বগুড়ায় যন্ত্রাংশ তৈয়ারির ছোট একখানা কারখানা গড়িয়া উঠিয়াছিল ষাটের দশকে। আজ সেই বগুড়া বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈয়ারির কেন্দ্রে পরিণত হইয়াছে। সরকারি বিশেষ কোনো সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়াই স্থানীয় উদ্যোক্তা ও স্বশিক্ষিত মেকানিকরা এইখানে খুলিয়া দিয়াছেন সম্ভাবনার দুয়ার। গত শতাব্দীর আশির দশক হইতে এই পর্যন্ত বগুড়া শহর ও সন্নিহিত এলাকায় বিবিধ কৃষি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈয়ারির দুই শতাধিক কারখানা গড়িয়া উঠিয়াছে। এইসব কারখানায় কর্মসংস্থান হইয়াছে কম করিয়া হইলেও ১ লাখ মানুষের। বগুড়ার কৃষি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশ এখন পর্যন্ত রফতানিমুখী হইয়া উঠিতে না পারিলেও আমদানি বিকল্প হিসাবে সাশ্রয় করিয়া চলিয়াছে কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রা। ষাটের দশক হইতে শুরু করিয়া সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন নামমাত্র ভাড়ায় কৃষকদের সেচযন্ত্র সরবরাহ করিত। সেই সময় ছোট-বড় পাওয়ার পাম্প, শ্যালো টিউবওয়েল, গভীর নলকূপ এবং এইসবের যন্ত্রাংশ বিএডিসি বিদেশ হইতে আমদানি করিত। সেই ব্যবস্থার অবসান ঘটিলেও সময়ের ব্যবধানে চাষাবাদে যুক্ত হইয়াছে আধুনিকতা। মান্ধাতার আমলের লাঙল- জোয়ালের স্থান দখল করিয়া নেয় পাওয়ার টিলার। বীজ বপন ও শস্য মাড়াইয়ের ক্ষেত্রেও শুরু হয় যন্ত্রের ব্যবহার। অন্যদিকে যান্ত্রিক সেচ অপরিহার্য হইয়া পড়ে। এই অবস্থায় বাংলাদেশে কৃষি যন্ত্র ও যন্ত্রাংশের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হইলে অচিরাত্ এইখানে বিদেশি যন্ত্রপাতির বৃহত্ বাজার গড়িয়া উঠে।
কিন্তু ইহার মধ্যে বগুড়ার উদ্যোক্তা ও মেকানিকগণ যন্ত্রাংশ তৈয়ারির ক্ষেত্রে ঘটাইয়া দিয়াছেন যুগান্তর। বগুড়া এখন দেশে কৃষি যন্ত্রাংশের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশই পূরণ করিয়া থাকে। অনুকূল পরিবেশ এবং সামান্য প্রণোদনা ও প্রশিক্ষণ পাইলে মোট চাহিদার শতভাগই পূরণ হইতে পারে। উপরন্তু কৃষি যন্ত্রাংশ রফতানি করিয়া বাংলাদেশ আয় করিতে পারে উল্লেখযোগ্য অংকের বৈদেশিক মুদ্রা।
বাংলাদেশের মানুষের উদ্যম-উদ্যোগ, মেধা ও সৃজনশীলতার কোনো অভাব নাই। দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার প্রাচীর ডিঙ্গাইয়া যাইবার জন্য এই দেশের উদ্যমী মানুষের মেধা ও শ্রমশীলতা নিঃসন্দেহে বিরাট এক শক্তি। এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাইতে পারিলে আমাদের দেশটির পিছাইয়া থাকিবার কোনো কারণ থাকিতে পারে না। বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ তৈয়ারি শিল্পের ন্যায় আরও বহু সম্ভাবনাময় খাত রহিয়াছে যেইগুলির যথাযথ বিকাশ ঘটিলে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত হইতে পারে নবতর মাত্রা। সেইসব সম্ভাবনাময় খাতের কোনো কোনোটি কিছুটা বিকশিত হইয়াছে, কোনো কোনোটি রহিয়া গিয়াছে অবিকশিত পর্যায়ে। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ শিল্প ইতিমধ্যে বিশ্ব বাজারে স্থান করিয়া লইয়াছে। এই দেশে জাহাজ এবং ছোট-বড় নৌযান নির্মাণের ঐতিহ্য অবশ্য শত শত বর্ষের। পনের হইতে সতের শতাব্দী সময়ের মধ্যে এই দেশে সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিস্ময়কর বিকাশ ঘটিয়াছিল। সেই সময় এইখানে যুদ্ধজাহাজ পর্যন্ত নির্মিত হইয়াছে। এক সময় মোগলদের নৌবহরে ঢাকায় তৈয়ারি নৌজাহাজ ব্যবহূত হইয়াছে। ১৮০৫ সালে ট্রাফালগারের যুদ্ধে চট্টগ্রামে নির্মিত জাহাজ ব্যবহূত হইয়াছিল। কিন্তু নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় নাই। তবে এতদিন পরে হইলেও বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প ঘুরিয়া দাঁড়াইয়াছে। বিদেশি বড় বড় কোম্পানির জন্য সমুদ্রগামী বৃহদায়তন জাহাজ নির্মিত হইতেছে বাংলাদেশে। ইহার আরও বিকাশ যে ঘটিবে তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই।
জাহাজ শিল্পের মতো ছোট-বড় আরও অনেক শিল্পের বিকাশমান ধারায় গতি সঞ্চারের সমূহ সম্ভাবনা আমাদের রহিয়াছে। ছোট ছোট উদ্যোগ, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পের প্রসারকে অবশ্যই উত্সাহিত করিতে হইবে। স্মল ইজ বিউটি—ক্ষুদ্রই সুন্দর—এই নীতিকে উপেক্ষা করিবার সুযোগ নাই। বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ তৈয়ারি শিল্পের আরও বিকাশ ও আধুনিকায়নের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করিতে হইবে। গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, ঋণপ্রদান এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রফতানি মানের যন্ত্রাংশ তৈয়ারির দিকে মনোনিবেশ করা জরুরি।
