তেলেঙ্গানা রাজ্যের ঘোষণা দিয়ে বিপাকে পড়েছে ভারত সরকার। এর ফলে আরো অনেক নতুন রাজ্যে দাবি উঠছে। তেলেঙ্গানা রাজ্যের বিরুদ্ধেও আন্দোলন হচ্ছে। অন্ধ্রপ্রদেশের অন্য এলাকার মানুষ নতুন রাজ্য মানছে না। আবার হায়দারাবাদ অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী। এটি তথ্যপ্রযুক্তি এবং ওষুধ উত্পাদনে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এই রাজধানী নিয়েও বিপত্তি দেখা দিয়েছে। কারণ হায়দারাবাদ তেলেঙ্গানার মধ্যে পড়েছে।
ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজ্যে আন্দোলন চলছে। আন্দোলন সামাল দিতে চেষ্টা করলেও তা বেড়েই চলছে। বিভিন্ন রাজ্যে জনগণের এসব দাবি মানতে হলে ভারতে আরো প্রায় ২০টির বেশি রাজ্য সৃষ্টি করতে হবে। এর ফলে ভারত ভেঙ্গে যাওয়ার শঙ্কাও আছে অনেকের। তবে যদি ভারত সরকার রাজ্যের দাবি মেনে নেয় তাহলে ভারত হবে ইউনাইটেড স্টেটস অব ইন্ডিয়া (ইউএসআই) যা গড়ে উঠবে যুক্তরাষ্ট্রের আদলে। তবে সেটা সম্ভব কিনা সেটা একটা প্রশ্নসাপেক্ষ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কেবল রাজ্য সৃষ্টি করলেই হবে না। এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নতি এবং অফিস-আদালত তৈরির বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। কারণ রাজ্য সৃষ্টি হলে নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। আর তা মোকাবেলা করা ভারত সরকারের আছে কিনা সেটা দেখার বিষয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি অঙ্গরাজ্য রয়েছে। আর ভারতের আছে ২৮টি। তেলেঙ্গানা হবে দেশটির ২৯তম রাজ্য। যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। আর ভারতের জনসংখ্যা ১২০ কোটির বেশি। এছাড়া ভারতের অনেক রাজ্যের জনসংখ্যা কিংবা আয়তন বিশ্বের অনেক দেশের চেয়ে বেশি। যেমন জার্মানির আয়তনের সমান বিহার রাজ্য। উত্তর প্রদেশের লোকসংখ্যা ব্রাজিল কিংবা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি।
ভারতে যেসব রাজ্যের দাবি উঠছে সেগুলো হলো মহারাষ্ট্রে বিদর্ভ, পশ্চিমবঙ্গে গোর্খাল্যান্ড। উত্তরপ্রদেশে বুন্দেলখন্ড, হরিত্ প্রদেশ, অবধ এবং পূর্বাঞ্চল, এছাড়া এই প্রদেশের আগ্রা, আলীগড় ও মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র ও রাজস্থান থেকে ভারতপুর অংশ নিয়ে ব্রাজ রাজ্য। উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং ছত্তিশগড়ের পূর্বাঞ্চল নিয়ে ভোজপুর রাজ্য। আসামে বোড়োল্যান্ড, কারবি অ্যাংলঙ্গ, বিহার এবং ঝাড়খন্ডের মৈথিলি ভাষাভাষীদের নিয়ে মিথিলাঞ্চল, গুজরাটের একটি অংশ নিয়ে সাওরাষ্ট্র, আসাম ও নাগাল্যান্ডের একটি অংশ নিয়ে ডিমারাজি কিংবা ডিমাল্যান্ড, তামিলনাড়ুর দক্ষিণাংশ নিয়ে কঙ্গোনাড়ু, কর্নাটকের দক্ষিণ-পূর্বাংশ এবং কেরালার পূর্বাংশ নিয়ে কুরজ রাজ্য, ঝাড়খন্ড, ঊড়িষ্যা এবং ছত্তিশগড়ের কিছু অংশ নিয়ে কোসাল রাজ্য, কর্নাটক এবং কেরালার সীমান্ত এলাকা নিয়ে টুলুনাড়ু। এছাড়া মণিপুর রাজ্যের কুকি উপজাতিরা কুকিল্যান্ড, আরব সাগরের কাছের কনকানি ভাষাভাষীরা কনকান রাজ্য, পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহার এবং জলপাইগুড়ি নিয়ে কামতাপুর রাজ্য, মেঘালয়ে গারোদের জন্য গারোল্যান্ড এবং পূর্ব নাগাল্যান্ডের দাবি আছে। লাদাখ সীমান্তে ইউনিয়ন টেরিটোরি গঠনেরও দাবি আছে।
রাজ্য সৃষ্টির পক্ষের কর্তা-ব্যক্তিরা মনে করেন, হিন্দি ভাষাভাষীদের নয়টি রাজ্য থাকলে তেলেগু ভাষীদের একটি রাষ্ট্র থাকবে না কেন। রাজ্য সৃষ্টি হলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। উত্তরাখন্ড এবং ছত্তিশগড়ের দিকে তাকালেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এগুলোতে মাওবাদীদের উপস্থিতি থাকলেও উন্নয়ন হচ্ছে। তবে হরিয়ানা এবং হিমাচল প্রদেশের উন্নয়নে চার দশক সময় লেগেছে।
ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরুর আশঙ্কা ছিল, বেশি রাজ্য হলে ভারত ভেঙ্গে যেতে পারে। প্রদেশ সৃষ্টি করার অনেক সুযোগ ভারতের আছে। কিন্তু তার সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে আগে। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার কতটুকু সম্ভব হবে তা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান কাজ।
মার্কক্সবাদী তাত্ত্বিক লিও ট্রটস্কি বলেন, জনগণ সরকার এবং তার নিজের জীবনের পরিবর্তন আনতে পারে না যদি তারা বিকল্প কিছু খুঁজে পায়। তারা তখনই পারে যখন তারা হতাশ হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মানুষের মনের মধ্যে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাবোধ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। যৌথ পরিবার ভেঙ্গে তারা একক পরিবারের দিকে ঝুঁকছে। রাজ্য ভাগের আন্দোলন হয়তো তারই একটা নিদর্শন। তাদের মতে, গান্ধীবাদী এবং বামপন্থা ত্যাগ করতে পারলেও রাজনৈতিক বিদ্রোহ শেষ হয় না। ভৌগলিক সুবিধা নেয়াটা রাজনৈতিক লোলুপতার একটা দিক। তেলেঙ্গানা পৃথক হলে সেখানে মাওবাদীরা ঘাঁটি গড়তে পারে।
অনেকের মতে, নতুন রাজ্য কোনো ভাল উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারে না। ওই রাজ্য কেবল ধনী ও মধ্যবিত্তদের জন্য সুফল বয়ে আনে। আর গরীবদের আরো গরীব করে তোলে। তারা ঝাড়খন্ডের উদাহরণ টেনে বলেন, ২০০০ সালে রাজ্য সৃষ্টির ১৩ বছর পরও কেবল জনগণকে মাওবাদীদের দিকে ঝুঁকতে দেখা গেছে এবং রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত হতে দেখা গেছে। অর্থনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল করে নতুন রাজ্য আরো নতুন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
ভারতে ১৯৮৯ সাল থেকে কোনো দল পার্লামেন্টে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তাইতো রাজনৈতিক দলগুলো আঞ্চলিক দলগুলোর উপর নির্ভর করছে। তারা অঞ্চলগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে ছোট ছোট দলকে কাছে টানছে। এজন্য তারা তাদের সমর্থিত দলের দাবি মানতে রাজ্য পৃথক করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। অনেক সরকার মনে করে ভারত ভাঙ্গার চেয়ে পৃথক রাজ্য গঠন করাই শ্রেয়।
