পশ্চিমা বিশ্বে বাত্সরিক ছুটির মওসুম আসি আসি করিতেছে। শাস্ত্র মান্য করিবার মত করিয়াই ধনী বিশ্বের অসংখ্য মানুষ এইবারও সারা বত্সরের শ্রান্তি কাটাইয়া উঠিবার মানসে ভ্রমণে বাহির হইয়া পড়িবে। যে যাহার সাধ্যমত ভ্রমণ করিবে; বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেশের বাহিরে। খুব একটা দূরে না যাইতে পারিলেও আশেপাশের কোন একটি দেশ হইতে বন্ধু-বান্ধব কিংবা পরিবার-পরিজন লইয়া বেড়াইয়া আসিবে। পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বত্সরে অন্তত একবার ভ্রমণে না যাওয়া বলিতে গেলে অসামাজিক আচরণ হিসাবেই পরিগণিত হইয়া থাকে। আর এই ভ্রমণ পিয়াসী অগুনতিমানুষজনকে ঘিরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে ট্রিলিয়ন ডলারের পর্যটন শিল্প। পৃথিবীর বহুদেশই পর্যটন হইতে বৃহত্ অঙ্কের অর্থ আয় করিয়া থাকে।
জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান বিশ্ব পর্যটন সংস্থার হিসাব অনুসারে, ২০১২ সালে সর্বোচ্চ সংখ্যক পর্যটনকারীর পদচারণধন্য দেশটির নাম হইতেছে ফ্রান্স। গত বত্সর ৮৩ মিলিয়ন মানুষ ফ্রান্স ভ্রমণ করিয়াছে। ভ্রমণ কালে তাহারা খরচ করিয়াছে প্রায় ৫৪ বিলিয়ন ডলার। ৬৭ মিলিয়ন পর্যটক লইয়া যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় স্থানে এবং প্রায় ৫৮ মিলিয়ন পর্যটক লইয়া চিন ও স্পেইন তৃতীয় স্থানে রহিয়াছে। ইতালি (প্রায়৪৭মিলিয়ন), তুরস্ক (প্রায় ৩৬ মিলিয়ন), জার্মানী (প্রায় ৩১ মিলিয়ন) এবং যুক্তরাজ্যে ও (প্রায় ৩০ মিলিয়ন) ভ্রমণ করিয়াছে বিপুল সংখ্যকমানুষ। ভ্রমণকালে খরচের একটি হিসাবও দিয়াছে জাতিসংঘ। এই হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকালে ভ্রমণকারীরা গড়ে ১৯ শত ডলারের মত অর্থ খরচ করিয়া থাকে। এমন কি আমাদের নিকটবর্তী থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার মত দেশে ভ্রমণে যাইয়াও ভ্রমণকারীরা গড়ে যথাক্রমে সাড়ে ১৩ শত ডলার ও ৮ শত ডলারের অধিক অর্থ খরচ করে। বুঝিতে অসুবিধা হয় না পর্যটন শিল্প এই দেশগুলির অর্থনীতিতে বিপুল অবদান রাখিয়া চলিয়াছে। শুধু দেশ বলিয়া কথা নহে, এমনকি নগরভিত্তিক পর্যটন হইতেও অর্জিত হইতেছে অবিশ্বাস্য অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা। গত বত্সর প্রায় ১৬ মিলিয়ন পর্যটক লইয়া এই তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করিতেছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্কক। শীর্ষ পাঁচের অপর নগরীগুলি হইতেছে লন্ডন, প্যারিস, সিঙ্গাপুর ও নিউইয়র্ক।
বিশ্বজুড়িয়া পর্যটন বাণিজ্যের এহেন রমরমা দেখিয়া আমাদের অবস্থান লইয়া স্বভাবতই মনে প্রশ্ন জাগে। পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ কোথায়? পর্যটন অর্থনীতিতে বাংলাদেশ কোথায়? উত্তর হইতেছে আমরা কোথাও নাই। অথচ প্রকৃতি আমাদিগকে কম কিছু দেয় নাই। পৃথিবীর সর্ববৃহত্ বালুকা-বেলা কক্সবাজার এই দেশে। সর্ববৃহত্ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন ও রাজসিক রয়েল বেঙ্গল টাইগার এই দেশেরই আকর্ষণ। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুসং দুর্গাপুর কিংবা লাউয়াছড়ার মত স্থানগুলির আকর্ষণ এড়াইতে পারে এমন পর্যটক বিশ্বে বিরল হইবার কথা। প্রাকৃতিক আকর্ষণ বাদ দিলেও নানাবিধ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় এমনকি সমকালীন স্থাপনার সংখ্যাও নিতান্ত কম নহে বাংলাদেশে। ষাট গম্বুজ মসজিদের নির্মাণ শৈলী, কান্তজির মন্দিরের পোড়ামাটির ফলকের কারুকাজ কিংবা বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আকর্ষণীয় ভবন হিসাবে বিশ্বজুড়িয়া পরিচিত জাতীয় সংসদ ভবন দেখিতে পর্যটকে দেশ ভরিয়া যাইবার কথা। কিন্তু তেমন কিছুর কাছেধারেও আমরা নাই। আকর্ষণ থাকিলেই হইবে না, বিশ্ববাজারে সেইসব আকর্ষণগুলিকে পরিচিত করিয়া তুলিবার ব্যাপারও আছে। আর পর্যটন বাণিজ্যে সফলতা চাহিলে পর্যটনস্থলগুলিকে পর্যটকবান্ধব করিয়া তুলিবার বিষয়টি আসিবে সর্বাগ্রে। এই দুইক্ষেত্রে সরকারি অর্থকড়ি সুষ্ঠু ব্যবহার কতখানি হয় তাহা লইয়া ওয়াকিবহাল মহলের মধ্যে অসন্তোষ আছে। আরেকটি ব্যাপার হইতেছে, পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য যথোপযুক্ত বিনিয়োগের ব্যাপারেও নীতি-নির্ধারক মহলের মধ্যে এখন অবধি এক ধরনের জড়তা কাজ করে বলিয়া মনে হয়। সারা দুনিয়ার দিকে তাকাইয়া এই জড়তা যত দ্রুত সম্ভব কাটাইয়া উঠিয়া কাজে নামিয়া পড়া বাঞ্ছনীয়।
