বাংলাদেশের রাজনীতির গন্তব্য কোথায়-এটি এখন আসলেই রহস্যাবৃত। দিন যতই যাচ্ছে ততই রাজনীতি কেন জানি আরো ভীষণ রকম কুয়াশাচ্ছন্ন এবং বিভীষিকাময় হয়ে উঠছে। রাজনীতির মাঠ-ময়দান ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন উপলক্ষ এবং ঘটনাপ্রবাহ। বিশেষ করে সামনে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির গতিপথ আলোর চেয়ে অন্ধকারের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। আপাতত জনগণের সামনে স্বস্তিময় কোনো সংবাদ নেই। স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছি রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ যা বলছেন বা যা ভাবছেন ঠিক পরক্ষণেই তার উল্টোটাই ঘটছে। তবে সবকিছু দেখে-শুনে মনে হচ্ছে রাজনীতির সামনের দিনগুলো আরো জটিল ও কূটিল এক সন্ধিক্ষণের দিকেই এগুচ্ছে। স্বভাবতই জনমনে বিবিধ আশংকার শেষ নেই। ঈদের পর যে রাজনীতির মাঠ আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যেই আদালত কর্তৃক জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল এবং এর প্রেক্ষিতে ঈদের পরপরই জামায়াতের ৪৮ ঘণ্টার ডাকা হরতাল রাজনীতির বিষময় পরিবেশের প্রতিধ্বনি তুলছে চারিদিকে। অনুমিত হচ্ছে রাজনীতির এই অনৈক্যের কারণে সাধারণ মানুষের আনন্দময় ঈদ উদযাপন করে ঘরে ফেরাটাও হবে সবচেয়ে এক কষ্টকর অধ্যায়।
জাতীয় রাজনীতি ঠিক যখন এ রকম এক ভূতুড়ে অবস্থায় পতিত ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়-এর রাজনীতিতে অভিষেক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের দেশে ফিরে আসার সংবাদ রাজনীতির ময়দানকে বেশ উন্মাতাল করেও রেখেছে। বিশেষ করে কদিন আগে আমেরিকা থেকে সজীব ওয়াজেদ জয়-এর সপরিবারে দেশে আগমন, রাজনীতিতে অভিষেক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ এবং ‘আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগই জয়ী হবে’-জয়ের এরকম রাজনৈতিক বক্তব্য রাজনীতিতে নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একইভাবে আগামীতে বিএনপির নতুন ধারার রাজনীতির ঘোষণা, তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং সর্বোপরি কারো কারো জয়-তারেককে নিয়ে আগাম তুলনামূলক বিবিধ বিশ্লেষণও রাজনৈতিক আলোচনার এখন দারুণ খোরাক। দেশের আমজনতাও এখন এ বিষয়টি নিয়ে মুখরিত।
এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়েই বেশি আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। জয় জাতীয় রাজনীতিতে উন্মুক্ত হচ্ছেন এ রকম গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল গত বেশ কিছুদিন ধরে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৬ জুলাই জয় তার বিদেশী স্ত্রী এবং সন্তান-সন্তনিসহ দেশে আসেন। তার সাথে ছোট বোন সায়মা ওয়াজেদ পুতুলও আসেন। দেশে ফিরে আসার পর তিনি প্রথম যুবলীগ আয়োজিত একটি ইফতার মাহফিলে অংশ নেন এবং বক্তব্য প্রদান করেন এরপর ৩১ জুলাই পিতৃভূমি রংপুর জেলার পীরগাছার ফতেপুরে যান। ওখানে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটি জনসভাতে মা শেখ হাসিনার সাথে তিনিও বক্তব্য প্রদান করেন। পিতার ধূলিমাখা এলাকাতে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমবারের মতো কোনো বড় জনসভায় দাঁড়িয়ে সরাসরি বক্তব্য দেন। উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয় পূর্বে রাজনীতির আকাশে খানিকটা উঁকি দিলেও সরাসরি রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত ছিলেন। মূলত আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের সভা সেমিনারেই তিনি সরব বা সক্রিয় ছিলেন।
জাতীয় রাজনীতির এক চরম দুঃসময়েই জয় রাজনীতিতে তার অভিষেক ঘটিয়েছেন এবং একই সাথে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই বলে যে, আওয়ামী লীগই ফের ক্ষমতায় আসবে। জয়ের রাজনীতির অভিষেক বা শুভসূচনা ইনিংস কেমন হলো? রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষকরা জয়ের অভিষেক বা রাজনীতির ইনিংস সূচনা নিয়ে বিবিধ বিশ্লেষণ করছেন। আওয়ামী সমর্থকদের বাইরে জয়ের বক্তব্য কতোটা সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হলো এনিয়ে নানারকম মন্তব্য শোনা যাচ্ছে চারিদিকে। তবে চারপাশে কান পেতে বুঝা যায়, এই স্বল্প কদিনে সজীব ওয়াজেদ জয় যে সব বক্তব্য দিয়েছেন সেখানে আধুনিকতা বা নতুন পরিবর্তিত বাংলাদেশ গড়ার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। জয়ের বক্তব্যে কোথাও ফুটে উঠেনি বর্তমান দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং প্রতিহিংসা পরায়ণের ঘুরপাকে আবদ্ধ বাংলাদেশকে পরিত্রাণের উপায়। জবাবদিহিতা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার সংকল্প। বরং জয়ের বক্তব্যে জনগণের মতের প্রতিফলনের চেয়ে নিজস্ব মতামতই বেশি প্রতিফলিত হয়েছে বলে দৃশ্যমান। আওয়ামী লীগের যে গতানুগতিক রাজনীতি-যেমন প্রতিপক্ষকে কথায় কথায় দোষারোপ করা, সিনিয়র নেতৃত্বের প্রতি অবজ্ঞাময় কথাবার্তা এই বৃত্ত থেকে জয় নিজেও বের হয়ে আসতে পারেনি। তিনি নিজেকে উচ্চশিক্ষিত বলে বিভিন্ন জনসভা মিটিং-এ দাবি করলেও বিশ্বরাজনীতির আলোকে রাজনীতির নতুন কোনো তথ্য বা ধারণা জনগণ পেয়েছে বলে মনে হয়নি। বরং বলা যায়-রাজনীতিতে অভিষেক সূচনায় তিনি যে বলটি করেছেন সেটা প্রতিপক্ষের স্ট্যাম্পে আঘাত করাতো দূরে থাক রীতিমতো নো বলে পরিণত হয়েছে।
সজীব ওয়াজেদ জয় উচ্চশিক্ষিত, নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া করেছেন সন্দেহ নেই। এই সুযোগ অবশ্য সবার হয় না। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অনেক মেধাবী তরুণ এ সুযোগ পাননি। রাজনীতির ময়দানে শুধু উচ্চশিক্ষা থাকাটা এখন খুবই গৌণ। শিক্ষার বিষয়টি নিয়ে কটাক্ষ করাটাও বেমানান। শিক্ষিত অশিক্ষিত নিয়েইতো এ দেশের মানুষ। কাউকেই অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। সজীব ওয়াজেদ জয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক জিয়াকে নিয়েও মন্তব্য করতে দ্বিধা করছেন না। নানাবিধ মন্তব্য তিনি ছুঁড়ে দিয়েছেন। কিন্তু তারেক রহমান জয়কে নিয়ে কখনই খারাপ মন্তব্য করছেন বলে জানা নেই। বরং বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে জয়ের রাজনৈতিক অভিষেকের কথা শুনে তারেক জিয়া পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। শুধু এই নয়, সে সময় তিনি একটি অভিনন্দন বার্তা বিএনপির দুজন নেতাকে দিয়ে সুধাসদনে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ বিষয়টি ভালোভাবে না নিয়ে উল্টো তারেকের পাঠানো চিঠি গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে আহবান জানিয়েছিলেন।
জয়ের তুলনায় রাজনীতিতে তারেকের আগমন অনেক আগেই। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতায়ও তিনি এগিয়ে। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পূর্বাহ্নেই তারেক রহমান রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করে এক নতুন ধারা উপহার দিয়েছিলেন। ফলে বিএনপির মাঠ কর্মীদের মাঝে এক নতুন উত্সাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছিল। বিএনপির তৃণমূল নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন তিনি। সে সময় তৃণমূল কর্মী সম্মেলন করে সর্বত্র হই চই ফেলে দিয়েছিলেন। বলতে দ্বিধা নেই খালেদা জিয়ার পর বিএনপির মধ্যে তারেক রহমানই সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। আবার দেশের তরুণদের মাঝেও তিনি তুলনামূলক জনপ্রিয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা তারেক রহমানের মাঝেই জিয়াউর রহমানের প্রকৃত ছায়া খুঁজে পান। ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে যে অভূতপূর্ব বিজয় পেয়েছিল সেই বিজয়ের নেপথ্য কারিগর ছিলেন জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরি তারেক জিয়াই। সামান্য রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার পুুঁজি নিয়ে তিনি দারুণ এক সাংগঠনিক দক্ষতা দেখিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তারেক জিয়া রাজনীতিতে আরো জোরালোভাবে প্রবেশ করেন এবং এক পর্যায়ে তিনি যুগ্ম মহাসচিবও নির্বাচিত হন। ওয়ান ইলেভেনের ঘটনায় বিএনপির এই তরুণ নেতৃত্ব একটি মহলের চক্ষুশূলের কারণে গ্রেপ্তার হন এবং শেষমেষ তিনি লন্ডন চলে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে তারেক জিয়া লন্ডনেই আছেন। বর্তমান সরকারের বিবিধ বাধার কারণে তারেক রহমান দেশে ফিরতে চাইলেও তিনি দেশে ফিরতে পারছেন না। সঙ্গত কারণেই তিনি এখনও প্রবাসেই জীবনযাপন করছেন। বরং লন্ডনে তারেক রহমান সভা-সেমিনারে কোনো বক্তব্য দিলেই তার তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে পারস্পরিক দোষারোপ, প্রতিহিংসা, জিঘাংসা একেবারেই পুরনো সংস্কৃতি। ক্ষমতার বহু পালাবদল ঘটলেও রাজনীতিতে এই সংস্কৃতি কেবলই প্রবলই হয়েছে। এ কারণেই সাধারণ জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস খুঁজে ফিরছে। পুরনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের বিশ্বাস কেবলই কমেই চলেছে। সবাই আশা করছেন রাজনীতিতে জয়ের অভিষেক আর তারেক রহমানের সম্পৃক্ততা হয়তবা রাজনীতির চলার পথে নতুন এক মেরুকরণ তৈরি করবে। রাজনীতি পুরনো খোলস ছেড়ে, গতানুগতিক সবকিছু পরিহার করে আরো জনমুখী হয়ে উঠবে।
এ কারণেই সবার প্রত্যাশা ছিল পুরনো রাজনীতির বৃত্তের বাইরে এসে জয় বলবেন নতুন বাংলাদেশের কথা, নতুন স্বপ্নের কথা, নতুন সম্ভাবনার কথা। যা শুনে দেশের মানুষ বড় আশান্বিত হবে। নতুন পরিবর্তনের আশায় মানুষ দিন গুণবে। কিন্তু জয় যা বলছেন, জয় যে স্বপ্নের কথা বলছেন তা আওয়ামী লীগের ফটোকপি ছাড়া কিছুই নয়। আওয়ামী লীগের মাঠ কর্মীরা যা বলছেন তিনি তাই-ই বলেছেন। নতুন রাজনীতি বা নতুন কোনো স্বপ্নের কিছুই তিনি শোনাননি বাংলাদেশের মানুষকে। রাজনীতিতে সমালোচনা করা কোনো কৃতিত্বপূর্ণ কাজ নয়। বরং সমালোচনা না করে নিজে নতুন কিছু করে দেখানোটাই বড় কৃতিত্ব। অবশ্য সূচনাতে সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। তবে দেশের আপামর জনগণ প্রত্যাশা করে আগামীতে জয় বা তারেকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং বক্তব্যে যেনো রাজনীতিতে কেবলই বিশুদ্ধ পরিবেশ তৈরি করে। প্রতিহিংসার রাজনীতির বদলে যেনো গণতান্ত্রিক ঐক্যমত তৈরি হয়।
এদেশের জনগণ একজন তারেক রহমান এবং একজন সজীব ওয়াজেদ জয়কে কোনোভাবেই গতানুগতিক ধ্বংসাত্মক রাজনীতির আবর্তে দেখতে চায় না। দেখতে চায় সত্য-ন্যায়, জবাবদিহিতা, সুশাসনের প্রতীক হিসেবে। দেখতে চায় নতুন বাংলাদেশের কারিগর হিসেবে। দেশের জনগণের সাথে সেই অপেক্ষায় রইলাম আমরাও।
লেখক : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
[email protected]
