সিরিয়ায় গত প্রায় দুই বছরের সংঘর্ষে যেমন হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে তেমনি লক্ষ লক্ষ মানুষ দেশটি থেকে পালিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। এসব লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ, চিকিত্সা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। জাতিসংঘ ও কিছু মানবাধিকার সংগঠন বলছে, এখন ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৭ সালের ফিলিস্তিন সংকটের মতো এসব মানুষের স্থায়ী পুনর্বাসন দরকার। এজন্য দরকার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা। কিন্তু তাত্ক্ষণিকভাবে এ বিপুল শরণার্থী নিয়ে বিপাকে পড়েছে লেবানন ও জর্দানের মতো দেশগুলো।
বর্তমানে জর্দানের শহর মাফরাকের কাছে জাতারি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ১৫ হাজার সিরীয় নাগরিক। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক কর্মকর্তাদের দাবি এ আশ্রয় শিবিরটি এখন মানবিক সংকট বাড়াচ্ছে। যেটা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য একটি হুমকিও। হয়তো গৃহযুদ্ধের কারণে সিরিয়া ছেড়ে যাওয়া কয়েক হাজার লোককে আশ্রয় দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি দেশ। কিন্তু এতে সংকট কাটবে না বলে সতর্কতা উচ্চারণ করেছে জাতিসংঘ।
সিরীয় সমস্যা দ্রুত কেটে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইতিমধ্যে ২০ লাখের বেশি লোক দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। লেবাননের মোট জনসংখ্যার প্রতি ছয়জনের একজন হলো সিরীয় শরণার্থী। জর্দানে সিরীয়দের বড় শরণার্থী শিবিরটি এখন দেশটির চতুর্থ জনবহুল নগরীতে পরিণত হয়েছে। শুধু এটা নয়, ধারণা করা হয়েছে এর বাইরে আরো ৪০ লক্ষ সিরীয় বাস্তুচ্যুত হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করছে। মোট হিসেবে বিদ্রোহীদের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সিরিয়ার এক-চতুর্থাংশ জনগণ। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাই কমিশনার এন্টনিও গুতেরেস এক সাক্ষাত্কারে গার্ডিয়ানকে বলেন, সিরীয় শরণার্থীদের দুর্দশা মানবিক সংকটকে আগেই ছাড়িয়ে গেছে। আগামী কয়েক মাসে চলমান গৃহযুদ্ধের অবসানের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই এসব শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে পারবে এমন কিছু দেশে তাদের পাঠানোর বিষয়ে চিন্তা-ভাবনা করছে জাতিসংঘ। জার্মানি ইতিমধ্যে ৫০০০ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তবে অন্য দেশগুলোর প্রস্তাব এতো বেশি নয়।
তিনি বলেন, আমরা এখন মধ্যপ্রাচ্যে মানবিক সংকটের চেয়ে বেশি কিছুর মুখোমুখি হচ্ছি। এটা এখন আর কোনো আঞ্চলিক হুমকি নয় বরং দিনে দিনে বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এছাড়া এসব শরণার্থীদের কারণে ইরাক, লেবানন ও জর্দানও দিন দিন আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়ছে। এ ধরনের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শরণার্থীদের পুনরায় স্থায়ী বসবাসের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা আমাদের কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, এক দশক আগে ইরাকে মার্কিন হামলার পর এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিলো। যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হলে আমরা তাদের পুনর্বাসনের কাজ শুরু করবো। তার মতে, গত ৪০ বছরে শরাণার্থীদের মানবিক সংকটের রেখা পার করেছে সিরীয় সংকট। ৯০ এর দশকে যুগোস্লাভ যুদ্ধের সময়ও এ ধরনের পরিস্থিতি হয়েছিলো। তবে সেখানে মানবিক সংকট এতটা তীব্র হয়নি।
বর্তমানে সিরীয় শরণার্থীদের সঙ্গে জর্দান ও লেবাননের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। এর কারণ হলো স্থানীয় বাসিন্দাদের নাগরিক সেবায় এখন ভাগ বসাচ্ছে শরণার্থীরা। স্কুল, হাসপাতাল, চাকরির বাজার সব জায়গায় শরণার্থীরা প্রবেশের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে এসব দেশের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। এখনো শরণার্থী আসছে। হাজার হাজার শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রমের অপেক্ষায় রয়েছে। আর তা নিয়ন্ত্রণের সীমান্তে অস্ত্রধারী বাহিনী পাঠাতে হচ্ছে।
জর্দানের এক কর্মকর্তা জানান, শরণার্থীরা এখন নিজ দেশে ফিরছে না। আসলে ফেরার সুযোগও কম। তাদের লোকদের এখনো হত্যা করা হচ্ছে। আমরা সত্যিই এক কঠিন বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি। যেটা নিয়ন্ত্রণ করা সত্যিই অনেক কঠিন কাজ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিউম্যানিটেরিয়ান কমিশনার ক্রিস্টালিনা জর্জিভা বলেন, এ সংঘাত কতদিন চলবে সেটা এখনই বলা কঠিন। এ অবস্থায় আমাদের একমাত্র চাওয়া হলো শরণার্থীদের আসার সংখ্যাটা কমানো। এখন আমাদের নগর ব্যবস্থাপক দরকার, পরিকল্পনাবিদ দরকার। আমরা এ বিষয়ে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলছি।
গত এক বছরে জাতিসংঘ ধীরগতিতে মানবিক সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়েছে। বর্তমানে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে একক কোনো সংকটে দেয়া সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ এটি। এর মাধ্যমে শুধু শরণার্থীদের সহায়তা করা হচ্ছে না বরং লেবানন ও জর্দানের সামাজিক সমন্বয়ের জন্যও ব্যয় করা হচ্ছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতারসহ অরো কিছু দেশও অর্থ সহায়তা দিচ্ছে। যদিও সংকট মোকাবেলায় আরো অর্থের প্রয়োজন। জর্জিভা বলেন, রুয়ান্ডা, সেব্রেনিচাসহ বিভিন্ন গৃহযুদ্ধের সময় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো তার বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছিলো। এখন সিরিয়া সংকটও আমাদের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।
