সাদাকো সাসাকি। হাসিখুশি প্রাণচঞ্চল ছোট্ট দুই বছরের শিশু। কাগজ দিয়ে উড়োজাহাজ বানাত আর অপেক্ষায় থাকত কখন সে আবার ভাল হয়ে যাবে এবং বান্ধবীদের সাথে খেলতে যাবে। দেখতে দেখতে দুই বছর থেকে দশ বছর হল সাদাকো সাসাকি রেডক্রস হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে হিরোশিমার আকাশ দেখে আর মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করে। সে আক্রান্ত হয়েছে রেডিয়েশনজনিত মারাত্মক লিউকেমিয়ায়। ভয়াবহ রোগযন্ত্রণা সত্ত্বেও সাসাকি অধীর আকুল হয়ে আশা করত আবার সে ভাল হয়ে যাবে। আবার সে মুক্ত-বিহঙ্গের মত হাসবে, খেলবে। কিন্তু হায়! সাসাকি অবশেষে আটটি মাস কঠিন যন্ত্রণার শেষে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
ঘড়ির কাঁটা :সময় তখন ৮-১৫ মিঃ। আগস্টের ৬ তারিখ, ১৯৪৫। ঘড়ির কাঁটাটি স্থির হয়ে গেল। মানব ইতিহাস প্রথম প্রত্যক্ষ করল আণবিক শক্তির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। ৫৮০ মিটার উঁচু থেকে নগরীর কেন্দ্রে বিস্ফোরিত তাপরশ্মি দুই কিলোমিটার এলাকার সমস্ত দালান-ঘরবাড়ি, গাছ, পশুপাখি, মানুষ মুহূর্তে ধ্বংস করে দিল। বেঁচে যাওয়া হতভাগ্য লোকগুলো তাদের পোড়া ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহগুলো নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল, কেউ কেউ দিশেহারা দিগ্বিদিক ছুটাছুটি শুরু করল।
ছোট্ট শহর হিরোশিমা : ইদো সম্রাটদের সময় (১৬০৩-১৮৬৮) হিরোশিমা একটি সম্প্রসারণমুখী ছোট শহর। মিউজিদের সময় হিরোশিমা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষায় এবং মিলিটারী শহররূপে বেশ অগ্রসরমান। আণবিক বোমাটির বিস্ফোরণের সময় হিরোশিমার মোট জনসংখ্যা ছিল ৩,৫০,০০০। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ ভাগে জাপানের প্রায় সবকটি শহর মার্কিন বোমার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত। হিরোশিমা তখনও কিন্তু অক্ষত। হিরোশিমার আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান উপরন্তু আণবিক বোমার বাস্তব ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করার জন্য বোমাটি হিরোশিমায় বিস্ফোরণের তাগিদ অনুভূত হয়েছিল। দ্বিতীয়ত সেনাছাউনি, অস্ত্র কারখানা ইত্যাদির জন্যও সম্ভবত হিরোশিমা আকৃষ্ট হয়ে থাকতে পারে।
জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৫ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে ইয়াল্টাতে একটা সমঝোতা হয়। এছাড়া মার্কিনীরা তাদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং সাথে আণবিক শক্তির ধ্বংস ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতেও উত্সাহী হয়ে উঠেছিল।
ধ্বংসের খতিয়ান :হিরোশিমা নগরীর কেন্দ্রস্থল হিরোশিমা প্রিফেকচার ভবনটির ওপর আকাশ থেকে নিক্ষিপ্ত হলো ‘লিটলবয়’, যেটি লম্বায় ছিল ৩ মিটার, ওজন ৪ টন। ১০-৩০ কিলোগ্রাম ইউরেনিয়াম ‘২৩৫’। ইউরেনিয়াম এবং প্লুটোনিয়াম-এর ফিশন এর ফলে যে এনার্জি সৃষ্টি হয় এর ক্ষমতা হচ্ছে ১ কিলোগ্রাম সমান ১৫,০০০ টন। প্রতি বর্গমিটারে ১৫ জন ধাক্কায় দালান, ঘরবাড়ী, মানুষ ধূলিসাত্ হয়ে বাতাসে উড়ে গেছে। এরপরও আছে গামারশ্মি, নিউট্রন রশ্মি ও অন্যান্য রেডিয়েশন যা যুগব্যাপী মানুষের শরীরে সৃষ্টি করেছে ক্ষত। বোমাটির প্রায় ৫০% বিস্ফোরণ শকওয়েভ রূপে, ৩৫% তাপরশ্মি এবং ১৫% রেডিয়েশন রূপে। তিনটি যৌগ বিক্রিয়া ধ্বংস করেছে দুই কিলোমিটারব্যাপী সকল দালান, গাছপালা ও মানুষ। ডিসেম্বর ১৯৪৫-এ এক জরিপে দেখা গেছে প্রায় ১,৪০,০০০ জন মূল্যবান প্রাণ বিস্ফোরণের ফলে অকালে ঝরে গেছে। মানব সভ্যতা এরপর নিউক্লিয়ার যুগে প্রবেশ করল। এর ধারক-বাহকদের অজুহাত হচ্ছে আমার কাছেও আণবিক বোমা আছে, তোমার কাছেও আছে। কাজেই সাবধান। বিশ্বমানবতা, সভ্যতা বসে আছে প্রায় ২০,০০০-এর বেশি মারাত্মক বোমার উপর, যা আজকের এই সভ্যতাকে, সুন্দর গ্রহটিকে কয়েকবার নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। গ্রহটির শান্তিপ্রিয় মানুষ সকল, কোটি কোটি সাদাকো সাসাকির সম্মিলিত ইচ্ছা, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কি রুখতে পারবে এসব পাগল সমরবিদদের? ভবিষ্যত্ই এর সমাধান বলে দেবে।
লেখক : গবেষক
