[ রা জ নী তি ]

রাজনীতিকদের প্রশ্রয় ও অন্তর্দ্বন্দ্বের বলি

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩১
নাগরিকের নিরাপদে বেঁচে থাকার অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্র যদি ব্যর্থ হয়, তবে মৌলিক অধিকারের সকল আয়োজনই হয়ে ওঠে অর্থহীন। দেশের বর্তমান আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেকোন সময়ের চেয়ে ভাল, সাগর-রুনি হত্যাকারীদের ৪৮ ঘণ্টার মাঝে খুঁজে বের করা হবে, বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের পীলার নাড়াচাড়ার কারণে রানা প্লাজার ধস ইত্যাদি বচন-বক্তব্যগুলো জনমনে যতটা না আস্থার সৃষ্টি করতে পেরেছে তার চেয়ে বেশি বিনোদন দিতেই সক্ষম হয়েছে। এবার কি তাহলে বিনোদন প্রদর্শনের সুযোগ থেকে স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ বঞ্চিত হলেন? নাকি দর্শকদের মনোরঞ্জনে নতুন পথ বেছে নিয়েছেন। যুবলীগের ঘরোয়া কোন্দলের বলি হয়েছেন ঢাকা মহানগরীর (দক্ষিণ) সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল খান মিল্কি। ৩০ জুলাই ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ততম রাতের নগরী প্রত্যক্ষ করে ঠাণ্ডা মাথায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে, জমকালো বিপণী ‘শপারস্? ওয়ার্ল্ড’-এর সামনে। শপিং মলটির সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে পুরো হত্যার দৃশ্য। ফলে মুহূর্তেই মুসল্লিবেশী কিলারকে আবিষ্কার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। প্রথমে মুসল্লিবেশী অবয়ব দেখে সরকার সমর্থকরা উত্সাহিত হয়েছিলেন। ভেবেছিলেন জামায়াত-হেফাজতের বিরুদ্ধে প্রচারণার আরেকটি উপকরণ হাতের নাগালে। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি এই উত্সাহ। হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ব্যতিক্রমী তত্পরতা লক্ষ্য করেছেন অন্য সময়ের বিনোদনপ্রেমীরা। এবার আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা আওয়ামী লীগের মুখপাত্র মাহবুবুল আলম হানিফ আস্থা নির্মাণে মুখরোচক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পাননি। “কেঁচো খুঁড়তে সাপের ভয়”। তাই হত্যার ২৪ ঘণ্টার মাঝেই খুনি যুবলীগ ঢাকা মহানগরীর (দক্ষিণ) যুগ্ম-সম্পাদক তারেককে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়েছে। অনেকে বলছেন, এ ঘটনা প্রতিবারের মত র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাজানো নাটক। এ কথা জনগণের নিকট খুব সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হিসেবে প্রতীয়মান হয়, যখন সরকারের দপ্তরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত ঘটনাকে নাটক হিসেবে অভিহিত করেন। র্যাবের সাজানো গল্পটিতে উল্লেখ করা হয়, হত্যার দায়ে অভিযুক্ত ও আটক এস এম জাহিদ সিদ্দিকীকে পুলিশের নিকট হস্তান্তরের লক্ষ্যে উত্তরা থেকে গুলশানে নিয়ে যাচ্ছিলেন র্যাব সদস্যরা। পথে তার সহযোগীরা তাকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য র্যাবের গাড়িতে হামলা চালান। দুই পক্ষের মাঝে সংঘটিত বন্দুক যুদ্ধে সিদ্দিকীসহ দুইজন নিহত হন। সংগত কারণেই অন্যান্য ঘটনা পরবর্তী স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের দেয়া বক্তব্য বিবৃতির ন্যায় কোন আয়োজন করতে হয়নি। আস্থা তৈরি কিংবা বিনোদন দেয়া যাই বলি না কেন আপাতত জনগণকে এ ঘটনায় গতানুগতিক বিনোদন উপভোগ করতে হয়নি। প্রশ্ন হল, খুনের বদলে হত্যাকারীদের হত্যা কি খুনের রাজনীতি বন্ধের নিয়ামক হবে? বিচার বিভাগ নামক রাষ্ট্রীয় অঙ্গটির কাজের পরিধি কমিয়ে দেয়ার জন্য কি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আয়োজন? হত্যার নেপথ্যে যারা কলকাঠি নেড়েছেন অর্থাত্ মদদদাতাদের আড়াল করার জন্য কি সরকারের এ পদক্ষেপ? অভিযুক্ত আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার থেকে অভিযুক্তরা বঞ্চিত হবে? নাকি জনগণকে লক্ষ্য করে স্বরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষের নিছক বিনোদনের উপকরণের পরিবর্তিত রূপ? প্রশ্নগুলো জনমনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এ ঘটনার মাধ্যমে মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে কোণঠাসা আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বিচার বহির্ভূত হত্যা বন্ধের বিষয়ে দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। ক্রসফায়ারে তারেককে হত্যার ফলে প্রকৃত মদদদাতাদের খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। যুবলীগ আরেকটি সূত্র বলছেন, তারেক নয় খুনি সাখাওয়াত হোসেন চঞ্চল। সে যুবলীগের ঢাকা মহানগর (উত্তর)-এর সাংগঠনিক সম্পাদক। র্যাব চঞ্চলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী শাহ আলমকে গ্রেপ্তার করে তারেকের দেয়া তথ্য অনুযায়ী। শেষে ৩১ জুলাই রাতে র্যাব-এর দেয়া বক্তব্য অনুযায়ী (সাজানো গল্প) র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় তারেক ও শাহ আলম। মিল্কি হত্যা সূত্রে যুবলীগের ভেতরকার অনেক কর্মকাণ্ডের খবর আসছে মিডিয়ায়। এ সব খবর যে নতুন বা অজানা তা কিন্তু নয়। প্রতিপক্ষকে মোকাবিলায় সন্ত্রাসীদের প্রয়োজনীয়তা রাজনীতিকে করেছে সন্ত্রাসীদের উপযুক্ত অভয়াশ্রম। যুবলীগের টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির খবর শুনতে জনগণ অনেক আগে থেকেই অভ্যস্ত। পত্রিকায় এসেছে, পিডিবি, ওয়াসা, ডেসা, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ ও সিএমএমইউ’র টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ হয় চঞ্চলের হাতে। মিল্কির সাথে চঞ্চল ও তারেকের দ্বন্দ্বের বিষয়টি যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু কোন সমাধান দিতে ব্যর্থ হওয়ায় টেন্ডারবাজি নিয়ন্ত্রণ নিয়েই খুন হয় মিল্কি। এ খুনে নেতৃত্ব দিয়েছে চঞ্চল, তারেক ও তাদের সহযোগীরা। যুবলীগের পদ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করেছে এরা। তবে হত্যাকাণ্ডের পর যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতারা কিলারদের বাঁচাতে জোর তদবির অব্যাহত রেখেছেন। শপিং মলে সিসি ক্যামেরার বিষয়ে অবহিত ছিলেন হত্যাকারীরা। কিন্তু ঔদ্ধত্যতার চরম পর্যায়ের উপস্থিতি, হত্যাদৃশ্য ধারণ করাকেও পরোয়া করেনি। কিলারের মুসল্লি অবয়ব নিয়ে কথা রয়েছে। শুনেছিলাম ৫মের হেফাজতের কর্মসূচিকে ঘিরে সরকারের উত্কণ্ঠার শেষ ছিল না। সেদিন ছিল হেফাজতে ইসলামের ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি। পরে তারা অবস্থান নিয়েছিল মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। পুলিশি দমন-নির্যাতন, তাদের পাশাপাশি দলীয় ক্যাডারদের প্রকাশ্য মারপিট। নাশকতার উদ্দেশ্যে দলীয় কর্মীদের মধ্যে শ’ শ’ সাদা পাঞ্জাবি পায়জামা টুপি বিলি করার কথা। ওগুলো পরে হেফাজতি বেশ ধারণ করে নানারকম দুষ্কর্মে লিপ্ত হওয়ার দৃশ্যও কিছু দেখা গেছে। যেমন- কুরআন পোড়ানো, দোকানপাট লুট, ব্যাংক ও সোনার দোকানে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ফুটপাতের বইপত্র ও অন্যান্য দোকানে জ্বালাও-পোড়াও, নারী সাংবাদিকের সঙ্গে অশোভন আচরণ, গাছ কাটা ইত্যাদি। কিন্তু উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার বিষয় হচ্ছে, সেদিন যারা অপকর্মে নেতৃত্বে ছিল তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার পরিবর্তে দলীয়ভাবে পুরস্কৃত করে। ফলে এখন আর ক্যামেরার সামনেও খুন করতে দ্বিধা করে না। প্রতিপক্ষ দমনে টুপি পাঞ্জাবি পায়জামার বন্দোবস্ত উপযুক্ত ব্যবহার এখনও করছেন নেতা-কর্মীরা। ওই রাতে শুধু যুবলীগ নেতা নয়, রাজধানীর আশপাশ এলাকায় আরো তিনজন খুন হয়। একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়েছে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মাত্র ২০দিনে ৩১জন খুন হয়েছে। গুরুতর আহত হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন অন্তত ৪০জন। রাজনীতিকরা দেশে-বাইরে বড় বড় বুলি আওড়াচ্ছেন। দেশে বইয়ে দিচ্ছেন উন্নয়নের জোয়ার, আর প্রতিপক্ষদের মধ্যে শুধু দেখে বেড়াচ্ছেন চোর-সন্ত্রাসী। প্রকৃতপক্ষে কেমন চলছে নাগরিক জীবন? প্রতিটি মুহূর্ত উত্কণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় অতিবাহিত হচ্ছে। উদ্যত অস্ত্রের নিচে কিভাবে কাটছে তাদের শঙ্কিত জীবন, আর এই অস্ত্রধারী ‘সোনার ছেলে’রা কেমন গিজগিজ করছে ওইসব নেতা-নেত্রীদেরই ছায়াতলে। প্রশ্রয় দিলে সমাজের অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। অস্বীকারের জো নেই প্রশ্রয় দিয়ে মাথায় তোলার কারণে দেশে আজ খুন-খারাপি মামুলি ঘটনায় পরিণত হয়েছে।  লেখক : সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন