডেকে তাণ্ডব করেছে, রেল, বাস, সিএনজি এবং বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন দিয়েছে, সড়ক পথে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বালিয়েছে, চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে যেভাবে তারা গাড়ি, রেল বা যানবাহনে আগুন জ্বালায়, ভাংচুর করে—তা বেশ অমানবিক, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তুলনাযোগ্য। সে কারণেই জামায়াত-শিবির যখন কোনো হরতাল ডাকে তখন দেশের সাধারণ মানুষকে যানবাহনে অগ্নি সংযোগের বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হচ্ছে। অন্য কোনো সংগঠন হরতাল ডাকলে মানুষ হয়তো অতোটা শঙ্কায় থাকে না যতোটা জামায়াত-শিবির ডাকলে করে থাকে। কারণ তারা হরতালে তাণ্ডব বেপরোয়া থাকে সে কারণে আগামী ১২-১৩ আগস্টের জামায়াত-শিবিরের ডাকা হরতাল নিয়ে ঈদে গ্রামে যাওয়া মানুষজন খুবই বিচলিত, উদ্বিগ্ন এবং শঙ্কার মধ্যেই পড়েছেন। এটি অনেকেই ভাবতে পারেনি যে হরতালের জন্যে জামায়াত-শিবিরের মতো ধর্ম পরিচয়ধারী দল ঈদের দুই দিন পরকেই কেন বাছাই করবে। কিন্তু রাজনীতি এখন এমন পর্যায় চলে গেছে যখন ঈদ-পরবর্তী সময়কেও আলাদা করে দেখতে রাজি নয় কোনো কোনো দল। শুধু তাই নয়, লাগাতার ৪৮ ঘন্টার হরতাল ঐ সময়ে কী বিপর্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে এসব মানুষের জন্য তা ভাবতেও অবাক হতে হয়। ১২-১৩ আগস্টের হরতাল নিয়ে জামায়াত-শিবির শেষ পর্যন্ত কী করবে তা দেখার বিষয়। সেটি নিয়ে শঙ্কা আগে হয়তো কেউ করতে হবে ভাবেনি। সবাই ভেবেছে যে, যেহেতু আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে একটি অনড় অবস্থান রয়েছে তাই আগষ্ট শেষ বা সেপ্টেম্বর শুরুতে দেশে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরি হতে পারে। হেফাজত ইসলামও ঘোষণা করেছে যে তাদের ১৩ দফা বাস্তবায়নের জন্যে তারাও তখন রাস্তায় নামবে। অন্যদিকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন আলোচনা ও ইফতার পার্টিতে বক্তৃতাকালে বেশ জোর দিয়েই বলছেন যে, তারা তত্ত্বাবধায়ক বা নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা আদায় করতে ঈদের পর ধাপে ধাপে আন্দোলন জোরদার করবেন, প্রয়োজনে সব কিছু অচল করে দেবেন, ঢাকা অবরোধ করবেন, রাস্তাঘাট বন্ধ করে দেবেন, সরকারের পতন ঘটিয়ে হলেও তারা তখন তাদের দাবি আদায় করবেন। বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গেলে আবারও ১৯৯৫-৯৬, বা ২০০৬-০৭ সালের সংঘাত-সংঘর্ষের দীর্ঘ সময়ের কথা মনে পড়ে। তাতে হরতাল, অবরোধ, গাড়ি ভাংচুরের কথা মনে পড়ে। এখন সেইসব কর্মসূচি আরো বেশি সহিংস হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, সমাজে এখন প্রতিহিংসার জায়গাগুলো আরো বেশি তীব্র হয়েছে, নগ্ন এবং অমানবিকও হয়েছে, ধরন-ধারণগুলো আরো বেশি অগ্নিনির্ভর হয়েছে। আগে প্রতিবাদের ভাষা শেষ পর্যন্ত গড়াতো কোনো কিছু বন্ধ করে দেয়া পর্যন্ত এখন শুরুতেই ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, পোড়াপুড়ি, মানুষ হত্যা, পুলিশ হত্যাতে তা গড়াতে মোটেও দ্বিধা করছে না, সমর্থকগণ এতে কোনো অপরাধ দেখেন না, বরং স্বাভাবিক মনে করেন, আরো বেশি সহিংসতাতেও কোনো আপত্তি থাকে না। সেটিকেই বরং সমর্থন করতে থাকেন। ফলে এখানে হরতাল, সংঘাত-সংঘর্ষের সময় সাধারণ মানুষের জন্যে আশ্রয়স্থল বলে কিছু থাকে না। তারা জিম্মি হয়ে পড়েন রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি দাতাদের কাছে। পরিস্থিতি এখন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। সে কারণে ঈদের পরে দেশের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচিতে জনজীবন কতোটা অচল, বিপর্যস্ত এবং নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠতে পারে তা নিয়ে কারো কোনো ধারণা নেই, উত্তরও জানা নেই। এমন কি বিরোধী দল এবং সরকার দলের কাউকে জিজ্ঞেস করলে তারাও বলতে পারেন না ঈদের পর দেশের অবস্থা আসলে কী হতে পারে। দেশের অর্থনীতি কতোটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা কতোটা নিরাপদ থাকবে। পাশাপাশি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন, সরকার বা বিরোধী দলের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা হবে কিনা, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সময় মতো হবে কিনা তা নিয়েও কোনো কোনো পত্রিকা প্রশ্নবোধক চিহ্নসহ প্রধান শিরোনাম করেছে, নানা ধরনের শঙ্কার বাতাস ছড়াচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন না হলে কী হবে, আবার কি এক এগারোর মতো পরিস্থিতি দেশে তৈরি করা হবে? তাতে সরকার বা বিরোধী দল—কার লাভ বেশি হবে—এর হিসাব-নিকাশ কারো কাছে জানা আছে বলে মনে হয় না। সবাইতো যার যার অবস্থানে অন্ধকারে আছেন। রাজনীতিতে এভাবে কখনো সরল অংক কষা যায় না, সরল রেখা এঁকে চলাও যায় না। যারা তা করতে যাবেন তারা সম্মুখে পা দিলেই কালো সুড়ঙ্গ পথ দেখা ছাড়া অন্য কিছু হয় বলে মনে হয় না। সুতরাং, বাংলাদেশে ঈদের পরে সংঘাতের পরিবেশ সৃষ্টি করে কোনো পক্ষেরই কোনো লাভ হবে না। অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্যেও নির্বাচন কমিশনসহ সর্বক্ষেত্রে আরো যা যা করা অত্যাবশ্যক তা নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও কাজ করা জরুরি। সেটি করা গেলে তবেই কাজের কাজ কিছু হবে বলে মনে হয়। তবে বিষয়টি যে প্রধান দু’দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ জানেন না, বোঝেন না তা কিন্তু নয়। তারা সমস্যা ও সংকটটি ভালোভাবেই বোঝেন। তবে মনে হচ্ছে, ভেতরে ভেতরে দু’দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি যা নেয়ার তা নেয়া হচ্ছেও। বাইরে আন্দোলন, সংঘাত সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে জনমতকে প্রভাবিত করা, নিজের পক্ষে নেয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা হচ্ছে হয়তো। তাতে নির্বাচনে সহজ বিজয় সম্ভব হতে পারে। তবে সংঘাত সংঘর্ষের দৈত্যকে একবার রাজপথে ছেড়ে দেয়া হলে এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে চলে যায়, এতে শেষ পর্যন্ত কে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, কে বেশি লাভবান হতে পারেন—তা আগে থেকে বলা না গেলেও এমনটি দেশের জন্যে খুব একটা মঙ্গল বয়ে আনবে না। বিষয়টিকে আরো গভীরে বিবেচনায় নিতে সব পক্ষকেই অনুরোধ করছি। মানুষকে শঙ্কা থেকে মুক্ত থাকতে দিন, ঈদের আনন্দ শেষে বাড়ি থেকে ফিরে আসতে দিন, আগামী নির্বাচনকেও সেভাবে আনন্দঘন করে তুলুন। লেখক :অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন