শিক্ষা ও ছাত্র প্রহার

আপডেট : ১২ আগস্ট ২০১৩, ২২:০৮
ইহা সত্য যে, একটি আত্মমর্যাদাবান, কর্মনিষ্ঠ, স্বাধীন ও দৃঢ়চেতা জাতি গঠনের জন্য শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। সুশিক্ষাই কেবল পারে একটি সমৃদ্ধ ও সত্যিকারের কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের ক্ষেত্র প্রস্তুত এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করিতে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা সুপরিকল্পনার অভাবে এলোমেলোভাবেই পথ চলিয়াছে। তবে বর্তমান সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে কিছু কঠোর নিয়মনীতি প্রবর্তন এবং শিক্ষানীতি চালু করিবার মাধ্যমে এই ক্ষেত্রে মোটামুটিভাবে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে শিশুদের মনে শিক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টিকল্পে শিক্ষক এবং অভিভাবকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রকৃত প্রস্তাবে ঐ প্রাথমিক শিক্ষা নিকেতনেই শিশু মনে শিক্ষা বিষয়ে আগ্রহ ও অনাগ্রহ উভয় প্রকার বোধ তৈরি হইয়া থাকে। অর্থাত্ সুশিক্ষকেরা বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মনে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ তৈরি করিতে সদা তত্পর থাকেন বটে তথাপি অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষক কিংবা অভিভাবক মন্ডলীর পক্ষ হইতে অযত্ন-অবহেলা শিশুর শিক্ষা লাভের জন্য যারপরনাই অন্তরায় হইয়া দেখা দেয়। গত বৃহস্পতিবার দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্তৃক ছাত্র-ছাত্রীদের প্রহারের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই একজন শিক্ষকের যেই মন্তব্য প্রকাশিত হইয়াছে উহা খানিকটা দুঃখজনক বটে! ছাত্র-ছাত্রীদেরকে পড়িতে বাধ্য করিবার জন্য বেত্রাঘাত ও অন্যান্য প্রকার প্রহার অপরিহার্য এমন কথাই তাহারা বলিতে চাহিয়াছেন। একজন শিক্ষক বলিয়াছেন যে,“ শিক্ষার আবার গুণগত মান কি! বাচ্চাদের মাথায় পড়া ঢুকাইতে হইবো। ইবলিশগুলির মাথায় পড়া ঢুকানোর উপায় একটাই—বেত মারা”। শুধু তিনিই নহেন, সরকারি প্রাথমিক, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের তো বটেই এমনকি প্রচলিত মাদ্রাসার শিক্ষকদের মধ্যে অনেকেই নাকি বিদ্যার্থীদের পড়া শিখাইবার জন্য এই বেত্রদণ্ডদান জরুরী বলিয়া মনে করেন। অথচ, শিক্ষামন্ত্রণালয় এবং হাইকোর্টের এই মর্মে নির্দেশ রহিয়াছে যে, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের শাস্তি প্রদান শিশুদের জীবন ও স্বাধীনতার অধিকারের লংঘন।’ ঐ প্রতিবেদনটিতে ফেনী সদর উপজেলার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র শিক্ষকের বেদম পিটুনীতে আহত হইয়া প্রায় ৪ সপ্তাহ যাবত্ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন থাকিবার একটি ঘটনাও উল্লেখ করা হইয়াছে। শিশুরা প্রাকৃতিকভাবেই কিছুটা চঞ্চল-মতি ও অস্থির-চিত্ত এবং বয়ঃসন্ধি কিংবা উহারও অধিক সময় পর পর্যন্ত তাহাদের মধ্যে নানান আবেগ-উত্তেজনা এবং অস্থিরতা-চঞ্চলতা থাকে। এই বাড়ন্ত সময়ে তাহাদের অনেকেই লেখাপড়ার চাইতে দুষ্টুমি বা খেলাধুলা ইত্যাদিতে বেশী আকৃষ্ট হইয়া পড়ে। তখন বিদ্যালয়ের শৃংখলা-নিয়মানুবর্তিতা এবং পাঠাভ্যাস বজায় রাখিবার তাগিদে বা উদ্দেশ্যে শিক্ষকেরা তাহাদের খানিক প্রহার, ভর্ত্সনা বা শাস্তি দিয়া থাকেন। এই রীতি সেই বহু পুরনোকাল হইতেই চলিয়া আসিতেছে। শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখা ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যত্ গড়িয়া তুলিতে মৃদু প্রহার, ভর্ত্সনা ইত্যাদি করা হইয়া থাকে এবং ইহাতে দোষের কিছু নাই। ইহাতে বিদ্যার্থীর গোল্লায় যাওয়ার সম্ভাবনাও থাকে কম। তবে এই প্রহারের মাত্রা যদি ছাড়াইয়া গিয়া উহা নির্দয় প্রহার বা কোন শিক্ষকের জেদ-রাগ-দ্বেষ ইত্যাদি মিটাইবার ব্যাপার হইয়া দাঁড়ায় তাহা হইলেইতো বিপদ! এবং তেমন ক্ষেত্রে উহা কিছুতেই মানিয়া লওয়া যায় না নিশ্চয়ই। শিক্ষকদের সেই নীতিবাক্যটি মনে রাখা দরকার যে, ‘শাসন করা তারই সাজে, সোহাগ করে যে।’ আর তেমন শিক্ষকের অধীনেই যে ‘শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে’ ইহাতো বলাই বাহুল্য! ‘মাইরের উপর কোন ওষুধ নাই’ এমন কথা যে শিক্ষকেরা বিশ্বাস করেন তাহারা যে ভ্রান্তপথে হাঁটিতেছেন ইহা তাহাদেরকে বুঝিতে হইবে, সেই বুঝ যত তাড়াতাড়ি তাহাদের মনে ঠাঁই পাইবে, ততই মঙ্গল।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন