সরকারি দল এবং বিরোধী দলের মধ্যে উত্তেজনার পারদ আবার চড়েছে। ঈদ পরবর্তী দেশের রাজনীতিতে সংঘাতের আলামত স্পষ্ট। এই মুহূর্তে প্রধান দু’দলের মনোভাবই খানিকটা হিংসাত্মক। জামায়াতও বেশ চড়া। এ পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ দেশ যুদ্ধ উন্মুখ বলে উল্লেখ করেছেন। এ আশঙ্কায় তাঁরা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি উত্তেজিত না হওয়ার আহবান জানিয়েছেন। দলের ভেতরে বাহিরে অনেক রাজনীতিকও এ সংঘাতময় পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত। এ পরিস্থিতিতে এটা তো ঠিক এখনই বিএনপি-আওয়ামী লীগ যুদ্ধ (বিবাদ) শুরু হলে তাতে কতক নেতা লাভবান হবেন কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে গোটা দেশের সাধারণ মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি। বরাবরই আমাদের নেতাদের ইচ্ছা থাকে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় গিয়ে গদি দখলের। আর এটাই এদেশের পেছনের ইতিহাস। কিন্তু জনতার ইচ্ছাকে তাদের গুরুত্ব দেওয়া দরকার। দেশের স্বার্থ দেখা দরকার। কিন্তু তারা কখনই সে কাজটি করবেন না। তাই এ দেশের আমজনতাকেই উদ্যোগী হতে হবে যাতে উত্তেজনা এড়িয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা যায়। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা করলেও জনগণকে এ পথ থেকে বিরত থেকে যারা দেশকে তপ্ত করতে চায় এবং যাদের জন্য দেশ তপ্ত হচ্ছে তাদের বর্জন করা। জনগণকে তাদের না বলা। আসলে আমাদের রাজনৈতিক প্রধানগণ যেভাবে চাইছেন, এভাবে দেশ চলে না; চলতে পারে না। দেশের স্বার্থে কাউকে না কাউকে ছাড় দিতে হবে। হয় প্রধানমন্ত্রী নয়তো বিরোধীদলীয় নেত্রীকে ছাড় দিতে হবে। তবেই হয়তো দেশবাসী সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পাবে।
গত কয়েক দিন ধরে আমরা যা দেখছি তাতে দেশবাসীর স্থির আর স্বস্তিতে থাকবার কথা নয়। দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের এই পাল্টাপাল্টি হুঙ্কার আর অবস্থানের কারণে ঈদ-পরবর্তী রাজনীতি সংঘাত ও সংঘর্ষের দিকেই যাচ্ছে তার হিসাব নিকাশ সরল অংকের মতই পরিষ্কার। ইতিমধ্যে এনিয়ে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন দেশবরেণ্য রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা। আমাদের বিরোধী দলগুলো নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় অনড় অবস্থানে রয়েছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তাদের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াত নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এবার নাকি সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামবে। পাশাপাশি সম্ভাব্য ক্ষমতার ভাগীদার হতে এতদিনের নিষ্ক্রীয় নেতা-কর্মীরাও সক্রিয়ভাবে মাঠে নামবে। আর এ দাবি মেনে নিলে ক্ষমতাসীন দলগুলো রাজনৈতিকভাবে কোণঠাঁসা হয়ে পড়বে। ভেঙে পড়বে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মনোবল। এ অবস্থায় দুই প্রধান রাজনৈতিক জোটের মধ্যে আপাতত কোনো সমঝোতার সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ফলে উভয় জোটের অনড় অবস্থানের কারণে এবং রাজনৈতিক মাঠ দখলের প্রতিযোগিতার উত্তাপ ক্রমেই সংঘাতের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে রমজান ও ঈদ শেষ হতে না হতেই গড়াবে মধ্য আগস্ট। এরপর তাই হাতে সময় বলতে দেড়-দু’মাস। এ সময়টিই কাজে লাগাতে চায় বিএনপি। কঠোর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আদায় করে নিতে চায় নিজেদের দাবি। বিপরীতে বসে থাকার পাত্র নয় আওয়ামী লীগও। দুই পক্ষেরই এমন অনড় অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে কঠিন সময়ের। আর সে সময় শুরু হচ্ছে ঈদের পরপরই। ঈদের পর কার্যত সরকারের মেয়াদ থাকছে মাত্র দুই মাসের মতো। তাই বিএনপি চাইছে, এই সময়ের মধ্যে দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করতে। এতে তারা সফল হলে আন্দোলনের ফসল ‘নির্বাচনী বিজয়’ খুব সহজে তাদের ঘরে উঠবে। অন্যথায় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মনোবল অটুট রাখা যাবে না। বিএনপি নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, সমপ্রতি দেশের পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে দলের নিরঙ্কুশ বিজয় এবং ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবিতে দল এখন চাঙ্গাবস্থায় রয়েছে। এ বিজয়ের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি জনমতও এখন বিএনপির অনুকূলে এসেছে। পাশাপাশি সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে প্রশাসনসহ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সংস্থাও এখন সরকারের অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দাবি আদায়ের আন্দোলন সফল করতে দলকে সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী করে সঠিক নেতৃত্ব দিতে পারলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আদায় করা সম্ভব হবে। আর এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমান্ড ইতিমধ্যে রমজান মাসকে সাংগঠনিক মাস ঘোষণা করে দলকে ঢেলে সাজানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
আসন্ন সংঘাত এড়াতে সংলাপের কথাও শোনা যাচ্ছে। সরকার এবং বিরোধীদের হুঙ্কারের ধরনে আপাতত মনে হচ্ছে, সংলাপ নয়; সংঘাতই দেশবাসীর কপালের লিখন হয়ে আছে। সংঘাত কোনো সভ্য সমাধান নয়, গণতান্ত্রিক সমাধান তো নয়ই। তবু দেশে সংঘাত হয়; হচ্ছে; আগামীতে হবেও। এই সংঘাত তীব্র ও দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে, দারিদ্র্য বাড়বে, জনজীবন অচল হবে, জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী হবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান এবং কার্যনির্বাহী অঙ্গগুলো মারমুখী হয়ে পড়বে। ব্যর্থ রাষ্ট্র হবে বাংলাদেশ। দেশটা দরিদ্র থেকে আরো দরিদ্র রাষ্ট্রে পরিণত হবে। যাঁরা দেশটাকে নিয়ে ভাবেন, দেশটার ভবিষ্যত্ নিয়ে স্বপ্ন দেখেন তাঁরা এগিয়ে এলে হয়তো কিছু একটা হতে পারে। সফল সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান দলগুলোর জন্য যেমন মঙ্গল; তেমনই মঙ্গল রাষ্র্ব এবং জনগণের। তবে সে সংলাপ হতে হবে খোলা মন নিয়ে। যে সংলাপে থাকবে কেবল দেশের আর জনগণের স্বার্থ। অন্যসব স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে হবে। এখানে কিছুতেই ব্যক্তি কিংবা দলের স্বার্থ প্রাধান্য পাবে না। সংলাপ হোক, গণতন্ত্রের জন্য; সংলাপ হউক সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে। সংলাপের প্রশ্নে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে দু-তিন বিকল্প আছে, যেমন নির্দলীয় সরকার, দুই বড় দলের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দল দুটি যদি সুন্দর এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচনে একমত হয় এবং সেটিই তাদের মূল লক্ষ্য থাকে, তাহলে সংলাপ হতে পারে সংসদে বা বাইরে। কিন্তু আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে কিছুতেই তা হবার নয়। আমাদের বড় রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রীদের ছাড় না দেয়ার মনোভাব সংলাপের পথ রুদ্ধ করছে। তাই দেশ এগুচ্ছে একটি সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে। মনে হচ্ছে আবার জ্বালাও পোড়াও হবে, হরতাল অবরোধ হবে। এসব কিন্তু দেশের জনগণ চায় না। আর তারা চায় না রাজনৈতিক দলাদলি আর ডলাডলিতে পিষ্ট হতে। তারা সংঘাত চায় না। তারা চায় সমঝোতা। চায় সঠিক নিরপেক্ষ নির্বাচন। আর এজন্য দরকার সমঝোতার । আর সফল সংলাপের মাধ্যমেই সংঘাত দূর হওয়া সম্ভব।
দেশের বিরাজমান সংশয় সন্দেহপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দৃষ্টে মনে হয়, যে দুটি বৃহত্ রাজনৈতিক দল ওই ১/১১’র কঠোর অগণতান্ত্রিক শাসনে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল সম্ভবত আজ তারাই তা সম্পূর্ণভাবেই ভুলতে বসেছে। সেই দুঃস্বপ্নের ইতিহাস থেকে দল দুটির নেতা-নেত্রীরা বিন্দুমাত্র অভিজ্ঞতা সংগ্রহ করেননি এটিই আজ সকলকে অত্যন্ত অসহায়ের মতো প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। দেশের সুশীল সমাজ এতে উদ্বিগ্ন বোধ করছেন, লেখক-সাংবাদিকরা চিন্তান্বিত হয়ে নেতা-নেত্রীদের কাছে কতই না আকুল আবেদন জানিয়েছে সংলাপে বসে আপস- আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করুন- নইলে বিপদ ঘনিয়ে আসতে পারে। তাই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সংলাপের পরিবেশ সৃষ্টিতে তত্পর হয়ে উঠেছে বিদেশি কূটনীতিকরা। দুই পক্ষের সমঝোতার আগে সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব যাতে না ঘটে তা নিশ্চিত করতে বিরোধী দলসহ রাজনীতির সব পক্ষকে সংযত আচরণেরও অনুরোধ জানাচ্ছেন তারা। ২০০৭ সালের মতো সংঘাতময় পরিস্থিতির সুযোগে যাতে আরেকটি ওয়ান-ইলেভেনের উদ্ভব না হয়, তা নিশ্চিত করতে সুপরামর্শের পাশাপাশি দুই পক্ষকে আলোচনায় বসতেও উদ্বুদ্ধ করছেন বিদেশি কূটনীতিকরা। ঢাকার দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচন কার অধীনে অনুষ্ঠিত হবে সে সম্পর্কে এখনো ঐকমত্যের সৃষ্টি না হওয়ায় বন্ধু দেশগুলোর কূটনীতিকরা উদ্বিগ্ন। বন্ধু দেশগুলো চায় এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি থেকে বাংলাদেশ বেরিয়ে আসুক। নানা কারণে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের কাছে বাংলাদেশ এখন প্রাধান্য পাচ্ছে। মডারেট মুসলিম দেশের যে ভাবমূর্তি বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছে তা প্রশংসার দাবিদার। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ হয়ে উঠবে আরেকটি চীন। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দায়িত্ব অবশ্যই বাংলাদেশের রাজনীতিকদের ওপরও বর্তায়। সুবুদ্ধি ও সুবিবেচনাই এ ক্ষেত্রে হতে পারে তাদের পাথেয়।
লেখক: mvsevw`K
