আমরা অনেকেই কিছু কবিতার চরণ সারাজীবন মনে রাখি। কিন্তু চরণগুলোর রচয়িতাকে মনে রাখি না। বিশেষ করে আমাদের বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত চরণগুলোর রচয়িতাকে বর্তমান প্রজন্মের জানাশোনা নেই বললেই চলে। এমনি একজন কবির কথা বলবো যিনি বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মের অনেক আগেই জন্মগ্রহণ করেছিলেন বরিশালের বাসন্ডা গ্রামে। বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্ম ১৮৮০ সালে। আর ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেছেন কামিনী রায়। তাঁর পিতা চণ্ডীচরণ সেন একজন বিচারক, ঐতিহাসিক এবং ঔপন্যাসিক ছিলেন। চণ্ডীচরণ সেন নিজেই তাঁর কন্যার প্রাথমিক শিক্ষার ভার নেন। বারো বত্সর বয়সে কামিনী রায়কে বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে বোর্ডিং এ পাঠিয়ে দেয়া হয়। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ পাস করে বেথুন কলেজে অধ্যাপনা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন কামিনী রায়। স্টাটুটারি সিভিলিয়ান কেদারনাথ রায়ের সাথে পরিণয়ের সূত্রে আবদ্ধ হন (১৮৯৪)। মাত্র ১৫ বছরের দাম্পত্য জীবন। ১৯০৯ সালে তার স্বামী পরলোক গমণ করেন। অকাল বৈধব্য তাঁকে বিমর্ষ করতে পারেনি বরং শিক্ষা এবং স্বামীর প্রেরণায় তিনি কর্মজীবনের মধ্যে সুখ খুঁজে পেয়েছিলেন। নারী শ্রম তদন্ত কমিশনের সদস্য এবং বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সহ-সভানেত্রী হিসেবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মে ব্যাপিত থেকেও কাব্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন কবি খ্যাতি পাবার জন্য নয় বরং নিজের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-বেদনা প্রকাশের ঐকান্তিক প্রয়াসের জন্য। কবি সুফিয়া কামালের জীবনের সাথেও তাঁর জীবনের অনেক মিল রয়েছে। স্বামীর অকাল প্রয়াণ তাঁকে মর্মাহত করেছে এবং সেই বেদনার ছাপ তাঁর কাব্যসাধনায় প্রকাশিত হয়েছে। কামিনী রায় রবীন্দ্র অনুরাগী ছিলেন। তাঁর একটি বিশেষ কবিতা হলো “পাছে লোকে কিছু বলে”,
‘করিতে পারি না কাজ, সদা ভয় সদা লাজ
সংশয়ে সংকল্প সদা টলে, পাছে লোকে কিছু বলে
... ... ... ...
একটি স্নেহের কথা, প্রশমিতে পারে ব্যাথা
চলে যাই উপেক্ষার ছলে, পাছে লোকে কিছু বলে’
‘আলো ও ছায়া’ (১৮৮৯), ‘নির্মাল্য’ (১৮৯১), ‘পৌরাণিকী’ (১৮৯৭), ‘গুঞ্জন’ (ছোটদের কবিতা সংগ্রহ, ১৯০৫), ‘মাল্য ও নির্মাল্য’ (১৯১৩), ‘অশোক সঙ্গীত’ (সনেট সংগ্রহ, ১৯১৪), ‘জীবন পথে’ (১৯৩০) প্রভৃতি তাঁর বিশেষ রচনা।
তাঁর এই সৃষ্টিকর্মের জন্য ১৯২৯ এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক তাঁকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ প্রদান করা হয়। জীবনের শেষ সময়গুলো তিনি হাজারীবাগ এ কাটিয়েছেন। কামিনী রায় ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩৩ সালে ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে পরলোকে গমণ করেন।
যেকোনো মতামত জানাতে ০১৭১৪৭০৫৭২৭ অথবা ইমেইল [email protected]
