বিশ্ব ব্যাংক হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সমীক্ষায় বাংলাদেশের দারিদ্র্য অনেক কমিয়া আসার তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গিয়াছে। ১৯৮২ সালে ৭৮ শতাংশ মানুষ গরিব ছিল বাংলাদেশে, যাহা ২০১০ সালে নামিয়া আসে ৩১.৫ শতাংশে। এই নামিয়া আসার হার নিঃসন্দেহে উত্সাহব্যঞ্জক। তাহার পরেও দেশের এই ষোল/সতের কোটি মানুষের এক বিশাল অংশ এখনো গরিব। তাহার মানে শতাংশের হিসাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হইলেও এখনো বিরাট সংখ্যক মানুষ গরিব এই দেশে। ফলে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়া আত্মতুষ্টির সুযোগ নাই আমাদের। আয় বৈষম্য বাড়িবার প্রবণতা দেখা না গেলেও তাহা কিন্তু এখনো কমিতে শুরু করে নাই। তবে এই কথা সত্য যে, আমাদের প্রবৃদ্ধির সুফলের একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষজন, যাহারা এক সময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাহিরে অবস্থান করিত, তাহারা পাইতেছেন। তাহার মানে আমাদের প্রবৃদ্ধি দারিদ্র্যবান্ধব। ফলে অবশ্যই আমাদেরকে প্রবৃদ্ধির দিক হইতে যে অভীষ্ট লক্ষ্য উহাকে অর্জন করিতে হইবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হইতে অর্জিত সুবিধার বণ্টন আরো দারিদ্র্যবান্ধব হইলে দারিদ্র্য বিমোচন গতিপ্রাপ্ত হইবে। বণ্টন ব্যবস্থা আরো দারিদ্র্যবান্ধব করা সম্ভব বাজার অর্থনীতিতে, তাহা ভাবিতে হইবে আমাদেরকে। ইহার নজির উন্নত বিশ্বে অনেক থাকিলেও আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে খুব বেশি একটা নাই।
বণ্টন ব্যবস্থায় গরিব-দুঃখী মানুষের অংশীদারিত্ব বাড়াইতে হইলে আমাদেরকে বাজার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের ও দেখভালে নিয়োজিত ব্যবস্থা শক্তিশালী করিতে হইবে। বাজার ব্যবস্থাকে সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক করিতে হইবে। শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতার অভাব থাকিলে শ্রমিক/কর্মজীবী মানুষ অর্থাত্ তাহাদের অংশ ছোট হইয়া আসে। অন্যদিকে, তাহারা যখন অর্জিত আয় নিয়া ভোগ্যপণ্য কিনিতে যায় তখন ভোগ্যপণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব থাকিলে বেশি দামে পণ্য কিনিতে হয়। তাহার মানে উত্পাদনকারী/শিল্পপতি একদিকে তাহাদের শ্রমের মূল্যে ঠকাইতে পারে, আর আরেকদিকে উচ্চ পণ্যমূল্যের মাধ্যমে তাহাদের প্রকৃত আয় কমাইয়া দিতে পারে। সেইজন্য বাজার অর্থনীতি দেখভালের জন্য যে প্রতিষ্ঠান অর্থাত্ সরকার রহিয়াছে তাহাকে বাজারকে প্রতিযোগিতামূলক করিতে হইবে গরিব মানুষের স্বার্থে। পাশাপাশি কর রাজস্বের যে অংশ দারিদ্র্য বিমোচনের নিমিত্তে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করা হয় সেই অংশে সঞ্চালন যেন সঠিক হয় তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে। যাহার জন্য দরকার সুশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বকারী সরকার। তবে দরিদ্র মানুষের প্রতিনিধি হিসাবে সরকারের বিভিন্ন অঙ্গে যাহারা আসিতেছেন তাহারা মোটামুটিভাবে কেহই গরিব নন। যাহার ফলে গরিব মানুষের প্রতিনিধিত্বকারীরা সত্যিকার অর্থে গরিবদের পক্ষে বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন চান না বলিয়া বাজার অর্থনীতির উপর দোষ চাপাইয়া দায় সারিতে চান। মনে রাখিতে হইবে বাজার অর্থনীতি সত্যিকার অর্থে প্রতিযোগিতামূলক হইলে তাহা দারিদ্র্য বিমোচনের গতিকে ত্বরান্বিত করিবে।
