গুণ্ডামিতন্ত্র ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৩
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ছাত্রদলের একাধিক কর্মী নিহত হওয়ার প্রেক্ষিতে এক সময় বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা বলেছিলেন, আমাদের দলে কোনো সন্ত্রাসী নেই, যদি থাকে তাহলে তারা নিজেদের মধ্যে গোলাগুলি করে শেষ হয়ে যাবে। নাজমুল হুদার এই উক্তিটি সেই সময় বেশ আলোড়ন তুলেছিল। অনেকেই এই মন্তব্য নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করেছিলেন। কিন্তু গত দুই দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সংস্কৃতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার এই উক্তিটি একটি ‘কালোত্তীর্ণ সত্যে’ পরিণত হয়েছে! আমাদের দেশের প্রধান দুই দলে গুণ্ডা-সন্ত্রাসীরা দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করছে। কিন্তু তাদের নেতা-নেত্রীদের জিজ্ঞেস করুন তারা বলবেন, ছিঃ ছিঃ, এসব বলেন কি! আমাদের দলে কোনো গুণ্ডা-সন্ত্রাসী নেই। আমরা হলাম সাচ্চা। আওয়ামী লীগওয়ালারা বলবে, আমাদের দলে সন্ত্রাসী-গুণ্ডা বলে কেউ নেই, কিছু নেই; গুণ্ডা-বদমাশ সব বিএনপিতে। ওদিকে বিএনপিওয়ালারা বলে, আমরা হলাম ভালো মানুষের দল। চোর-গুণ্ডারা সব আওয়ামী লীগে। কিন্তু আমরা দেখি, চোর-গুণ্ডা-বদমাশ-সন্ত্রাসী আওয়ামী লীগ-বিএনপি উভয় দলেই স্থায়ী আসন গেড়ে বসে আছে। মাঝে মাঝে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এভাবে তারা নিয়মিত বিরতিতে লড়ছে এবং মরছে। স্বার্থের সংঘাতে জড়িয়ে এই সন্ত্রাসীরা যখন লড়ে এবং মরে তখন কিন্তু দলগুলো চুপ করে থাকে। তবে যখন এদের কেউ বড় রকম হুমকি হয়ে দাঁড়ায় তখন দল থেকে বহিষ্কার করে। অনেক সময় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ‘ক্রসফায়ারের’ শিকার হয়। অথচ খুন হওয়া কিংবা দল থেকে বহিষ্কারের আগে পর্যন্ত এদের কারো সম্পর্কে দলীয় নেতা-নেত্রীদের কাছে অভিযোগ করুন, তারা কেউ বিষয়টিকে পাত্তাই দেবেন না। বরং উল্টো সাফাই গাইবেন। বলবেন ওর মতো ভালো কর্মী দলের মধ্যে দ্বিতীয়টি নেই। যদিও আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, সন্ত্রাসীরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোরবানির খাসির মতো বলি হয়েই চলেছে। ব্যারিস্টার নাজমুল হুদার কথার মতো ‘নিজেদের মধ্যে মারামারি করে শেষ হয়ে যাচ্ছে’! তবুও গুণ্ডামি নাহি মানে পরাভব। সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই রাতে রাজধানীর গুলশানের শপার্স ওয়ার্ল্ড শপিং মার্কেটের সামনে সন্ত্রাসীদের গুলিতে খুন হয়েছেন ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রিয়াজুল হক খান মিল্কী। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহভাজন জাহিদ সিদ্দিক তারেকসহ দু’জন র্যাবের সঙ্গে ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হয়েছেন। জাহিদ সিদ্দিক তারেক ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে গুণ্ডামি ও সন্ত্রাসের বিস্তর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। শোনা যাচ্ছে পদ-পদবি, নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব-আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, চাঁদাবাজি-টেণ্ডারবাজির ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্বের জের ধরেই এক নেতা আরেক নেতাকে খুন করেছেন। নেপথ্যে অন্য নেতারা কলকাঠি নেড়েছেন। তারেক র্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ কেন খুন হলেন, এটা নাটক কিনা, এসব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও এগুলো অবান্তর প্রশ্ন। আমাদের দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ে কোনোরকম রাখঢাক না করেই সন্ত্রাসী লালন ও গুণ্ডামি চর্চা হচ্ছে। সেখানে কে, কোথায়, কোন উদ্দেশ্যে, কার গুলিতে মরলো, এভাবে মরা বা মারা উচিত কিনা, এটা র্যাবের সাজানো নাটক কিনা—তাতে কী আসে যায়? সন্ত্রাসীদের রাজনীতিতে আসা, তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়া, তাদের নেতা বানানো, আবার তাদের সন্ত্রাসী পরিচয়কে আড়াল করা বা করতে চাওয়া—পুরোটাই যেখানে নাটক, সেখানে আলাদা করে র্যাবের ক্রসফায়ারের মধ্যে নাটক খোঁজার আদৌ কোনো মানে আছে কী? হতাশাবাদীরা যতই হা-হুতাশ করুক না কেন, আমাদের দেশ কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই অপরাপর দেশের তুলনায় এগিয়ে যাচ্ছে। সন্ত্রাস, নৈরাজ্য, হানাহানি, ঘুষ-দুর্নীতি, দলবাজি, সংকীর্ণতা, হরতাল, অধঃগামিতা—ইত্যাদি ক্ষেত্রে আমাদের সমকক্ষ দেশ খুব একটা খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তবে সব কিছুকে ম্লান করে দিয়ে সন্ত্রাসের ক্ষেত্রে আমরা অভাবনীয় উন্নতি করেছি। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে এখন কেবল গুণ্ডামি আর সন্ত্রাসের খবর। প্রতিদিনের পত্রিকার পাতায় মাননীয়দের সঙ্গে পরাক্রমশালী সন্ত্রাসী-বাহাদুরদের স্তব-বন্দনা, কীর্তি কাহিনী, জিরো থেকে হিরো হওয়ার দুর্দান্ত সব গল্প ছাপা হয়। রূপকথার নায়ক বলুন, আর অলৌকিক মানুষ বলুন—একালে সন্ত্রাসী-ক্যাডাররাই সব। বড় সব দলে সবখানে তাদেরই জয়জয়কার। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবশ্য বরাবরই গুণ্ডাবাজি খানিকটা প্রশ্রয় পেয়েছে। সেই ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের আমলেও গুণ্ডাদের কিছুটা প্রতিপত্তি ছিল। তারপর সুভাষ বসু, যতীন সেনগুপ্তরা যখন কংগ্রেসের দখল নিয়ে মারামারি করেছেন, দুই পক্ষেই গুণ্ডারা লাঠি-সড়কি ঘুরিয়েছে, পরস্পরের সভা-সমিতি বানচাল করেছে। বামপন্থিদের সংগঠন গড়ে ওঠার কালেও গুণ্ডারা অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে। তারও পরে মুসলিম লীগ এবং আইয়ুব খানের শাসনামলে গুণ্ডাদের মাঝে-মধ্যে দেখা গেছে। তবে স্বাধীনতা অর্জনের মধ্য দিয়ে গুণ্ডামিও যেন স্বাধীনতা পেয়েছে। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা যখন নারকীয় হত্যাযজ্ঞ ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেয়, তখন থেকে গুণ্ডামি বা সন্ত্রাস অপ্রতিহত গতিতে চলতে থাকে। এর পরের ইতিহাস যেন গুণ্ডামি ও সন্ত্রাসেরই ইতিহাস। সন্ত্রাসী গুণ্ডারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব কিছুর ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই সন্ত্রাসী গুণ্ডারা এখন টেরর, ক্যাডার ইত্যাদি অভিধা পেয়েছে। এই কিছুদিন আগ পর্যন্ত গুণ্ডাদের বাহুবল ব্যবহারের ব্যাপারে একটি গুণগত পার্থক্য ছিল। গুণ্ডা বা সন্ত্রাসীদের মানুষ ঘৃণা করতো। ফলে তারা সন্ত্রাসী পরিচয় নিয়ে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াতে পারতো না। তাদের মাথায় তুলে কেউ নাচতেন না। তারা বিচরণ করতো সাধারণ লোকচক্ষুর আড়ালে। রাজনৈতিক দলগুলো কালেভদ্রে হয়তো তাদের শরণ নিত। কিন্তু নায়কের ভূমিকায় গুণ্ডাদের ভাবাই যেত না। রাজনীতি, বিশেষ করে বাংলাদেশে, চির আদর্শের ব্যাপার, ত্যাগ-তিতিক্ষার ফল। গুণ্ডারা এক কোণে মুখ নিচু করে বসে থাকতো, মঞ্চের ত্রিসীমানায় ঘেঁষবার এক্তিয়ার তাদের ছিল না। কিন্তু গত দুই-তিন দশকে এক্ষেত্রে মস্ত এক বিপ্লব ঘটে গেছে। গুণ্ডাদের গুণ্ডা বলার সাহস সবাই হারিয়ে ফেলছে। তারা এখন মন্ত্রীর সহচর, নেতা-নেত্রীর প্রশ্রয়, দলের শক্তি ও নির্ভরতা। দলের দায়িত্বে সন্ত্রাসী, দলের শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বেও তারাই। তারা খুন, চাঁদাবাজি, টেণ্ডারবাজি, সন্ত্রাস করছে। বক্তৃতা দিচ্ছে। মিছিল করছে। কেউ কেউ দলের মনোনয়ন পেয়ে ইলেকশন করছে, নির্বাচিতও হচ্ছে। টোকাই থেকে সন্ত্রাসী, গুণ্ডশাহী। তারা ছাত্রনেতা, শ্রমিকনেতা, যুবনেতা, এমনকি জাতীয় নেতাও বনে যাচ্ছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কোন ছেলেমেয়ে ভর্তি হতে পারবে, আর কারা পারবে না তা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। গণতন্ত্রের সৈনিক সেজে বুলি কপচাচ্ছে, মাননীয় দেশনেতা-নেত্রীদের সঙ্গে ছবি তুলছে, তাদের সফরসঙ্গী হচ্ছে। সেই ছবি কাগছে ছাপা হচ্ছে, টেলিভিশনে দেখানো হচ্ছে। তারপর নিরীহ লোকজনের জমি দখল করছে, ব্যবসায়ীদের ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। টেন্ডারবাজি করছে, গায়ের জোরে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। অপহরণ করছে, ধর্ষণ করছে। প্রতিপক্ষের একজন-দু’জন রাজনৈতিক কর্মীকে অবলীলায় নিজ হাতে খুন করে গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। যদি স্বার্থের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়, তাহলে নিজ দলের প্রতিদ্বন্দ্বীকে পর্যন্ত গুলি করে হত্যা করছে। যেন এর কোনো প্রতিকার নেই, প্রতিবিধান নেই। অবশ্য এজন্য বিলাপ করার কিছু নেই। নীতি-আদর্শ-নৈতিকতা-মূল্যবোধ সব কিছু রসাতলে গেলে ক্ষমতার রাজনীতিতে আর থাকেটা কী, সন্ত্রাসী বা গুণ্ডাবাহিনী ছাড়া? চারদিকে অন্যায়, জুলুম, বিশৃঙ্খলা। দুর্নীতি ছাড়া সমাজে অন্য কোনো স্বীকৃত নীতি নেই। এ অবস্থায় সন্ত্রাসই ভরসা, গুণ্ডামিই শেষ আশ্রয়! তাদের সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ অনেক ক্ষেত্রেই সমাজকর্মী ও নেতা হিসেবে বরণ করে নেয়া হয়েছে। আমরা ঘরপোড়া গরু। তাছাড়া কিল গুঁতো হুমকি ভয় আর ভালো লাগে না। আমাদের প্রতিবাদের ভাষা এতবার ব্যর্থ কান্নায় পরিণত হয়েছে যে, সেই প্রতিবাদের ভাষা উচ্চারণ করতে ইচ্ছে হয় না। এর মধ্যে আমরা বেঁচে থাকার নতুন পদ্ধতি শিখে গেছি। আমরা সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসীর সঙ্গে আপোষ করে বাঁচতে শিখে গেছি। যাদের ওপর দেশ চালানোর দায়িত্ব, যারা সার্টিফিকেট নিয়ে বসে আছে দেশ শাসন করার, তারাই যদি পরম মমতায় ও শ্রদ্ধায় গুণ্ডাদের মাথায় তুলে নাচে, নেতার আসনে বসায়, তাহলে আর আমাদের বলার কী আছে? কাজেই সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসীদের বিরোধিতা করে লাভ নেই। সুতরাং আসুন আমরা গুণ্ডাদের কাছে নাকখত দেই। গুণ্ডাদের বন্দনায় মেতে উঠি। নীতি-নৈতিকতা, আইন, আইনের শাসন কিছু নয়, ব্যক্তিপূজা এবং গুণ্ডাপূজার মিথ্যে সম্মোহনে স্থিত থাকি। সাহস নয়, ন্যায় কিংবা সততা নয়, ভীরু কাপুরুষতা এবং নিজেকে যে কারও পায়ের তলায় সঁপে দেয়ার জন্য তৈরি হই। সন্ত্রাসীদের পক্ষে জয়ধ্বনি দিই—জয় সন্ত্রীর জয়! জামায়াতে ইসলামী আমাদের দেশে সবচেয়ে বিতর্কিত দল। সম্প্রতি একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে এই দলটির নিবন্ধনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে হাইকোর্ট। এই রায় যদি আপিল বিভাগ বহাল রাখে তাহলে দলটি ভবিষ্যতে নির্বাচন করতে পারবে না। রাজনৈতিক দল হিসেবেও এর আর অস্তিত্ব থাকবে না। এমন জীবন-মরণ পরিস্থিতিতে এই দলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত বিএনপি অত্যন্ত কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। তারা এ বিষয়ে কোনোরকম মন্তব্য না করে বিষয়টিকে এড়িয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। এদিকে জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল এবং দলটির নেতাদের যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ আখ্যায়িত করে বাংলাদেশে হস্তক্ষেপ করার জন্য মুসলিম বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামী। এর আগে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে জামায়াত নেতা গোলাম আযমের ৯০ বছরের কারাদণ্ড হওয়ার পর পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মীর তাকে সে দেশের ‘জাতীয় বীর’ আখ্যায়িত করে এই দণ্ডের বিরোধিতা করেছেন। তিনি গোলাম আযমের মুক্তি ও বিদেশে তার চিকিত্সার ব্যাপারে চাপ প্রয়োগের জন্য পাকিস্তান সরকারকে ভূমিকা পালনেরও আহবান জানিয়েছেন। লেখক : কলামিষ্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন