নিরাপদ খাদ্য ও কৃষি

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪২
অনিরাপদ খাদ্য জনস্বাস্থ্যের প্রতি মারাত্মক হুমকি, দেরিতে হলেও সরকার এটার গুরুত্ব বিবেচনায় এনেছেন। তাই সরকারকে ধন্যবাদ। প্রায় সকল প্রকার খাদ্যেই বিষাক্ত থেকে অতি বিষাক্ত মাত্রায় বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক বর্তমান। খাদ্যশস্য, শাকসবজি, ফল, দুধ, মাছ প্রক্রিয়াজাত, বতলজাত, মোড়ককৃত তাজা এবং শুষ্ক সকল প্রকার খাদ্যে অতি উদ্যোগজনক মাত্রায় কীটনাশক, রঞ্জক, সংরক্ষণকর, মিষ্টকারক, রুচিবর্ধক, সুগন্ধি, হরমন প্রভৃতি বিষ ব্যবহার হয়। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, বিভিন্ন সংগঠন ও সাধারণ জনগণ এই মারাত্মক হুমকির প্রতি সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তা যথাযথভাবে মোকাবেলার জন্য আইন প্রণয়ন, প্রয়োগ ও তদারকির জন্য উপযুক্ত সংস্থা গঠন করার জোর দাবী জানায়। গণমাধ্যমের মাধ্যমে আমরা জেনেছি, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাদ্য মন্ত্রালয় ‘বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)’ নামের এক একক কর্তৃপক্ষ গঠন করতে যাচ্ছেন। নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ নামে এক আইনের খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে যা সম্প্রতি মন্ত্রীপরিষদ কর্তৃক গৃহীত হয়েছে। আমরা মনপ্রাণে আশা করি আইনটি গৃহিত হবে এবং বিএফএসএ অবিলম্বে সম্পূর্ণভাবে গঠিত হয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। এই নিবন্ধে আলোচনা কেবল কৃষি উত্পাদনে কৃত্রিম রাসায়নিক সার ও কিটনাশক ব্যবহারের কারণে জনস্বাস্থ্যে এর ভয়াবহ প্রভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। সাধারণের ধারণা একমাত্র ফরমালিন ভয়ঙ্কর। কিন্তু তা না। কৃষি খাতে ব্যবহারিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক দ্রব্যাদিই জনস্বাস্থ্য এবং পরিবেশের জন্য একই রকম ভয়ঙ্কর। অতএব জনগণের নিরাপদ খাদ্য লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রালয় পর্যায়ক্রমে কৃষিতে রাসায়নিক দ্রব্যাদির ব্যবহার সীমিত, ক্রমান্বয়ে হ্রাস এবং অবশেষে বিলুপ্ত করে আমাদের দেশকেও ভূটানেরমত জৈব দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ভূমিকা পালন করবে বলে আশাকরি। সম্প্রতি ভূটান নিজেকে ভারতের সিকিম রাজ্যেরমত জৈব রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। হাল তথ্য পরিসং্যখান দুর্লভ। কীটনাশকের ব্যাপারে তা আরো দুর্লভ। হতে পারে এটি ইচ্ছাকৃত। প্রাপ্য তথ্য থেকে আমরা আমাদের কৃষিকর্মে রাসায়নিক সার এবং রাসায়নিক কীটনাশকের অপব্যবহার সম্পর্কে একটা মোটামোটি ধারণা লাভ করতে পারি। ১৯৮০-৮১ অর্থবছরে সার বিক্রয় ছিল প্রায় ৮.৭৫ মে:টন যা ২০১০-১১ অর্থবছরে দাঁড়ায় ৩৫.৮ মে. টন । প্রায় ৪০০% বৃদ্ধি! ১৯৮৯ কীটনাশকের ব্যবহার ছিল প্রায় ৪,৮০০ মে:টন এবং ২০১০-এ ছিল ২৯০০০ মে:টন, প্রায় ৬০০% বৃদ্ধি! এত বেশি সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফল ধান ও অন্যান্য শস্য উত্পন্ন অন্তত চারগুণ বেশি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু কৃষিজ উত্পাদন, বিশেষ করে ধানি জমির উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়েছে অতি অল্প পরিমাণ। ১৯৭১-৭২ অর্থবছরে উত্পাদন ক্ষমতা ছিল ২.৮৭ মে:টন/হেক্টর এবং ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে ছিল ২.৯৪ মে:টন/হেক্টর। উত্পাদন ক্ষমতার বৃদ্ধির পরিমাণ ০.০৭ মে:টন/হেক্টর মাত্র। অন্যান্য কৃষিজ উত্পাদনের ক্ষেত্রেও একই রকম অবস্থায় তাহলে কৃষি জমির পরিমাণ সম্প্রসারণ হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু তাও খুবই সামান্য। প্রসঙ্গক্রমে ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ জাতিসংঘের Urgent Action is needed to Reduce Growing Health and Environmental Hazards from Chemical” প্রতিবেদনের অংশবিশেষ উদৃ্বতি দেয়া যায়; ১। ২০০৫ থেকে ২০২০ পর্যন্ত আফ্রিকার সাব-সাহারায় ছোট খামারে কীটনাশকজাত অসুস্থতা ও ক্ষত সংক্রান্ত সর্বমোট ব্যয় ৯০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে। ২। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ক্রটিপূর্ণ কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মার্কিন ডলারে ১.৪ বিলিয়ন মূল্যের শস্য উত্পাদন হ্রাস...। ৩। ইকুত্রডরে আলু খামারে উচ্চ বিষায়ন প্রতিকার লক্ষ্যে সমন্বিত কিটনাশক ব্যবস্থাপনা (IPM) প্রবর্তন করা হয়। IPM পদ্ধতি ব্যবহারকৃত জমিতে অন্য জমির তুলনায় সমান বা অনেক বেশি পরিমাণ আলু উত্পন্ন হয়। তবে উত্পাদন খরচ যেসব জমিতে রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করা হয় তার চেয়ে ২০% কম। ৪। ইন্দোনেশিয়াতে ১৯৯০ দশকে সমন্বিত কীট ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমের ফলে খামারীদের ৫০% কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস পায় এবং উত্পাদন বৃদ্ধি পায় আনুমানিক ১০%। দেশের ২০০১-২০২০ বছরের জাতীয় IPM কার্যক্রম প্রয়োগের ফলে সম্ভাব্য আর্থিক অর্জন ২০০০ সালের জি ডি পির ৩.৬৫% সমান হবে। উপরোক্ত তথ্যাদির আলোকে আমাদের দেশ সম্পর্কে কী বলা যায়? অনুমান করা যায়, না সরকার না অন্যকোন সংস্থা রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতি অপব্যবহারের ফলে ফসলে উত্পাদন হার হ্রাস, ব্যয় বৃদ্ধি, অসুস্থতার কারণে কর্মঘন্টার হ্রাস, চিকিত্সা ব্যয়, জনভোগান্তি, জি ডি পিতে এর ঋণাত্মক প্রভাব প্রভৃতি বিষয় কোন বাস্তব সমীক্ষা করা হয়েছে। আমরা মনে করি শুধু মাত্র খাদ্য নিরাপত্তা দেয়া নয়, জনগণকে নিরাপদ খাদ্য প্রদান করার বিষয় সরকার যথেষ্ট আন্তরিক। সরকার আন্তরিক হলে অভিলম্বে কৃষিতে রাসায়নিক ব্যবহার হ্রাস করা উদ্যোগ গ্রহণ করবে। রাসায়নিক দ্রব্যই জনসাধারণের খাদ্যকে ব্যাপকভাবে অনিরাপদ করার প্রধান উপাদান। IPM ব্যবস্থা দেশব্যাপি জোরদার বাস্তবায়ন, বিনামূল্যে অথবা স্বল্প মূল্যে সার প্রদান বন্ধ করা। কীটনাশকের আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা এবং এর ব্যবহার অনুত্সাহিত করার লক্ষ্যে আমদানি শুল্ক-কর বৃদ্ধি করা। বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এতে অংশগ্রহণে উত্সাহিত করে দায়িত্ব প্রদান করা বাঞ্ছনীয়। যদি দৈনিক খাদ্যযোগে জনগণকে বিষায়ণ প্রক্রিয়া নিম্নস্তরে হ্রাস করা না যায়, তা হলে সে দিন দূরে নয় যখন রোগাক্রান্ত, অলস, প্রতিবন্ধী, পঙ্গু, হাবাগোবা এক অক্ষম জাতিতে আমরা পরিণত হবো । বিষমুক্ত নিরাপদ খাদ্যের দাবীতে জনগণের বলিষ্ঠ দাবী উচ্ছারিত হোক।  লেখক : সাবেক সেনা কর্মকর্তা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন