সত্যিই সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। একটু মাটি খুঁড়লেই ফলে সোনার ফসল। গাছ-গাছালি,পাখ-পাখালির অপার্থিব সৌন্দর্যে ভরা এদেশ। নদী-নালা বিধৌত শ্যামল এ দেশটিকে দেখে মানুষ মাত্রেরই মন কাড়ে। তবু আমরা ভাল নেই, আর এ ভাল না থাকার দায় এ দেশের প্রকৃতির নয়, এ দায় আমাদের মত অমানুষদের, যারা এদেশটাকে ভালবাসে না। যদি আমরা সত্যিকারের মানুষ হতে পারতাম, তবে সত্যিকার অর্থেই এদেশটি সোনার বাংলাদেশ হতে পারতো। আমি এ লেখাটি লিখছি বাসে বসে, যাচ্ছি বাউফল থেকে বরিশাল। চলতে চলতে রাস্তার দু’পাশে অব্যবহূত জায়গা-জমি, নোংরা ও বদ্ধ জলাশয়গুলো দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। অথচ একটু সদিচ্ছা আর সুব্যবস্থাপনায় এগুলোর চেহারাই পাল্টে ফেলা যেত, কর্মসংস্থান হতে পারতো অনেক খেটে-খাওয়া মানুষের, যারা ছুটে যায় রাজধানীর ফুটপাতে অনিশ্চিত জীবনের ঝুঁকিতে বেঁচে থাকার নিদারুণ প্রয়াসে!
প্রতিটি উপজেলায় নানাবিধ দফতর রয়েছে, রয়েছে ক্যাডার ও নন-ক্যাডারের সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারী, যাদের হাতে ন্যস্ত রয়েছে নানারকম উন্নয়ন প্রকল্প। এসবের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার, আর মাথার উপর জ্বলছে জনভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা, যারা এলাকার মুখপাত্র হয়েই সংসদে বসেন। অকার্যকর ও হাস্যকর স্থানীয় সরকারের কথা আর নাইবা বললাম। আধুনিক মালয়েশিয়ার সফল রূপকার মোহাম্মদ মহাথেরো কি করে একটা অনুন্নত দেশকে উন্নয়ন কাতারের দেশে পরিণত করলেন? তিনি কি কোন যাদুর কাঠির সন্ধান পেয়েছিলেন? অবশ্যই পেয়েছিলেন,আর তা হল সুশাসন ও সঠিক দিক-নির্দেশনার যাদুকাঠি। একমাত্র ঐ কাঠিই পারে অসম্ভবকে সম্ভব করতে, অসুন্দরকে সুন্দর করতে। যে কাঠির সন্ধান আমরা আজও পাইনি। পেয়েছি লোভ-লালসা আর স্বার্থপরতার হাতছানি। তার পিছনেই ছুটছে তারা, যাদের হাতে দিয়েছি আমরা দেশ গঠনের মহান গুরুভার।
একটা দেশ তখনই ফুলে-ফলে ও সোনার ফসলে ঝলমলিয়ে ওঠে, হাসে প্রতিটি শিশু মায়ের কোলে পরিতৃপ্তির হাসি, যখন মা তাকে সুপুষ্টিতে ও নিরাপদে রাখার নিশ্চয়তা পায়। যখন দেশের মানুষ বাঁচার তাগিদে ছুটে যায় না শহর অভিমুখে, খোলা আকাশের নিচে রোদ-ঝড়-বৃষ্টিতে শুয়ে অভিশাপ দেয় না স্বীয় দুর্ভাগ্যকে। সেদিক থেকে দেখলে এর বিপরীত দৃশ্যই চোখে পড়ে, যেগুলো বাস্তবিক অর্থেই অমানবিক। শান্ত-সুশীতল গ্রাম-বাংলা আর বেঁধে রাখতে পারে না অভাগাদের তার স্নেহের আঁঁচলে, তাই মরিয়া হয়ে ছুটছে তারা প্রতিদিন হাজারে হাজারে শহর পানে, কাজের খোঁজে, শূন্যহাতে। ফুটপাত কিংবা স্টেশনে হয় তাদের ভাসমান ঠিকানা, তাড়া খেয়ে ফেরে এর-ওর হাতে, ভিক্ষাবৃত্তি, হকারি নয়তো ডাষ্টবিনের উচ্ছিষ্ট খেয়ে প্রিয় প্রাণটুকু বাঁচাতে চায় প্রাণপণে।
ওদিকে বড় বড় দালান-কোঠায় থাকছে যারা,তারা আরও টাকার ধান্ধায় অপরিকল্পিতভাবে, এমনকি অনুমোদন ছাড়াই ভবন উঠিয়ে ফেলে ১০/১২ তলা, যেখানে বসানো হয় বড় বড় শিল্প-কারখানা, আর উভয় মালিকই চুটিয়ে ব্যবসা করে খায়। ঐসব কারখানায় কাজ করতে আসে দূর-দূরান্ত থেকে গরীব মানুষেরা, মালিকেরা যাদের গাধার মত খাটিয়ে মারে, কিন্তু সে অনুপাতে মজুরি দেয় না। ঐ উঁচুতলার লোভীদের কাছে এদের জীবনের দাম অতি তুচ্ছ, তাইতো ভবন-ধস কিংবা অগ্নিকাণ্ডে এরাই মরে, বেরোনোর পথ রুদ্ধ থাকায় অসহায় আর্তনাদে প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে চলে যায়। আজ পর্যন্ত কোন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায়নি ঐ দুর্বৃত্তরা। বহাল-তবিয়তেই থাকে তারা, থাকবেও তারা। কারণ আমরা মানুষ নই।
শিক্ষক হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর, সেখানেও দুর্নীতির কালো ছায়া ঘিরে ফেলেছে। মেধাবী প্রার্থীরা প্রায়ই টাকার দৌড়ে পিছিয়ে যায়, আর টাকা ও রাজনৈতিক কুপ্রভাবে শিক্ষাঙ্গনেও ঢুকে পড়েছে এমন সব প্রার্থী, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ। আর তারাই নিয়েছে শিক্ষাদানের ভার, ফলে সহজেই অনুমেয় কি হাল করছে তারা শিক্ষাজগতের। আর ব্যবসায়ীদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে পুরো দেশটাকেই তারা গিলে খেতে চাইছে। এমনকি রাজনীতির ময়দানও আজ তাদেরই হাতের মুঠোয়। তাই তাদের হাজারো অপকর্ম, হাজারো কুকর্ম দাপটেই চলছে। আর এগুলো সুসম্পন্ন করার জন্য তারা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে, যা ভাঙার সাধ্য যেন কারো নেই। এই সিন্ডিকেট অবৈধ উপায়ে খাদ্য মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে, এলোপাতাড়িভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়িয়েই চলেছে। আর টাকার লোভে সবচেয়ে ঘৃণ্য ও মারাত্মক যে কাজটি করে চলেছে তা হল প্রায় সমস্ত খাবারে বিষাক্ত কেমিক্যাল মিশিয়ে বিক্রি করছে। মাছ-মাংস, ফল-মূল, দুধ, শাক-সবজি, এমন কোন খাদ্য নেই যাতে তারা বিষ-ভেজাল মিশাচ্ছে না। যেগুলো খেয়ে ক্যান্সারসহ নানাবিধ মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মরছে মানুষ। কারণ আমরা অমানুষ।
লোভসর্বস্ব অমানুষগুলোর তাতে কণামাত্র অনুশোচনা হয় না, এরা শুধু চেনে টাকা আর টাকা, আর এই টাকার জন্যই তারা অমানুষের কাতারে চলে গেছে। তাই দেশটা অন্যায়-অত্যাচার আর কুশাসনে ছেয়ে গেছে। অথচ যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশটাকে স্বাধীন করেছিল, করেছিল অপশাসন থেকে মুক্ত মুক্তিপাগল ভাইয়েরা, তখন রাজনীতিবিদরাও যে আদর্শে উজ্জীবিত ছিলেন, ছিলেন লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অবিচল, সেসব মহত্ গুণাবলি যদি ধরে রাখা যেত, আমরা অমানুষ হতাম না, মানুষ হয়ে উঠতাম সত্যিকার অর্থেই।
লেখক : প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা
বাউফল কলেজ, বাউফল, পটুয়াখালী
[email protected]
