সমাজ ভাবনা

সামাজিক অবক্ষয় রোধ করতে হবে

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৭
বাংলাদেশে সমস্যার অন্ত নেই। কৃষির উন্নয়ন সম্ভব হয়নি, সমস্যা। শিল্পায়ন সম্ভব হয়নি, সমস্যা। পানি সেচের উন্নয়ন এবং বন্যানিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়নি, সমস্যা। যোগাযোগ ব্যবস্থা যথার্থ নয়, সমস্যা। সামাজিক নিরাপত্তা নেই, সমস্যা। রাজনৈতিক অস্থিরতা জনমানসের শান্তি কেড়ে নিচ্ছে, সমস্যা। প্রশাসনে দুর্নীতি, সমস্যা। অসাধু ব্যবসায়ীরা শিশুখাদ্যে ভেজাল দিচ্ছে, সমস্যা। যখন তখন নারী জাতি যত্রতত্র ধর্ষিত হচ্ছে, সমস্যা। লক্ষ লক্ষ মানুষ নিরন্ন, কাজ নেই, বেকার, সমস্যা। শিক্ষাক্ষেত্রে অরাজকতা, সমস্যা। প্রতিনিয়ত ভালবাসার মৃত্যু ঘটছে, সমস্যা। সমাজ থেকে দ্রুত মূল্যবোধ অপসৃত হচ্ছে, সমস্যা। অসম অর্থ বণ্টনে গরিব আরও গরিব হচ্ছে, ধনী আরও ধনী হচ্ছে, সমস্যা। অর্থনীতির স্বাধীনতা না থাকায় রাষ্ট্রীয় সমপদের উপর মানুষের দাবি নেই, সমস্যা। অসংখ্য রকমের সমস্যা আমাদের দেশের মানুষের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। কেড়ে নিয়েছে জীবনের সুখ-শান্তি, আনন্দ-ভালবাসা। প্রতিদিন পথচারী যন্ত্রদানবের চাকায় পিষ্ট হচ্ছে- মৃত্যুর ক্রন্দনের রোল আকাশ-বাতাসকে পরিব্যপ্ত করে রেখেছে। মানুষ দীর্ঘশ্বাস ত্যাগ করে অসহায় চোখে শূন্যের দিকে তাকিয়ে আছে—কোন ভরসা নেই। এ ভয়ঙ্কর সমস্যার মধ্যে আরও একটি বড় সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এ সাংঘাতিক সমস্যাটি এসেছে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং বস্তি ও শিল্পাঞ্চলের সমাজ থেকে। এ ভয়ঙ্কর সমস্যার শিকার ছাত্র-ছাত্রী, কিশোর-কিশোরী যাদের বয়স চৌদ্দ থেকে কুড়ির মধ্যে। আমার মনে হয় মানসিকতার বিচারে সেকাল এবং একালের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। সে সময় কিশোর-যুবককে উদ্দীপিত করার পরিবেশের অভাব ছিল। শিক্ষার বাতাবরণ ছিল, নিয়মের প্রাচীর ছিল, চলচ্চিত্রের আনন্দ পাওয়ার অধিকার সীমিত ছিল, টিভি, স্যাটেলাইট আবিষ্কার হয়নি। এসব ভাল প্রতিবন্ধকতা থাকায় সেকালের কিশোর-যুবক এবং কিশোরী-যুবতী যৌনঘটিত অপরাধ কম করত। সামাজিক পারিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকতা সেকালের কিশোর-যুবক এবং কিশোরী-যুবতীদের বিপদসঙ্কুল পথ অতিক্রম করতে সাহায্য করত। প্রাকৃতিক নিয়মের ভিতর দিয়েই ছেলে এবং মেয়ে বেড়ে উঠে। বেড়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশও ঘটে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিকাশের সঙ্গে মানসিক অনুভূতিরও প্রকাশ ঘটে। এভাবে পূর্ণতার দিকে দেহ-মন যদি এগোতে পারত এবং কোন বাধা না পেত তবে অপরাধের জন্মই হত না। কিন্তু এরা বর্তমান সমাজে এ বয়সেই ভোগের দিকে ছুটে চলেছে। আমাদের বেশিরভাগ কিশোর-যুবক বেশিরভাগ সময় যৌন চিন্তায় মগ্ন থাকে। কি করে এবং কি কৌশলে কিশোরী-যুবতীকে ভোগ করা যায়—এ ভয়ঙ্কর ভাবনায় ডুবে থাকে তারা এবং সুযোগের সন্ধান করে। এ স্বার্থপরতার জন্য একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা না থাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণ এসেছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য শিক্ষিত বেশিরভাগ দমপতির একটি বা দুটি করে সন্তান। বাবা-মা উভয়েই চাকরি করে। ঘর ফাঁকা। ছেলে বা মেয়ে একা থাকে। এ একা থাকার সুযোগটা ছেলেমেয়েরা গ্রহণ করে থাকে অনেক ক্ষেত্রে। এরা অসংযত, অস্থিরপরায়ণ এবং তীব্র কৌতূহলী। সেজন্য অপরাধমূলক কাজ এরা মুহূর্তের মধ্যেই করে ফেলে। এবার প্রশ্ন, এরা কেন ভয়ঙ্কর অপরাধ করে? অথবা এ ভয়ঙ্কর অপরাধ করার উদ্দীপক কারণগুলো কী? এখন পর্যালোচনা করে দেখি এসব পবিত্র বা সোনার টুকরো ছেলেমেয়েরা কেন এ পাপ কাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে? কিসের হাতছানি এদের বিপথগামী করছে? যে বয়স থেকে সংযম গড়ে উঠে, সংযমী হওয়ার অভ্যাস প্রতিদিন করতে হয়, ঠিক সে বয়সেই এদের কাছে উত্তেজক আহার সমাজ প্রতিনিয়ত যোগান দিচ্ছে। তারা দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে, হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাপে ডুবে যাচ্ছে। যে কারণগুলোর কথা আলোচনা করলাম, সেসব কারণ ছাড়া অন্য কারণও আছে। অন্যান্য কারণ সংক্ষেপে বিবৃত করছি। বেশ ক’বছর আগেও ছাত্র-শিক্ষকের সম্বন্ধ গুরু-শিষ্যের মতো ছিল। ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষক-শিক্ষিকাকে অত্যন্ত সমীহ করত এবং সঙ্গে থাকত ভক্তি মিশ্রিত শ্রদ্ধা। আজকাল আগেকার দিনের মতো আদর্শবান শিক্ষকের বড় অভাব, অভাব আদর্শবতী শিক্ষয়িত্রীর। নিয়ম ও শৃঙ্খলাপরায়ণ বিদ্যালয়েরও অভাব। অভাব আদর্শ পিতা-মাতার, অভাব ব্যক্তিত্বপূর্ণ অভিভাবকের। এখন দেখি শিক্ষকরা ভাই হয়ে গেছে। ভাইয়েরা যত্রতত্র কোচিং খুলে বসে আছে। ওমুক ভাইয়ের কোচিং-এ না পড়লে সব বিষয়ে ভাল নম্বর পাওয়া যাবে না। সেজন্য চলো ওমুক ভাইদের কোচিংয়ে। নিয়ম-শৃঙ্খলার বালাই নেই। কোচিংয়ে যাওয়ার বাহানা করে ছেলেমেয়েরা অকালে-অসময়ে পাপের ঘরে প্রবেশ করছে এমনও দেখা যায়। প্রতিবেদনটি শেষ করার আগে পিতা-মাতা, অভিভাবক এবং কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের একটি বিষয় স্মরণ করিয়ে দিতে চাই। সেটি হলো আবাসিক বিদ্যালয় ও হলসমূহ। এসব বিদ্যালয়/হলে পড়াশুনা এবং মানুষ হওয়ার সুন্দর বাতাবরণ যদি তৈরি করা যায়, যদি প্রতিনিয়ত ছাত্র-ছাত্রীদের ভালর দিকে চলার দিকনির্দেশনা থাকে, চরিত্র গঠনের পরিবেশ থাকে, তাহলে কোন ছেলেমেয়েই পিচ্ছিল পথে যাবে না। সবকটি ছেলেমেয়ে মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠবে—এটুকু আশা কি আমরা করতে পারি না? লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন