এ জগত্ মায়াময়। এ জগত্ মিথ্যাময়ও। বিশেষ করে আমাদের এ উপমহাদেশ। মিথ্যা খুব সহজ জিনিস, এর তাত্ক্ষণিক লাভের পরিমাণও নেহাত্ খারাপ নয়। সে কারণেই এ অঞ্চলে মিথ্যা কথা বলা হয় শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার মতো, না বললে যেন বাঁচা কঠিন। যে দেশের মানুষ যত বেশি মিথ্যার আশ্রয় নেয় সে দেশ তত বেশি দুর্নীতিপরায়ণ। অব্যবস্থাপনা আর বিশৃঙ্খলায় নাভিশ্বাস ওঠে সে দেশের জনগণের। আবার যে দেশ যত উন্নত সে দেশ ততই মিথ্যা ছলনাহীন। দারিদ্র্য, দুর্নীতি, অসততার সঙ্গে মিথ্যার রয়েছে গলাগলি সম্পর্ক। কিন্তু উপমহাদেশের মানুষ কেন মিথ্যায় ডুবে থাকে? কি এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে এখানকার জলবায়ুতে, যা কমবেশি সবাইকে অসততা ও দুর্নীতিতে প্রলুব্ধ করে? মিথ্যার বেসাতি যে শুধু দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভেতরে, তা নয়। ধনীরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি চতুর, মিথ্যার শক্ত কারবারী। সত্যের চেয়ে এখানে মিথ্যা এমন শক্তিশালী যার উত্তাপ সবাই অনুভব করতে পারে।
রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, সত্যকে ধারণ করা যথেষ্ট কঠিন কাজ। কিন্তু সত্যকেই ভালোবাসা উচিত, কারণ সে কখনো বঞ্চিত করে না। তাঁর মতে, সত্য হলো সরলরেখার মতো, যা খুব সহজ, কিন্তু নিখুঁতভাবে খালিহাতে আঁকা সবচেয়ে কঠিন। তিনি মনে করেন, মিথ্যা অভ্যাস বেড়ে গেলে ভেতরে ভেতরে আমরা নিঃস্ব হই। মিথ্যা অল্প অল্প করে আমাদের সব কেড়ে নেয়, আমাদের আশ্রয়ের স্থান, খাদ্য, লজ্জা নিবারণের বস্ত্র— সবকিছু। এমন ঘোর দারিদ্র্যময় জগত্সৃষ্টি করে যে, পৃথিবীসুদ্ধ সবকিছু দীনহীন মনে হয়।
কিন্তু আমরা এ উপমহাদেশের মানুষ এমন একটি পরিমণ্ডলে বসবাস করি যেখানে মিথ্যার আশ্রয় না নিলে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মিথ্যা বলার অভ্যাসটা মনস্তাত্ত্বিকভাবে আমরা খুব স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করি। মিথ্যায় আমাদের হাতেখড়ি ঘটে শৈশবেই। যেহেতু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ এমন সিস্টেমের প্যাঁচে আটকে আছে যেখানে মিথ্যা না বললে টিকে থাকাই মুশকিল, সুতরাং ডারউইনের টিকে থাকার তত্ত্বের মতো আমাদের শিশুরা মিথ্যা বলায় জিভ পাকায় জ্ঞান হবার পর থেকেই। এ উপমহাদেশে বেশিরভাগ পরিবারেই শিশুর ভুলকে শক্ত হাতে দমানো হয়। মনে করা হয়, মারের ওপর ওষুধ নাই। ছেলেমানুষী দুষ্টুমি বা ভুলের জন্য শাস্তি, ধমক, হুংকারে শিশুরাও ক্রমেক্রমে রপ্ত করতে শেখে যে ভিন্ন কোনো পথের আশ্রয় নিতেই হবে। সুতরাং শাস্তি থেকে বাঁচতে তারা নতুন পথ বের করবেই। কারণ গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সবচে বেশি অনিচ্ছাকৃত মিথ্যা বলে ভয় পেয়ে। তাছাড়া আমাদের সমাজে মিথ্যা বলাটাকে খুব বেশি দোষের মনে করা হয় না। মিথ্যা বলা কোনো লুকোছাপা বিষয় নয় এবং শিশুরা তা বড়দের থেকে দেখছে শুনছে শিখছে শৈশব থেকেই।
চোরের দেশে চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা। মিথ্যার রাজ্যেও তাই। তাছাড়া মিথ্যা অতি মাত্রায় সংক্রামকও বটে। মিথ্যাবাদীরা যে অঞ্চলে আবহমানকাল ধরে সংখ্যাগুরু; সেখানে মিথ্যার শেকড় এমন গভীরে গেঁথে যায়, যার মূল উত্পাটন অসম্ভব হয়ে পড়ে। মিথ্যা আরো মিথ্যা বাড়ায়, এর হাত ধরে দুর্নীতি-অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আসে। রাষ্ট্রযন্ত্রের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকে এসবের শেকড়। সুতরাং এ হলো বৃত্তের ভেতরে বৃত্ত। মিথ্যা-চাতুর্য-অসততার চেইন। সেই আগাছার চেইন ভাংতে চেষ্টা করলে ততদিনে আরো চেইন দানা বাঁধে, আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সমস্ত অঙ্গে। এ উপমহাদেশ সেই বৃত্তে আটকে আছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও অনেক ক্ষেত্রেই সত্য বললে সহজে বিশ্বাস করে না। কিন্তু যাকে কথাটা বলবেন, তার সাইকোলজি বুঝে সাজিয়ে-গুছিয়ে মিথ্যা বলেন, দেখবেন—তা সত্যের চেয়ে বেশি সত্য বলে মনে করছে ওই ব্যক্তি। এর সফলতা ব্যাপক। সুতরাং একটু আধটু সত্যের কুচি মিশিয়ে প্রয়োজন মতো মিথ্যা সাজিয়ে যে নৈবেদ্য তৈরি করা হয়, তা পছন্দ করে না এমন লোক খুব কম আছে। যেমন তোষামোদি। মিথ্যা কথা যাকে বলা হয় এটা তার সঙ্গে বুদ্ধি ও চাতুর্যের খেলা। মিথ্যাবাদিতা আমাদের সমাজে এমন এক স্বাভাবিক মানসিকতায় পরিণত হয়েছে, এ অঞ্চলে কেউ সত্যবাদী হলে সবাই তাকে বোকা ও সহজ-সরল ভাবে। মনে করে, তাকে দিয়ে ব্যবসা হবে না, রাজনীতি হবে না, চাকরিতেও সে টিকতে পারবে না। এমনকি ঘরেও বউ থাকবে না দুদিনের বেশি। সুতরাং মিথ্যা যেখানে প্রাপ্তির পথ তৈরি করে দেয়, সেখানে মিথ্যারই তো রাজত্ব হবে। তাই সে কোনো কারণে অপরাধ করলে কখনই সে তা স্বীকার করবে না, ইনিয়ে বিনিয়ে মিথ্যার ফুলঝুড়িতে বলতে চেষ্টা করবে সে অপরাধী নয়। তারপর যখন অপরাধ প্রমাণিত হয়, তখন বিচারক আরো বেশি বিরক্ত হয় অপরাধীর প্রতি। কিন্তু সে যদি সহজেই স্বীকার করতো তার অপরাধ, অনুতপ্ত হতো, তাহলে তার শাস্তির মাত্রাও কমে আসত সহজে।
মিথ্যার সঙ্গে কি জেনেটিক্যাল সম্পর্ক আছে? বিজ্ঞানীরা বলেন, মিথ্যা বলাটা মূলত সামাজিক ব্যাধি এবং এটায় অভ্যাসগত হতে হতে এক সময় তা জিনের ভেতরেও লীন হয়ে যায়। কিছু কিছু মানুষ আছে যে অনবরত মিথ্যা না বলে থাকতে পারে না। এর সঙ্গে নাকি বেশ শক্তভাবে সম্পর্ক আছে জিনের। বিজ্ঞানীরা এর নাম দিয়েছেন সিউডোলোজিয়া ফ্যান্টাসটিকা (pseudologia fantastica)।
সাধারণভাবে অধিকাংশ মানুষ দিনে অন্তত একাধিক কঠিন মিথ্যা বলে। তাছাড়া একটি কথা এক কান থেকে দুই কান হওয়ার সময় তাতে মিথ্যার ডালপালা গজায়। সেই রানির একটুখানি কালো ছেলে জন্মানোর কাহিনীর মতো। দশ কান হতে হতে এক সময় এক জন আরেক জনকে বলে, রানির কাকের মতো কালো ছেলে হয়েছে। অবশেষে এ কথা রটে যায় যে, রানির গর্ভে একটি কাক জন্ম নিয়েছে।
সেই অর্থে বলা যায়, মিথ্যা হলো গল্পকথার জনক। এ কারণে প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণা মতবাদে কবিদের মিথ্যুক বলেছেন এবং তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রের ধারণায় কবিদের বিতাড়িত করার কথাও জানিয়েছেন। তিনি মনে করতেন, কবিরা শুধু মিথ্যাই বলেন না, মিথ্যাকে সুন্দর করে বলেন। যারা কাব্য বা নাটক লেখেন তারা সকলেই উঁচুদরের নকলনবীশ মাত্র। কবিরা শুধু নকলনবীশ নন, তাঁরা মিথ্যাবাদী, অসাধু।
একটি জরিপে দেখা গেছে, চাকরি বাঁচাতে শতকরা ৮০ ভাগেরও বেশি লোক মিথ্যার আশ্রয় নেন। আর প্রযুক্তির চরম উত্কর্ষের সময় মোবাইল ফোন আমাদের দিয়ে প্রতিদিন কয়েকটি মিথ্যা কথা বলাবেই, নইলে আমরাই বিড়ম্বনার শিকার হবো। মিথ্যার অবশ্য কিছু রকমফের আছে। হোয়াইট লাই বলে ইংরেজিতে একটি কথা আছে। সাদা মিথ্যা। অর্থাত্ যা মানুষের খুব একটা ক্ষতি করে না। বলা হয় এসব মিথ্যা আমাদের দৈনন্দিন আটপৌরে জীবনে কিছুটা লবণ-মশলার যোগান দেয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও মজা করে মংপুতে বলেছিলেন, মিথ্যা না বললে কথা বলার সুখ কোথায়? এ রকম ‘কোমল-মিথ্যা’ অহীতকর নয়। কিন্তু মিথ্যা জিনিসটাই বড়ই নিয়ন্ত্রণহীন। কেননা ‘সাদা মিথ্যা’র কচু গাছ কাটতে কাটতে একসময় আমরা ভয়ঙ্কর মিথ্যার ডাকাতে পরিণত হতে পারি।
তবে সবাই মিথ্যা বলতে চান না। পরিবেশ পরিস্থিতি যাদের মিথ্যা বলতে বাধ্য করে গবেষণায় দেখা গেছে তাদের মস্তিষ্কে এ নিয়ে বেশ অস্বস্তির বাতাবরণ তৈরি হয়। গবেষণায় এও দেখা যায়, যারা কারণে-অকারণে মিথ্যা বলেন ও প্রতারণা করেন তাদের মস্তিষ্কের উচ্চতর কেন্দ্রগুলো আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো নয়। অবিরাম মিথ্যা বলা লোকদের উচ্চতর মস্তিষ্ক কেন্দ্রগুলোতে কম পরিমাণে ধূসর বস্তু (গ্রে ম্যাটার) থাকে এবং অধিক পরিমাণ শ্বেতবস্তু (হোয়াইট ম্যাটার) থাকে। তাদের প্রিফ্রন্টাল এলাকাটিও একটু অস্বাভাবিক ধরনের। ধূসর বস্তুর কোষগুলো আমাদের চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর শ্বেতবস্তুর কোষগুলো সব কোষকে সংযুক্ত রাখতে সহায়তা করে। আর তাদের কথা বলার দক্ষতাও খুব বেশি। দেখা গেছে, মিথ্যাবাদীদের মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল এলাকার কর্টেক্স অন্যদের চেয়ে ১৪ দশমিক ২ শতাংশ কম ধূসর বস্তু থাকে এবং শ্বেতবস্তু থাকে ২২ শতাংশ বেশি। তার মানে, তাদের মিথ্যা বলার উপাদান অনেক বেশি থাকে। আর তারা নৈতিকতার দিক থেকেও পিছিয়ে পড়ে। কেননা, মস্তিষ্কের প্রিফ্রন্টাল এলাকাটি মানুষের নৈতিক বোধ ও আদর্শগত ভাবনা গড়ে দেয়। নৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকার কারণেও তারা মিথ্যা কথা দ্বিধাহীনভাবে বলে যেতে পারে।
তবে মিথ্যার সঙ্গে সত্য মিশিয়ে বলাটা এ জগতের সবচে ভয়ঙ্কর খেলার একটা। জার্মান পদার্থবিদ ও দার্শনিক জিসি লিগেটনবার্গ খানিকটা মিথ্যামিশ্রিত বা খানিকটা বিকৃত সত্যকে আখ্যায়িত করেছেন ‘সবচে ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক অসত্য’। মার্কিন মনোবিজ্ঞানী উইলিয়াম জেম্স্ আরেক ধরনের সত্যের কথা বলেছেন, যা সবচে খারাপ মিথ্যার চেয়েও খারাপ। তিনি মনে করতেন, এমন ভয়ঙ্কর মিথ্যা আর হয় না যা সত্যকে বুঝতে বাধা দেয়।
মিথ্যা বড় বৈচিত্র্যময়। মিথ্যা অতি ভয়ঙ্কর, আবার তা কখনো কখনো সত্যের চেয়েও অনেক সুন্দর। মিথ্যা ভয়ঙ্কর বলেই একে বলা হয় সব পাপের ‘মা’। কিন্তু তা কি করে সত্যর চেয়েও সুন্দর হয়? সুন্দর হয় তখন যখন সত্যও নিজেই হয়ে ওঠে অনিষ্টকারী, ধ্বংসকারী। যেমন, একটি মেয়ে পাগলের মতো ভালোবাসে একটি ছেলেকে। বিয়ের পর হানিমুনে গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়ে তারা। উদ্ধারের সময় দেখা যায়, মেয়েটির কোলে ছেলেটির নিথর দেহ, মেয়েটি বিড়বিড় করছে। এরপর চিকিত্সকরা আর সাহস পাননি মেয়েটাকে জানাতে যে ছেলেটি মারা গেছে। প্রবল মানসিক ট্রমায় আচ্ছন্ন মেয়েটি একা একা কথা বলে ওই ছেলেটির সঙ্গে। তার জগতে ছেলেটি মৃত নয়। মিথ্যা এখানে সত্যের চেয়েও সুন্দর।
মিথ্যার সৌন্দর্য অন্ধকারের সৌন্দর্যের মতো, যা সর্বার্থেই কুিসত নয়। তারপরও মিথ্যার বাড়বাড়ন্ত হলে জগত্ অরাজকতায় নাকানি-চুবানি খায়। সেটা মিথ্যাবাদী বা অসত্ মানুষের কাছেও কম যন্ত্রণার নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নাকি মিথ্যা ধরা পড়ে যায়। কিন্তু যদি এমন হতো যে, যে মিথ্যা বলবে সে এক হাত খর্বাকায় হয়ে যাবে, কিংবা তার নাক লম্বা হয়ে যাবে গল্পের সেই পিনোকিওর নাকের মত। সেই গল্পের দেশে মিথ্যা বললেই মিথ্যুকের নাক লম্বা হয়ে যেত কিছু সময়ের জন্য। মিথ্যা বলার সবচে বিপজ্জনক সমস্যা হলো, মিথ্যাটা সবসময় মনে রাখতে হয়। আবার ওই একটা মিথ্যা আড়াল করতে আরো দশটা মিথ্যা বলতে হয়।
এ লেখাটা মিথ্যায় ভরা। যদি আমি বলি ‘আমি কখনো সত্য কথা বলি না।’ তবে কথাটা কি সত্য হবে, নাকি মিথ্যা? আমি কখনো সত্য কথা বলি না— মানে আমি মিথ্যাবাদী। কিন্তু আমি যদি মিথ্যাবাদী হই, তবে আমার এই কথাটাও সত্য নয়। তার অর্থ আমি সত্য কথা বলি। কিন্তু তা কি করে হবে? আমি তো নিজেই বলেছি, আমি কখনো সত্য কথা বলি না। সত্য-মিথ্যা নিয়ে এটা একটা চমত্কার হেঁয়ালি। এর সঙ্গে বলা যায়, সত্যকে কি খুব সহজে নির্ণয় করা যায়? আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে জগতের সবকিছুই আপেক্ষিক। সত্যও আপেক্ষিক। তা হলে মিথ্যা বলবো কাকে?
লেখক : সাংবাদিক
ইমেইল : [email protected]
