ইচ্ছা শক্তিই বড় শক্তি

আপডেট : ১১ আগস্ট ২০১৩, ২২:০৬
দুইটি হাতই কাটা পড়িয়াছে সেই প্রথম শৈশবে। তবু কোন এক অদম্য মনোবলের অধিকারী শিক্ষার্থী ফাল্গুনী কনুই দিয়া কলম ধরিয়াছিল। আমাদের হতবাক হইতে হইবে যখন জানিতে পারিব ফাল্গুনী সাহা, আঙ্গুলের ফাঁকে নহে, বিশেষ কায়দায় দুই হাতের কনুইয়ে কলমটি বশে আনিয়াই এইবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করিয়াছে। গলাচিপা পৌরসভার সদর রোডের মুদিব্যবসায়ী জগদীশ সাহার কন্যা ফাল্গুনী সাহা ২০০১ সালের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী অবস্থায় পাশের বাড়ির দোতলার ছাদে খেলিতে গিয়া বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হইয়া হাত পুড়াইয়াছিল। তখন তাহার বয়স মাত্র সাত। ডাক্তারেরা হাত দুইটি কব্জির উপর হইতে কাটিয়া ফেলিয়া তাহার প্রাণ বাঁচাইয়াছিল। কিন্তু হাত হারাইয়াও ফাল্গুনী কেবল প্রাণে বাঁচিয়া থাকিতেই চাহে নাই, মননে-চৈতন্যে আত্মসম্মান লইয়া বিকশিত হইবার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ছিল বলিয়াই জিপিএ-৫ অর্জন করিয়া আমাদের বদ্ধ সমাজের সকলের সমীহপূর্ণ মনোযোগ তাহার দিকে টানিয়া লইয়াছে। আরও একটি দৃষ্টান্ত টানিব পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত হইতে: মুম্বাইয়ের একটি পতিতালয়ে জন্ম হইলেও শিক্ষার অদম্য ইচ্ছা শ্বেতা কাত্তিকে আজ নিয়া গিয়াছে সাফল্যের স্বপ্নছোঁয়া উচ্চতায়। দারিদ্র্য ও যৌন নিগ্রহের কর্দমাক্ত হাওয়ার ভিতরে বাড়িয়া ওঠা এই কিশোরী যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাইয়া জীবনের সব বাধা পিছনে ঠেলিয়া দিয়াছে। শ্বেতা (১৮) বৃত্তি পাইয়া নিউইয়র্কের বার্ড কলেজে মনোবিজ্ঞান পড়িতে গত বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লী ছাড়িয়াছে। পিছনে ফেলিয়া গিয়াছে তাহার জীবনের ঘোর কালো অধ্যায়টি। শিক্ষা নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার জগতেও যে আলো ছড়াইতে পারে তাহা আরও একবার প্রমাণ করিয়াছে ভারতীয় এই কিশোরী। নিউজউইকের চলতি বত্সরের ‘ইয়ং ওমেন টু ওয়াচ’ তালিকায় স্থান পাইয়াছে আত্মপ্রত্যয়ী শ্বেতা। একই তালিকায় আছে তালেবান জঙ্গি হামলায় আহত আন্দোলনকারী পাকিস্তানি স্কুল বালিকা মালালা ইউসুফজাই। তাহারা প্রমাণ করিয়াছেন পঙ্গুত্ব, প্রতিবন্ধিতা ও শারীরিক কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতা, যাহাই হউক না কেন, প্রবল ইচ্ছাশক্তির জোরে তাহা অনায়াসেই ডিঙ্গাইয়া যাওয়া সম্ভব। ইচ্ছা থাকিলে উপায় হয়— এই প্রবাদবাক্যটি কেবল পাঠ্যপুস্তকের পৃষ্ঠার ভাঁজে আটকা পড়িয়া থাকা প্রাণহীন কথামাত্র নহে; পাকিস্তানের মালালা, ভারতের শ্বেতা, কিংবা আমাদের গৃহে লালিত কন্যা ফাল্গুনী নিজেদের ইচ্ছাশক্তি দিয়া প্রবাদটিতে প্রতিনিয়ত আমাদের দৃষ্টির সম্মুখেই প্রাণপ্রতিষ্ঠা করিয়া চলিয়াছে। আর, আধুনিক যুগে এই যুক্তিবাদী ইচ্ছাশক্তির অমিত সম্ভাবনা ও ক্ষমতার কথাটি ইউরোপীয় নবজাগরণের দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টও বলিয়া গিয়াছেন দুইশত বত্সর পূর্বে। তবু, আমাদের জাতীয় জীবনে এই শক্তির উদ্বোধন ঘটিতেছে না। এক অন্ধকার অচলায়তন কানাগলির পাঁকে সকলেই আকণ্ঠ ডুবিয়া আছেন—রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থী, সমাজকর্মী ও সমাজবিজ্ঞানী, সংস্কৃতিকর্মী ও ভোক্তা সকলেই গড্ডলিকাপ্রবাহে নিয়মিত গা ভাসাইয়া চলিয়াছেন, কেহই ভাবিতেছেন না, নিজেদের অন্তরে শুভ ইচ্ছাশক্তির আগুন জ্বালাইতে পারিলে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনে কী অকল্পনীয় অভাবনীয় পরিবর্তন সাধন করা যাইতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন