[আ ন্ত র্জা তি ক]

রুহানীর নেতৃত্বে ইরানী পররাষ্ট্রনীতির গতিময় অভিযাত্রা

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪২
৩ আগস্ট বৈশ্বিক সন্ত্রাসী হুমকির প্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ও নাগরিকদের নিরাপত্তা সতর্কতা জারির মুহূর্তে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সপ্তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে হাসান রুহানী শপথ গ্রহণ করেন। মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে স্বাভাবিকীকরণ বজায় রেখে ইরানের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ রুহানী ইরানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উন্নত বহিঃসম্মান অর্জন, অর্থনীতির গতিসঞ্চার, রাজনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের দুরূহ চ্যালেঞ্জ মাথায় নিয়ে নতুন প্রেসিডেন্টের যাত্রা শুরু। গত ১৪ জুনের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তাঁর রক্ষণশীল প্রতিদ্বন্দ্বীদেরকে পরাজিত করে শতকরা ৫০ ভাগ ভোটে ডক্টর হাসান রুহানী ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণের ম্যান্ডেট পান। প্রাক-নির্বাচনী প্রচারাভিযানে রুহানী পুরাতন ধারায় কট্টরপন্থা বর্জন করে মধ্যপন্থা অবলম্বন করে বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্কোন্নয়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। পূর্বসূরি মাহমুদ আহমাদিনেজাদের কট্টর পাশ্চাত্য বিরোধী অবস্থান ইরানকে আন্তর্জাতিক সমাজে একঘরে করে ইরানের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে যে সমূহ বিপর্যয় ঘটিয়েছে, তা থেকে উদ্ধারের ইশতেহার ঘোষণা করে তিনি তরুণ প্রজন্মের মাঝে “পরিবর্তনের” যে প্রত্যাশা জাগিয়েছেন, তা রুহানীর বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছে। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির বাস্তবতায় কি তিনি পরিবর্তনের সেই জোয়ার আনতে সক্ষম হবেন? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর তাঁবেদার ও পাশ্চাত্যের পরীক্ষিত বন্ধু শাহ্ এর শাসনের অবসান ঘটিয়ে মরহুম আয়াতুল্লাহ্ খোমেনীর বিপ্লবী সরকার ইরানের সরকার ও রাজনীতিতে যে নতুন ধারা শুরু করেন, তা প্রকৃতিগতভাবে শুধু বিপ্লবব্যঞ্জক নয় বরং সেই ব্যবস্থা রাজনৈতিক মতাদর্শ, কাঠামোগত বিন্যাস এবং সুদূরপ্রসারী লক্ষ্যের দিক থেকে ছিল সম্পূর্ণভাবে পাশ্চাত্যের কাছে অগ্রহণযোগ্য, অসহ্য, অস্বস্তিকর। গত একশত বছরের বিশ্বরাজনীতির অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিন্তভাবে বলা যায় যে, পাশ্চাত্যের অপছন্দনীয় কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় মিত্ররা কখনো শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার যোগ্যতা দেখাতে পারেনি। উদাহরণস্বরূপ, উসমানীয় খেলাফতের রাজনৈতিক মূলনীতি পাশ্চাত্যের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় নানা কৌশলে উসমানীয় খিলাফতের ধ্বংস সাধনে পাশ্চাত্য জগত্ একাট্টা হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাদেরকে মোক্ষম সুযোগ এনে দেয়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য জগত্ এক হয়ে ওসমানীয় খিলাফতের আওতাধীন রাষ্ট্রগুলোকে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে পাশ্চাত্যের শাসনবলয়ে ও প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজনৈতিক আদর্শ পাশ্চাত্যের সাথে বিরোধী হলে তারাও পাশ্চাত্যের রোষানলে পড়ে। কম্যুনিজমের নিপাত না হওয়া পর্যন্ত পাশ্চাত্য ক্ষ্যান্ত হয়নি। বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের (Counterveiling ideology) সাথে খাপ খাওয়াতে অনিচ্ছুক, অনভিজ্ঞ, যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্যের কাছে ইরানের পাশ্চাত্য বিরোধী রাজনৈতিক কাঠামো কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না, কিংবা সেই কাঠামোর সাথে পাশ্চাত্য কখনো খাপ খাওয়াতে (adjustment) সক্ষম হবে না। অর্থাত্ পাশ্চাত্যের সাথে ইরানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব মৌলিক, আদর্শিক, চৈতন্যিক। ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী ইরানের মৌলিক, রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে যেমন যেতে পারবেন না, তেমনি পাশ্চাত্যও ইরানের মতাদর্শগত বিকাশ সহ্য করবে না। ফলে রুহানীর সাথে পাশ্চাত্যের সংঘর্ষ এক রাজনৈতিক বাস্তবতা হিসেবে শীঘ্রই আবির্ভূত হবে। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা এবং ইরানী পার্লামেন্টের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট স্বাধীনভাবে কোন কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেন না। ইরানের বর্তমান পার্লামেন্ট ও ধর্মীয় নেতাকে ডিঙ্গিয়ে হাসান রুহানী এমন কোন নীতি গ্রহণে সক্ষম হবেন না, যা ইরানের আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা (global credibility) বাড়াতে পারবে। তাছাড়া, ইরানের জনগণের মন ও মানসে পাশ্চাত্য বিরোধিতার যে অভিজ্ঞতা মিশে আছে তা তেমন সুখকর নয়। ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে শুধুমাত্র বিরোধী রাজনৈতিক আদর্শ হওয়ার কারণে নতুন বিপ্লবী সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে পাশ্চাত্য সকল প্রকার শোষণ, জুলুম, নির্যাতন চালিয়ে আসছে। এরকম মন-মানসিকতাসম্পন্ন অজস্র জনগণ, যারা রুহানীকে ভোট দেয়নি, তাদেরকে অবজ্ঞা করে রাতারাতি পাশ্চাত্য বিলাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ রুহানীর পক্ষে খুব যে সহজ হবে না, তা ইরানের সাম্প্রতিক ইতিহাস দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়। হাসান রুহানী মধ্যপন্থা (moderate) অনুসরণ করে শান্তি ও প্রগতি আনয়নের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু সেই মধ্যপন্থার সংজ্ঞা, প্রকৃতি ও পরিধি নিয়ে তিনি বিস্তারিত বলেননি। পূর্বসূরি আহমাদিনেজাদের কট্টরপন্থা (hardline) এবং রুহানীর প্রস্তাবিত মধ্যপন্থার (soft line) মধ্যে যদি মৌলিক ও প্রায়োগিক দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য না থাকে, তাহলে সেই রুহানীয় মধ্যপন্থা (Rowhanian moderation) পাশ্চাত্যের কাছে পাত্তা পাবে না। কূটনৈতিক মূলনীতি হিসেবে হাসান রুহানী সমমর্যাদার (equality) ভিত্তিতে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদা রক্ষার আন্তর্জাতিকতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পূর্বসূরি আহমাদিনেজাদ জাতিসংঘসহ সর্বত্র তার বক্তৃতায় সমমর্যাদার জন্য লড়াই করেছেন। সমমর্যাদার লড়াইয়ে রুহানীর কার্যাবলী যদি আহমাদিনেজাদের কার্যাবলী থেকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধারণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে রুহানীর সেই সমমর্যাদার কূটনীতি পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হবে। নতুন প্রেসিডেন্ট বিশ্বের সাথে গঠনমূলক আন্ত:ক্রিয়ার (Constructive interaction) আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সেই আন্ত:ক্রিয়ার স্বরূপ উন্মোচনের পূর্বেই একথা বিশ্বাস করা কঠিন হবে যে, তিনি সেই আন্ত:ক্রিয়ায় সফল হবেন। আরব বসন্তোত্তর সময়ে সাংস্কৃতিক পুনর্মূর্তিয়ায়নের (cultural reconfiguration) পূর্ণ বিকাশে তিউনিসিয়া ও মিসরে যে নতুন ধারায় গণতান্ত্রিক চর্চা শুরু হয়েছে, তার প্রতি পাশ্চাত্যের কঠোর, বর্বর ও নিষ্ঠুর নীতি পর্যালোচনা করলে এ কথা বলা যায় যে, পাশ্চাত্য কখনো মধ্যপ্রাচ্যের গঠনমূলক আন্ত:ক্রিয়ায় অংশ নিবে না। পাশ্চাত্যের পররাষ্ট্রিক কৌশল হলো, তারা মধ্যপ্রাচ্যে পাশ্চাত্য-বিরোধী মতাদর্শিক রাষ্ট্রে স্থিতিশীলতা সহ্য করবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ববাদী তত্ত্ব (hegemonic stability theory) যে মাত্রার রাজনৈতিক স্থিতি এনেছে, তার স্থিতিবস্থা (status quo) বজায় রাখাই যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল। সে কারণে মিসর, তিউনিসিয়া, তুরস্কের নতুন ধারায় স্থিতিশীলতা পাল্টাতে যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের বৈশ্বিক কৌশল নির্ধারিত হচ্ছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মিসরের প্রেসিডেন্ট মুরসিকে সেই কৌশলেই গদিচ্যুত্ করা হয়েছে। তিউনিসিয়া এবং তুরস্ককেও অশান্ত করে তোলা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক বৃহত্ কৌশল (global grand strategy) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। এদিক থেকে ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পাশ্চাত্যকে আস্থায় আনতে তাঁর কৌশল কোনভাবেই বাস্তবায়ন করতে পারবেন না বলে আমার বিশ্বাস। তবে আহমাদিনেজাদের মত কঠোর বাগাড়ম্বরের পরিবর্তে তিনি নম্র ভাষা পছন্দ করবেন, কিন্তু তা কখনো পাশ্চাত্যকে তোয়াজ করার নীতির পর্যায়ে নামবে বলে মনে হয় না। আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে রুহানীর নতুন নীতি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং ইসরাইলকে ঘিরে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হবে। দল মত নির্বিশেষে ইরানের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ইরানের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির পক্ষে এবং ইসরাইলের হটকারী, মৌলবাদী, আগ্রাসী নীতির বিপক্ষে। এ দু’ ইস্যুতে পাশ্চাত্যও এতটুকু ছাড় দিবে বলে মনে হয় না। বড় জোর হাসান রুহানী এ বিষয় দু’টিতে ইরানী জনগণের ইচ্ছেটাকে নরম সুরে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার ভদ্র প্রয়াস চালাবেন। কিন্তু শেষ বিচারে তিনি ইরানী জনগণের প্রত্যাশার বাইরে কোন পাশ্চাত্য তোষণ নীতি গ্রহণ করতে পারবেন না বলে ভবিষ্যদ্বাণী করা যায়। তবে বিশ্বরাজনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতায় পাশ্চাত্য যদি নতুন করে মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম বিশ্বে হূত-আস্থা পুনরুদ্ধারে অকপট ও সদিচ্ছুক হয়, তাহলে এক বিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় নতুন মেরুকরণ, অভিনব বিন্যাস ও টেকসই ছক তৈরি হবে। ইরান, তুরস্ক, মিসর, তিউনিসিয়াসহ অত্রাঞ্চলের নব-জাগরিত গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যবোধ মূল্যায়ন করলে একমাত্র শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানই শান্তিময় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হবে। ইতিমধ্যেই আগস্ট মাস শুরু হতে না হতেই আফ্রো-এশিয়ার অসংখ্য রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের দূতাবাস, পাশ্চাত্যের নাগরিক জীবনে নিরাপত্তা হুমকি (global terror threat) যে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তা থেকে উত্তোরণ ঘটানোর জন্য সৃজনশীল, গঠনমূলক পরিবর্তন সমূহকে পাশ্চাত্যের পররাষ্ট্রনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। মধ্যপ্রাচ্যে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান, ইসরাইলের অবৈধ দখল প্রতিরোধ, মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক নিবারকাবস্থা (nuclear deterrence), মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধাঁচের গণতন্ত্রের বিকাশে সহযোগিতা প্রভৃতি নীতি পাশ্চাত্যের গ্রহণযোগ্যতা, বিশ্বাসযোগ্যতা, বৈশ্বিক নেতৃত্বে নতুন করে বিশ্লেষিত হবে। কেবলমাত্র এ ধরনের পরিবর্তিত পাশ্চাত্য নীতির প্রেক্ষিতেই হাসান রুহানী ইরানের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে সক্ষম হবেন। পাশ্চাত্যের পুরানো স্টাইলের শাসক-শোষকের নিপীড়ক নীতি বজায় থাকলে রুহানীর মত সাবেক বিপ্লবী, কঠোর সংগ্রামী, সাবেক পারমাণবিক দর কষাকষির দায়িত্ব পালনকারী ইরানী রাজনীতিকের পক্ষে কোনভাবেই আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে না। লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]