[ আ লো ক পা ত ]

গ্রামীণ ব্যাংক, সরকার ও ড. ইউনূস প্রসঙ্গ

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:২৪
কোন কোন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তির সংগে সংশ্লিষ্ট সেই দেশের সমাজ, সরকার কিংবা রাজনীতিকদের মতবিরোধ বা দ্বন্দ্ব বিরল কোন ঘটনা নয়। অর্থনীতি শাস্ত্রে ভারতীয় নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন কয়েক সপ্তাহ (সিএনএন-আইবিএন সাক্ষাত্কার) আগেও বলেছেন, “আমি চাই না নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রধানমন্ত্রী হোক। কেননা তার ধর্মনিরপেক্ষতার পরিচিতি নেই। ভারতীয় নাগরিক হিসাবে আমি চাই না তিনি আমার প্রধানমন্ত্রী হোন”। নরেন্দ্র মোদী সম্পর্কে এখানে বেশি কিছু বলার নেই। তিনি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদী হিসেবে পরিচিত এবং ভারতীয় জনতা পার্টির প্রভাবশালী নেতা। ২০০২ সালের গুজরাট সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই হাজার ব্যক্তি নিহত হয়েছিল, যেখানে মোদীর সংশ্লিষ্টতার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন অত্যন্ত সাহসের সংগেই তার এই মত ব্যক্ত করে ভারতীয় গণতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষতার গর্বের দিক বিশ্ববাসীকে জানান দিতে দ্বিধা করেননি। যদিও বিজেপির কোন কোন নেতা প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে অমর্ত্য সেনকে ভারত সরকারের দেয়া সর্বোচ্চ খেতাব ‘ভারত রত্ন’ প্রত্যাহার করে নেয়া উচিত বলে মন্তব্য করলে অমর্ত্য সেন জবাবে বলেছেন, ‘ভারত রত্ন’ সম্মাননা প্রত্যাহার করা হলেও আমার আপত্তি নেই। তার এই দৃঢ়তা প্রগতির পথে, কল্যাণের পথে শক্ত প্রতিজ্ঞারই প্রতিফলন। যদিও এতে বিজেপির অসন্তুষ্টির কারণ ঘটেছে। এখানে ইরানের আরেক নোবেল বিজয়ি শিরিন এবাদীর প্রসঙ্গ টানা যায়। তিনি হচ্ছেন গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রবক্তা, ২০০৩ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন অবিরাম গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অবদানের জন্য। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৯ সালে ইরান সরকার তাঁর নোবেল পুরস্কার বাজায়াপ্ত করেছে, যদিও পরবর্তীকালে সরকার আবার তা অস্বীকারও করেছে। শিরিন এবাদী ২০০৯ সাল থেকেই সরকারের বিরূপ আচরণের বাস্তবতায় যুক্তরাজ্যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। ২০০৪ সালে শিরিন এবাদী ‘ফোর্বস’ ম্যাগাজিন কর্তৃক বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ জন মহিলার তালিকায় উল্লিখিত হয়েছেন। তাঁর স্বীকৃতি ও আদর্শ প্রচারের বাইরে রাষ্ট্র ও সরকারের বিরুদ্ধে শিরিন এবাদী কখনো কোন মন্তব্য বা প্রচার-প্রচারণা চালিয়েছেন বলে জানা যায় না। শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির কথা সবারই কম-বেশি জানা। তিনি ১৯৯১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হন। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল গোল্ড মেডালেও তিনি ভূষিত হন। ভারত সরকার থেকে পেয়েছেন জওয়াহার লাল নেহরু এওয়ার্ড। সুচি বার্মার ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সংসদে ৮১ শতাংশ আসনে বিজয়ী হলেও ক্ষমতাসীন হতে পারেননি। নির্বাচনের পূর্বেই তাঁকে গৃহবন্দী করা হয় এবং সামরিক সরকার নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে। সেই গ্রেফতার থেকে নোবেল জয়ী সুচি দীর্ঘ ১৫ বছর বন্দী জীবন কাটান। নোবেল বিজয়ীরা, বিশেষভাবে শান্তিতে যারা নোবেল পেয়েছেন, অনেক রাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। অনেককে নিগ্রহ সহ্য করতে হয়েছে। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে দেশবাসী আনন্দিত, উত্ফুল্ল, উদ্বেলিত হয়েছে। রাষ্ট্র বা সরকার পর্যায় থেকে এ নিয়ে কেউ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করার কোন কারণও ছিল না, করেনিও কেউ। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে তা নৈর্ব্যক্তিকভাবে আমরা বিবেচনা করে দেখতে পারি। ১৯৭৬ সালের দিকে প্রফেসর ইউনূস চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন জোবরা গ্রামে প্রথমে নিজস্ব অর্থে তেভাগা গ্রাম সমবায় সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৭৫-৭৬ সালেই এফএও ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে গৃহীত হয় ভূমিহীন, ক্ষুদ্র প্রান্তিক চাষিদের দলভিত্তিক ঋণ প্রদানের কার্যক্রম নিয়ে এসার্ড প্রকল্প (Asian Survey of Agrarian Reform and Rural Development; ASARRD; FAO ব্যাংক আঞ্চলিক অফিস কর্তৃক গৃহীত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিলিপাইনে বাস্তবায়নাধীন ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প)। বার্ড, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে তিনটি উপ-প্রকল্প এলাকা নিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্প গৃহীত হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এফএও প্রদত্ত সীড মানির বিপরীতে জনতা ব্যাংক ক্ষুদ্র চাষি, প্রান্তিক কৃষক ও ভূমিহীনদের নিয়ে গঠিত ৫ থেকে ২০ জন সদস্যের দলভিত্তিক জামানতের ভিত্তিতে ব্যবসা ও ক্ষুদ্র উত্পাদন উদ্যোগে ঋণ দিতে শুরু করে। আমি নিজে এই এসার্ড প্রকল্পের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রকল্প সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করি ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত। ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক এই প্রায়োগিক গবেষণা প্রকল্পের প্রতিটি গ্রামের জন্য একজন একশন রিসার্চ ফেলোকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ক্ষুদ্র ঋণভিত্তিক দলগুলোর ঋণের ব্যবহার দল পরিচালনা ও সঞ্চয় কার্যক্রমে পরামর্শ ও সর্বোপরি দলভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবহার সফলতা নিয়ে গবেষণা করার জন্য। দলভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণের কার্যকারিতা ও সফলতা মূল্যায়নে প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে উপ-প্রকল্প এলাকাগুলোতে কর্মশিবির বা সেমিনার অনুষ্ঠিত হতো। বার্ডে এ ধরনের বার্ষিক মূল্যায়ন সেমিনারে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যোগ দিয়েছিলেন এবং এর কার্যক্রম সম্পর্কে বিশেষভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। দলভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণের ধারণাটা তিনি প্রয়োগ করেন জোবরা তেভাগা কৃষি সমবায় সমিতিতে এবং ১৯৭৮ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত স্বনির্ভর আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা মাহবুবুল আলম চাষীর সাথে স্বনির্ভর বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মশালায়ও ড. ইউনূসকে তখন দেখা যায়। ১৯৭৮ সালে কৃষি ব্যাংকের প্রকল্প হিসেবে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু। পরবর্তীতে ১৯৭৯-১৯৮২ সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকল্প হিসাবে পরীক্ষামূলক টাঙ্গাইল জেলায় কাজ শুরু এবং ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংক’ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। গ্রামীণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় প্রতিটি সরকারের সমর্থন ও সহায়তা ছিল এর পেছনে। জোবরা গ্রাম থেকে টাঙ্গাইল জেলায় বিস্তৃতি পর্যন্ত ড. ইউনূসের সৃজনশীলতা কঠোর পরিশ্রম প্রাতিষ্ঠানিক পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দাঁড় করিয়ে তিনি গবেষক, উন্নয়নকর্মী এবং অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি বিকাশে আগ্রহী চিন্তাবিদ, গবেষক এনজিও সমর্থক গোষ্ঠীর সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণে সমর্থ হন। গ্রামীণ ব্যাংকের বিভিন্ন মেয়াদি আয় বর্ধনমূলক কাজের জামানতবিহীন (স্থাবর সম্পদের বিপরীতে দলীয় চাপকে জামানতের বিকল্প হিসাবে দাঁড় করানোর ধারণা এসার্ড প্রকল্প থেকে গৃহীত) ঋণ প্রদান এবং ৯৬-৯৯ শতাংশ নিয়মিত ঋণ আদায়ের সফলতায় গ্রামীণ উন্নয়নে এক নতুন দিগন্তের উদ্বোধন ঘটান। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা (২০১১) প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রামীণ ব্যাংকের বর্তমান শাখার সংখ্যা ২৫,৬৫০টি এবং সারা বাংলাদেশে গ্রাম অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ৮১,৩৭৭ এবং ঋণ সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৮৩,৫৪,৭৫৪ জন। এর মধ্যে মহিলা ৮০,৫২,৯০৫ এবং বাকিরা পুরুষ সদস্য। গড় ঋণ আদায়ের হার ৯৭%। মহিলাদের সংখ্যাই বলে দেয় গ্রামীণ ব্যাংক নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে সবিশেষ ভূমিকা রেখেছে। এখানে উল্লেখ্য যে, ২০১০ জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশে দরিদ্রের সংখ্যা ৪ কোটি ৭০ লক্ষ, যার মধ্যে ৮৩ লক্ষকে গ্রামীণ ব্যাংকের আওতায় আনা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. ইউনূস দলভিত্তিক ক্ষুদ্র ঋণ মডেলের সফলতার জন্য প্রথম পুরস্কৃত হন ১৯৮৫ সালে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক’ পুরস্কারে। পরবর্তীতে ২০০৬ সালে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কার নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রামীণ ব্যাংক এবং ড. ইউনূস যৌথভাবে অর্জন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনিই প্রথম এই সর্বোচ্চ গৌরব অর্জনে সমর্থ হন। ড. ইউনূসের বিশাল সম্মান অর্জনের পর কিছুটা মোড় ঘুরানো ঘটনার জন্ম দেন তিনি নিজেই ২০০৭ সালে। ২০০৬ ছিল সাধারণ নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের তুঙের বছর। বিচারপতিদের অবসরের বয়স ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করার ফলে স্পষ্ট হলো যে, ক্ষমতাসীন দল তাদের পছন্দের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি (একদা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির আইন সম্পাদক) কে এম হাসানকে তত্ত্ববধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির জন্য সে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। জনাব কে এম হাসান আন্দোলনের এক পর্যায়ে অস্বীকৃতি জানালে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয় যে, দলীয় রাষ্ট্রপতি জনাব ইয়াজ উদ্দীন আহমেদ একই সংগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেন। সময়টা ছিল আন্দোলন-সংগ্রামে উত্তাল। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনের দিকে ইয়াজ উদ্দীন সাহেব এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ইয়াজ উদ্দীন সাহেবের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে তাঁরই নিয়োজিত একাধিক উপদেষ্টা তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে পদত্যাগ করলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। তেমনি একটা টালমাটাল সময়ে ড. ইউনূস তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান রাষ্ট্রপতি ইয়াজ উদ্দীন আহমেদের সে সময়ের কর্মসম্পাদনকে মূল্যায়ন করে মন্তব্য করেন যে, ড. ইয়াজ উদ্দীন আহমেদের কার্যক্রম তাঁকে মূল্যায়ন করতে বলা হলে তিনি নিঃসন্দেহে ড. ইয়াজ উদ্দীনকে চমত্কার কার্যসম্পাদনের জন্য এ+ দেবেন। বৈদ্যুতিক মিডিয়ায় সে মন্তব্য ফলাও করে প্রচারিত হয়। ড. ইউনূসের সে মন্তব্যের স্বল্পমেয়াদি, দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য না জানা গেলেও রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা সংক্ষুব্ধ দেশবাসীর একটা বিশাল অংশ সেদিন সে মন্তব্যে আহত ও সংক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। জানুয়ারি ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সামরিক হস্তক্ষেপে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে কিছুদিন পর ড. ইউনূস ইচ্ছা প্রকাশ করে যে, তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করবেন এবং তাতে দেশবাসীর সমর্থন কামনা করেন। পাড়ায়-মহল্লায় কমিটি গঠন করে ড. ইউনূসকে লিখিতভাবে কিংবা ই-মেইলে জানানোর জন্য অনুরোধও করা হয়। গ্রামীণ ব্যাংকসহ অন্য কোথা থেকে সে ডাকে কিরকম সাড়া পড়েছিল সে কথা ড. ইউনূস ভালো বলতে পারবেন। তবে এক পর্যায়ে ঘোষণা এল তিনি রাজনীতিতে আসছেন না। সেখানেই থেমে যায় তাঁর রাজনৈতিক অভিলাষ। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি প্রথমেই দেশের জন্য কি কি করবেন তেমন একটি ইচ্ছা তালিকা দিয়ে পত্রিকায় নিবন্ধও লিখেছিলেন। যাই হোক, সে সময় ড. ইউনূস রাজনীতিতে এলে কি পরিবর্তন হতো তা এখন আর বলার উপায় নেই। তবে দুই নেত্রীর অপসারণ ও তৃতীয় শক্তির উত্থানে ড. ইউনূসের আকাঙ্ক্ষা ও উত্সাহ ছিল, এমনটাই সেদিন অনেকে মনে করেছেন। ড. ইউনূসের প্রচলিত প্রথার বাইরে এই ভূমিকাকে আজো রাজনৈতিক মহলের কোন কোন অংশে সন্দেহের চোখে দেখা হতে পারে, যে দায় ড. ইউনূস এড়াতে পারেন না। আজ থেকে সোয়া দুই বছর পূর্বে ১২ মে, ২০১১ তারিখে ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, একটি বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকের (গ্রামীণ ব্যাংক) ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের পদে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৬০ বছর এবং এই শর্ত মোতাবেক ড. ইউনূস সাহেবের অবসর গ্রহণের মেয়াদ ১৯৯৯ সালেই শেষ হয়ে যায়। গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশ অনুযায়ী এমডি নিয়োগের দায়িত্ব পরিচালনা পর্ষদের। পরিচালনা পর্ষদ, যার প্রধান আবার এমডি বারবার নিজের চাকরিকালের মেয়াদ বৃদ্ধি করতে থাকেন। যদিও পরিচালনা পর্ষদের সুপারিশের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে থাকে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বয়সের এ বিষয়টি দীর্ঘদিন কেন বিবেচনায় নেয়নি সেটা কি স্বচ্ছতার অভাব, না অদক্ষতা, না অসাবধানতাবশত ঘটেছে তা বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাখ্যা দিতে পারে। আবার পরিচালনা পর্ষদের কোন সুপারিশ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিয়েছে নথিতে এমন রেকর্ড নেই। বস্তুত বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই ড. ইউনূস ১১ মে ২০১১ পর্যন্ত প্রায় বার বছর গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির দায়িত্ব পালন করেণ, যা ছিল গ্রামীণ ব্যাংকের অধ্যাদেশেরই ব্যত্যয়। যাই হোক, ২০১১ সালে এসে বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে গ্রামীণ ব্যাংকের এমডিকে তার নিজ দায়িত্ব থেকে অপসারণের বিষয়টি জানিয়ে দেয়া হয়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ড. ইউনূস আদালতে নিয়ে যান। সমস্ত কিছু পর্যালোচনায় মহামান্য আদালত বাংলাদেশ ব্যাংকের এমডি অপসারণের বৈধতার পক্ষে রায় দেন। গ্রামীণ ব্যাংকের বহু পূর্বে গৃহীত অধ্যাদেশ অনুযায়ীই ড. ইউনূস এমডি হিসেবে আর ফিরতে পারেন না। ড. ইউনূস সরকারের বিরুদ্ধে গ্রামীণ ব্যাংকের ধ্বংসের অভিযোগ উত্থাপন করছেন। ২০১১ সালের পর থেকে তিনি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর তিনি আরো সোচ্চার হয়েছেন। কোন কোন রাজনৈতিক মহলের সহানুভূতি অর্জনের চেষ্টাও তিনি করে যাচ্ছেন। ড. ইউনূস অবশ্যই বাংলাদেশের গর্ব। বিশ্ব দরবারে তিনি নন্দিত পুরুষ। বঙ্গবন্ধুর পর তিনিই বাংলাদেশকে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি পরিচিত করেছেন। তাঁর সামাজিক ব্যবসার ধ্যান- ধারণা আজ পুঁজিবাদী বিশ্বেও প্রায় সর্বত্রই বড় আলোচনার বিষয়। অনেকে অবশ্য এ প্রশ্নও করেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা শহর ডেট্রয়েট দেউলিয়া ঘোষিত হলো, ব্যবসা-বাণিজ্য লাটে উঠলো, শহরের লোকসংখ্যা ব্যবসা-বাণিজ্যের অভাবে অন্যত্র সরে যাচ্ছে, সেখানে সামাজিক ব্যবসার প্রয়োগ হলো না কেন? যাই হোক, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ধ্বংসের যে কথা বলছেন তা কতটা বাস্তবানুগ। গত সোয়া দুই বছরে ভিন্ন এমডির ব্যবস্থাপনায় চলার পরেও গ্রামীণ ব্যাংক কোথাও বন্ধ হয়েছে, আমানত খুইয়েছে, অনিয়ম হয়েছে এমন কোন প্রতিবেদন পত্র-পত্রিকায় দেখা যায়নি। তাহলে তাঁর ক্ষুব্ধতা কিংবা অভিযোগ কি কেবলই আবেগপ্রসূত? ক্ষুব্ধতা বলছি এ কারণে যে, সম্প্রতি তিনি সরকারকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লক্ষ সদস্য ভোটার এবং গ্রামীণ সদস্যদের পরিবারেও ভোট রয়েছে। তাহলে ধরে নিতে হয় গ্রামীণ ব্যাংকের সবাই ভোটের ব্যাপারে জোটবদ্ধ। বাস্তবে সম্ভবত তা নয়। ড. ইউনূস সেন্টারের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গ্রামীণ ব্যাংক সদস্যদের মধ্যে ১৩ জন চেয়ারম্যান, সংরক্ষিত মহিলা আসনে ৪০২২ জন সদস্য, উপজেলা নির্বাচনে ৯৮ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান, পৌরসভা নির্বাচনে ১ জন চেয়ারম্যান ও ১৪৮ জন কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। ড. ইউনূস যদি বিশ্লেষণ করে দেখেন দেখবেন এদের বেশিরভাগ স্থানীয় সরকারের নির্বাচনী বিগত ধারা অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সমর্থক, তারপর বিএনপি এবং জাতীয় পার্টিও রয়েছে এর মধ্যে। তারা যদি এতটা একতাবদ্ধই হতেন, তাহলে প্রশ্ন উঠে ২০০৭ সালে তিনি রাজনীতিতে নেমেও পশ্চাত্পদ হলেন কেন? যাই হোক, জনসমর্থিত একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত জনকল্যাণমুখী একটি সংগঠন ধ্বংস করতে চান এটি সাধারণভাবে বিশ্বাস করা কঠিন। প্রশ্ন উঠে, সরকার যদি আক্রমণাত্মক হতো, তাহলে তিনি তাঁর এই অবসরকালীন সময়েও গ্রামীণ ব্যাংক ভবনের ১৬ তলায় ইউনূস সেন্টার স্থাপন করে গ্রামীণ ব্যাংকের দৈনন্দিন প্রশাসনকে প্রভাবিত করে চলেছেন কিভাবে? ড. ইউনূস ব্যতিক্রমী ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব হলেও তিনি চিরকাল থাকবেন না। তাঁর অবর্তমানে কি গ্রামীণ ব্যাংক চলবে না? প্রত্যাশা রাখি অবশ্যই চলবে। আর যদি নাই চলে তখন মেনে নিতে হবে গ্রামীণ ব্যাংকের কাঠামোগত দুর্বলতা ছিল। এর আকাশচুম্বী প্রচার-প্রচারণায় সময় দিতে গিয়ে এর স্রষ্টারা সেই দুর্বলতা কাটানোর মতো একে গড়ে তোলেননি। সুখ্যাতির শীর্ষে উঠা এই প্রতিষ্ঠানটি এর স্রষ্টা কিংবা পৃষ্ঠপোষকদের রাজনীতিকায়নে ধ্বংস না হোক, কায়মনোবাক্যে এ প্রার্থনা থাকবে সকল সচেতন দেশবাসীর। আমার নিজেরও। কামনা করি ড. ইউনূস দীর্ঘজীবী হোন এবং আমৃত্যু আমাদের হূদয়ের সম্মাননার আসনে মহীয়ান থাকুন। বলার অপেক্ষা রাখে না, অর্থমন্ত্রী একজন সজ্জন ও সাদামনের মানুষ। গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে কোন পরামর্শ থাকলে ড. ইউনূস তাকেই দিতে পারেন। পত্রিকায় লিখেও তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের উত্কর্ষ ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পরামর্শ রাখতে পারেন। বয়সের বাধ্যবাধকতার কারণেই তিনি সরাসরি গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় আর যেতে পারবেন না। দেশের বিধি-বিধান প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা সকলের জন্যই সমানভাবে প্রয়োগ বাঞ্ছনীয় এবং প্রযোজ্য। অনেকেই মনে করেন সামাজিক ব্যবসার প্রত্যয়টিকেই জনপ্রিয় করতে এবং সেটার বিশ্বায়নে মনোনিবেশ করতে পারেন ড. ইউনূস। নোবেল বিজয়ের নতুন ভিত্তি হতে পারে সেটাও। সে সম্ভাবনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। লেখক:অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন