অস্ট্রেলিয়ায় আগত বা আসতে ইচ্ছুক শরণার্থীদের নিয়ে সমস্যা নতুন কিছু নয়। মূলত ইন্দোনেশিয়া থেকে বোট বা নৌকাযোগে প্রেরিত বিভিন্ন দেশের মানুষের দুর্দশা বা কষ্ট আগেও দেখেছি আমরা, নৌকা ডুবে বা নৌকাডুবির কারসাজিতে প্রাণ হারানোর মত ঘটনাও ঘটেছে। এই যে ‘কারসাজি’ শব্দটি এটি শুনতে খারাপ লাগলেও এই আত্মঘাতী কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবেই করা হয়ে থাকে, যাতে নৌকাডুবির শিকার অসহায় আশ্রয়প্রার্থী মানুষগুলো কোন না কোনভাবে স্বপ্নের দেশ অস্ট্রেলিয়ায় ঢুকতে পারে বা মানবাধিকারের প্রশ্নে আশ্রয় নিতে পারে। সঙ্গত কারণে অস্ট্রেলিয়ার সরকার বা বিরোধীদল কেউই তা পছন্দ করে না, এ দেশের রাজনীতির দাবায় এটি একটি কৌশলি চালও বটে। এ বিষয়টি হ্যান্ডেল করতে ব্যর্থ হলে বা সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে নির্বাচনে পরাজয় ঘটাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। সম্প্রতি আবার নৌ-শরণার্থী ইস্যু চলে এসেছে সামনে। এ নিয়ে দ্বন্দ্বে ব্যস্ত অস্ট্রেলিয়া মানবাধিকার সংস্থা ইন্দোনেশিয়াকে নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ বা আলোচনা ঈদের পরে করব বলে স্থির করেছি, এখন লিখব এই ইস্যুতে গণতন্ত্রের জয়যাত্রা সরকারি ও বিরোধীদলের গৃহীত পদক্ষেপ বিষয়ে, আমাদের দেশের কলহপ্রবণ উত্তেজনামুখর পরস্পর বিরোধী দলগুলো শিক্ষা নেবে না জেনেও বিবেকের তাড়নায় লিখতে চাই। জানাতে চাই কিভাবে সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি সমঝোতা ও শান্তিপূর্ণ অবস্থানের ভেতরে থেকেও নিজেদের মতামত বা আদর্শ তুলে ধরে। আগেই বলেছি অস্ট্রেলিয়ার নৌ-শরণার্থী সমস্যা এ দেশের রাজনীতিতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে, ফলে কারো পক্ষে এ নিয়ে নীরব থাকা সম্ভব নয়। বর্তমান সময় অর্থাত্ এই ক’দিনে ফেনিয়ে ওঠা সমস্যার আলোকে সরকারি দল অর্থাত্ লেবার দলের নেতা প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাভ পাপুয়া নিউগিনির শরণাপন্ন হয়েছেন। সেদেশের নেতার সাথে কথা বলে মিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাপুয়া নিউগিনি টাকা নেবে একশর্তে অস্ট্রেলিয়ার নৌ-শরণার্থী বা ঢুকে পড়া যেকোন অযাচিত অনিয়ন্ত্রিত মানুষদের যেতে হবে সেদেশে। তারা অস্ট্রেলিয়ায় জায়গা পাবে না, তাদের বিচার বা আইনি প্রক্রিয়ায় দেশে ফেরত পাঠানো অবদি থাকতে হবে পিএনজি বা পাপুয়া নিউগিনির ভূখণ্ডে। বলাবাহুল্য পিএনজি কোন সুখকর জায়গা নয়, সেদেশে প্রচুর বনজ সম্পদ আর প্রাকৃতিক ঐশ্বর্য থাকার পরও জাতিগত সহিংসতা আর উম্মদনায় শান্তি বলে কিছু নেই, প্রবাসী এক বন্ধু এক আড্ডায় গল্প করছিলেন সেদেশের ভয়াবহ দাঙ্গায় প্রত্যক্ষদর্শী এই বন্ধুটির বর্ণনা শুনে রক্ত হীম হবার যোগাড় এখনো এরা কাঁচা মাংসের গন্ধে লাশ ঝুলিয়ে আনন্দ বা প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে ভালোবাসে। তাও মানুষের, এমন দেশে শরণার্থীরা কোন দুঃখে থাকতে যাবেন? হয়তো সেদিন থেকে কেভিন রাডের প্রস্তাব বা প্রকল্প ঠিকই আছে, কিন্তু বিরোধী দল লিবারেলও থেমে থাকেনি। তাদের নেতা টনি এ্যবট দিয়েছেন অন্য ফর্মুলা। তারা বলছেন, একজন থ্রি স্টার জেনারেলের অধীনে নৌ সীমান্ত পাহারার ব্যবস্থা করা উচিত, সুশিক্ষিত নৌ সেনাদলের এই জেনারেল শরণার্থী ঠেকানোর সমস্ত ব্যবস্থা নেবেন। তার এ্যাকশনের জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে জবাবদিহিতা বা উত্তর দেয়ারও আওতামুক্ত থাকবেন, অস্ট্রেলিয়াকে নিরাপদ রাখার জন্যে এটাই বিরোধী দলের প্রস্তাব।
কোনটি গ্রহণযোগ্য বা কোনটি প্রয়োজনীয় তার জবাব দেবে সময়। তা ছাড়া এজন্যে আছে সংসদ, সাংসদ, আইন বিচার ও জনগণ, কিন্তু আমরা দেখছি গণতন্ত্রের জয়-জয়কার ও স্বচ্ছতা, আমাদের দেশের মত কোন দল কিছু চাপিয়ে দেয়নি বা জনগরিষ্ঠতার নামে নিজেরটাকে শ্রেষ্ঠ বলে লাফালাফি করেনি। অন্যদিকে বিরোধী দলও ভাঙচুর অগণতান্ত্রিক আচরণ বা গ্রহণ-বর্জনের নামে উত্তেজনা ছড়ায়নি। তারা নিয়ে এসেছেন বিকল্প প্রস্তাব। কারণ যে কোন সভ্য দেশেই বিরোধী দল বা প্রতিপক্ষের থাকে ছায়া সরকার, তারা দেশ ও জনগণের জন্য যা ভাবেন বা যা করতে চান তা প্রকল্প প্রস্তাব অথবা আলোচনার জন্য সামনে নিয়ে আসেন, যেন জনগণই ঠিক করে নেয় কোনটি নেবেন বা কোনটি তাদের পছন্দের।
আমাদের গণতন্ত্র এখনো শিশু, এ কথা বলার ভেতর আত্মতৃপ্তি থাকলেও দূরদর্শিতা নেই। যেভাবে সে বাড়ছে, বেড়ে উঠছে তাতে পরিকল্পনা বলে কিছু নেই। আছে হানাহানি, মারামারি আর হামবড়া ভাবের অস্থির উন্মাদনা। আমরা কি উভয় দলের কাছে কিঞ্চিত হলেও সুস্থিরতা আর পরিকল্পনা আশা করতে পারি না? আওয়ামী লীগের এই সরকারের মেয়াদকাল ফুরাবার পথে, তারা আগামীবার নতুন কি করবেন বা করতে চান তার কোন পরিকল্পনা, এজেন্ডা কিছুই এখনো দেয়নি, কবে দেবেন তারও কোন ঘোষণা নেই। অন্যদিকে ক্ষমতায় যাবার জন্য অস্থির হয়ে ওঠা বিরোধী দল নতুন কি করবে কিভাবে পরিবর্তন ঘটাবে তা নিয়েও কিছু বলে না, সবার ধারণা আগে ক্ষমতা তারপর যা ইচ্ছা তাই করা যাবে, এর নাম আর যাই হোক গণতন্ত্র হতে পারে না, আর গণতন্ত্র মানে যার যার অবস্থান থেকে হংকার ছাড়া বা মানুষকে জিম্মি রেখে হক আদায়ের নামে অস্থিরতা ছাড়া কিছু নয়, কবে যে পরিশীলন আর সদিচ্ছা মাথা তুলবে, ঈদের পর কি নতুন কোন দিকে মোড় নিবে দেশ? সেটাই এখন প্রতীক্ষার।
সিডনি থেকে
