আমরা প্রতারিত হই প্রতিদিন, বিবিধ ক্ষেত্রে। সিটিং বাসের ভাড়া দিয়ে অফিস যাই ও বাড়ি ফিরি বাদুড়ঝোলা হয়ে। অনেক পয়সায় পণ্য কিনি- পণ্যের মান বাসায় এসে দেখি যা-তা। বিক্রেতার কাছে ধরনা দিয়ে দেখি পণ্য বিক্রির সময় বিক্রেতার যে খোলস তা বদলে গেছে। বহু দামে রক্তে বোনা অর্থে জমি কিনি, ১০/১২ বছর পার হয়, জমির দেখা মেলে না। প্লেসমেন্ট শেয়ার কিনি, ২/৩ বছরেও শেয়ারের খোঁজ পাই না। আয়কর দেই, সম্মান তো দূরের কথা, জীবনের প্রতি পরতে ন্যূনতম ভরসা মেলে না। ভোট দেই পরিবর্তনের আশায়, জীবনের প্রতিক্ষণ অপরিবর্তিতই রয়ে যায়। এরকম হাজারো আশাভঙ্গে রাত পোহায়, ভোর হয়; কিন্তু জীবন প্রাণের সাদা বেলা আর দেখা দেয় না।
সাদামাটা সাধারণ মানুষগুলোর পাশে থাকে না সরকার, আইন অথবা কোন পদ্ধতি। চলছে জীবন, অনিয়মের পথে। অনিয়মই এখন নীতি, সে ধারাই মেনে নিয়েছি আমরা সবাই। সাধারণ জীবনমানে চলছে প্রতারণা সমাজের সর্বস্তরেই। এই ফোকর গলে প্রতারণা আর ঠগবাজির প্রতিযোগিতা চলছে কর্পোরেট মাধ্যমেও। পণ্য বিপণনে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান প্রতারণার জাল বিস্তার করে, বিজ্ঞাপণের চমকে প্রলোভন দেখিয়ে, আর তাতে ধরা দেই হাজারো সহজ-সরল মানুষ। এই চটকধারী বিজ্ঞাপনের হাতছানিতে পণ্য, সেবা আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ ঢেলে ক্রয় করি। ক্রয় শেষে অনেক ক্ষেত্রেই দেখি পণ্য আর সেবা ক্রয়ে যা পাই তার অনেকাংশ শুধুই প্রতারণা। কোন সংস্থাও নেই যারা খতিয়ে দেখবে বা নজরদারি করবে এই বিজ্ঞাপনে যে ভাষা, যে গুণাগুণ বর্ণিত হয় তা আসলে কতদূর বাস্তবিক। এসব বিজ্ঞাপনের ভাষায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জড়িয়ে থাকে মিথ্যা আর প্রলোভন তৈরির বেসাতি। সেই মিথ্যা বর্ণনায় সব হারিয়ে চুল ছিঁড়ি। কিছুদিন পর আবারো নতুন কৌশলে নতুন নামে একই ধরনের প্রতিষ্ঠান আবারো আমাদের কষ্টার্জিত অর্থ লোপাট করে, নাঙ্গা করে ফেলে। আইন আর প্রশাসনের নাকের ডগায় তারা উড়ে বেড়ায়, কিন্তু তাদের তাড়াবার জন্য কেউই হাত-পা পর্যন্ত নাড়ায় না। কখনো কখনো এসব প্রতারণার সহযোগী হয় নিজের অজান্তেই অনেক সেলিব্রেটি। মডেল, তারকা ও খ্যাতিমানেরা যাদের প্রতি সাধারণেরা ক্রেজি তাদের দিয়ে বলানো হয় অবাস্তব সব গুণের কথা, তাতে বিশ্বাস করে আমরা হই প্রবঞ্চিত। বিশাল অর্থ আয়ের সহজ পথের নেশায় এসব সেলিব্রেটি কখনো চিন্তা করেন না পণ্য আর সেবার বিজ্ঞাপনে আসলে তারা যা বলে-কয়ে ক্রেতাকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করেন তার কতটুকু মান আমরা আদৌ ভোগ করি। লন্ডনে একটি ঔষধ কোম্পানির বিজ্ঞাপন এরকম— “এটি খেলে মেদ-ভুঁড়ি কমে এবং স্লিম হয়”। জনৈক মোটা মহিলা সেটি বহুদিন সেবন করেন। ঔষধ সেবনে তার কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া ঘটেনি। তদুপরি তার মেদ-ভুঁড়ি না কমায় উক্ত ঔষধ কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে বিশাল পরিমাণ অর্থ ক্ষতিপূরণ হিসাবে আদায় করেন। সেই ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করতে যেয়ে হিমশিম খেতে হয়েছিল বিজ্ঞাপন প্রদানকারী ঔষধ কোম্পানিকে। আমার দেশে উদাহরণ হচ্ছে বসুন্ধরা সিটি মার্কেটের নিউ জাপান ইলেকট্রনিক্স থেকে ৫৩,০০০/- টাকা ব্যয়ে কোবা টিভি কিনে প্রতারিত গ্রাহক ক্যাব-এর মাধ্যমে অভিযোগ করেন, যা ছিল বাংলাদেশে ক্রেতা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় দলিলভিত্তিক প্রথম অভিযোগ।
দীর্ঘ ২ বছর টানা-হেঁচড়ার পর ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক গ্রাহককে ডেকে সময়ক্ষেপণের ফলে বিষয়টি তামাদি হয়ে গেছে বলে জানান। আফটার সেলস সার্ভিসের এটি একটি নমুনা মাত্র। আরো হাজারো বিড়ম্বনা রয়েছে এবং ক্রেতাদের এগুলো সইতে হয় এদেশে বিক্রেতাদের এক ধরনের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাওয়ার কারণে। অন্য বিষয়টি হচ্ছে, কিছু কর্পোরেট রয়েছে এসব প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করেন তারাও প্রতারণায় জড়িয়ে পড়েন। হলমার্ক কেলেংকারিতে যেমন ব্যাংক কর্মকর্তাদের অজ্ঞতা ও লোভের কারণে সংগঠিত, তেমনিভাবে হলমার্কের যে অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এ প্রতারণাগুলো হয়েছে সেগুলোও কর্পোরেটের অংশ। কর্পোরেটে থাকে নানারকম নীতি- নৈতিকতার শ্লোগান, থাকে ভিশন, মিশনের সুন্দর গোছালো বর্ণনা, সেখানে শিক্ষিত মেধাবীদের ছড়াছড়ি। তবুও তারা ব্যর্থ বিভিন্ন প্রতারণা রোধে। রাষ্ট্রের কর্ণধাররাও কখনো কখনো কথাবার্তা, আচার-আচরণে প্রতারণাকে জায়েজ করে ফেলেন হয় ভুল করে, না হয় অংশীদারিত্বের কারণে। বাংলার বিকাশমান অর্থনীতির সম্ভাবনাকে জিইয়ে রাখতে যেমন প্রয়োজন রাজনীতির সুষ্ঠু সংস্কার, আইনের প্রসার ও সুষ্ঠু প্রয়োগ, নীতিনির্ধারকদের বুদ্ধি- বিবেচনায় পরিশীলিত দৃষ্টিভঙ্গি আনয়ন তেমনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিরাট পরিধি কর্পোরেট সংস্কৃতিতে সুষ্ঠু ও ইতিবাচক আবহ তৈরি বিশেষ জরুরি কর্পোরেট মাধ্যমে সংঘটিত প্রতারণা বন্ধে। খুব সংক্ষিপ্তভাবে তুলে ধরছি কর্পোরেট ফ্রড বা প্রতারণার কয়েকটি বিশেষ কারণ, যা প্রতিহত বা রোধকরণের মাধ্যমেই নিহিত কর্পোরেট ফ্রড থেকে অনেক দূর মুক্তি পাওয়ার পথ।
প্রথমেই পরিষ্কার করতে চাই একটি বিষয়, তা হলো কর্পোরেট ফ্রড বা প্রতারণা শুধুমাত্র সরাসরি অর্থ বা তহবিল আত্মসাত্ বা তছরুপের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো আরও কিছু আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত কারণে বা ঘটনাবলীর মাধ্যমেও সম্পাদিত হয়। কর্পোরেটগুলোর প্রতারণার পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করে একদিকে কর্পোরেট নির্বাহীদের অনৈতিকতা, অনভিজ্ঞতা, নমনীয়তা বা তাঁবেদারির মাধ্যমে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণের সর্বাধিক প্রচেষ্টা, ইত্যাদি কারণ, অন্যদিকে কর্পোরেটের স্বত্বাধিকারী বা মালিক পক্ষের রাতারাতি অতি মুনাফা বা উচ্চ হারে লভ্যাংশ পাওয়ার প্রত্যাশায় ব্যবস্থাপনা নিয়োজিতদের রাতভর তাড়িয়ে বেড়ায়। তাই কর্পোরেট তার সামাজিক দায়বদ্ধতাকে কর্পোরেট বিবরণীতে সুন্দর উপস্থাপনায় তালা মেরে রেখে শুরু করে অনিয়ম। অনিয়মে ধরা খেলে বলি হয় বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যাদের দিয়ে অনিয়মগুলো করিয়ে নেয়া হয় সে সকল নির্বাহী। অন্য আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বা অনুষঙ্গের কারণেও কর্পোরেট ফ্রড বা প্রতারণার কৌশল বেছে নেন। যেমন ইনসেনটিভ/ প্রেসার, অপরচুনিটি, এটিচিউড/ রেশনালাইজেশন। ইনসেনটিভ বা প্রেসারের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা পর্ষদ নির্দেশিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারলে নিজেদের সুযোগ- সুবিধা বর্ধিত হবে এমন বিশ্বাসের বা এ ধরনের কারণে অথবা নির্দিষ্ট ফলাফল প্রদর্শনের চাপে পড়ে প্রতারণা বা ফ্রড করতে পারে, যা অনেক সময় স্টেক হোল্ডার, ইনভেস্টর বা মালিক পক্ষের ইচ্ছা থেকে উদ্ভূদ হতে পারে। এছাড়া বিশেষ প্রতিযোগিতার মুখে বা বাজার আবদ্ধতার কারণে, ব্যবসায়ের বা মুনাফার ক্রম হ্রাসের কারণে, পণ্য বা সেবার পরিধি সংকুচিত হয়ে গেলে, পরিচালন লোকসান হলে যা বাজারে কর্পোরেটের অস্তিত্বকে বিলীন করতে পারে ইত্যাদি পরিস্থিতিতেও ফ্রডের উদ্ভব হয়। সুযোগ বা অপরচুনিটির ক্ষেত্রে যখন কর্পোরেটের আভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত নজরদারিতে দুর্বলতা থাকে অথবা নজরদারিতে সম্পৃক্ত বিভাগগুলোর সাথে ব্যবস্থাপনার সমন্বয়হীনতা দেখা দেয় তখনও কর্পোরেট ফ্রডের বা প্রতারণার ঘটনা ঘটে থাকে। এটিচিউড বা রেশনালাইজেশনের কারণে যেভাবে ফ্রড হয় তার উদাহরণ হচ্ছে অন্যরা করছে, পার পেয়ে যাচ্ছে, অতএব আমরাও করি এ ধরনের মানসিকতার কারণে ঘটে থাকে। এছাড়া জটিল লেনদেন বা কমপ্লেক্স সিচুয়েশনের উপর ভর করে ফ্রড হতে পারে, যেমন-এডভান্সড প্রযুক্তি ব্যবহার করে, যা অন্যরা সহজে বুঝতে পারে না বা ধরতে পারে না। জটিল সাংগঠনিক ধারা তৈরির মাধ্যমে, একক বা অল্প সংখ্যক লোক যখন কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ করে তখনও সংগঠন বা কর্পোরেটগুলোতে প্রতারণা করার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
আর্থিক বিবরণী প্রক্রিয়া ও আভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের সুষ্ঠু নজরদারির অভাবে ফ্রড হতে পারে। কিছু কর্পোরেটে সার্বক্ষণিক পরিবর্তন বা আকস্মিক পরিবর্তন, যথাযথ তথ্য প্রবাহের অভাব, ব্যক্তি বা দলীয় সংঘাতের কারণে যখন কর্পোরেটের দৈন্য অবস্থা তৈরি হয় তখনও প্রতারণা বা ফ্রডের উদ্ভব ঘটে। আরো নানাবিধ বিষয় কর্পোরেট ফ্রডের কারণ হতে পারে। উপরের আলোচনায় উল্লেখিত প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতাগুলোকে সুন্দর সিস্টেমে নিয়ে আসতে পারলে বা রোধ করতে পারলে কর্পোরেট মাধ্যমে সংঘটিত ফ্রড বা প্রতারণার অনেক সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে এবং কর্পোরেট সংস্কৃতির একটি সুন্দর ধারা এদেশে তৈরি হবে বলে আমার বিশ্বাস।
লেখক : ব্যাংকার
ই-মেইল: [email protected]
