১৫ আগস্ট : ঠান্ডা লড়াইয়ের নৃশংসতার প্রতীক

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৬
আজ শোক ও সন্তাপের বার্তাবাহী একটি দিন, ১৫ই আগস্ট। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে নির্মম ও কলংকজনক এক অধ্যায়। ১৯৭৫ সালের এই দিনে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁহার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মানবেতিহাসে এমন ঘৃণ্য দৃষ্টান্ত বিরল। আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, জন এফ কেনেডি, মার্টিন লুথার কিং, নক্রুমা, বেনবেল্লা, সুকর্ণ প্রমুখ দেশবরেণ্য ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তি রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের নির্মম শিকার হইয়াছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড সকল প্রকার নৃশংসতা ও ট্রাজেডিকে ছাড়াইয়া গিয়াছে। এই বর্বরতম ও কাপুরুষোচিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিধারাকে পাল্টাইয়া দেওয়া হয় রাতারাতি। জাতীয় জীবনে সৃষ্টি হয় গভীরতম ক্ষত ও বড় ধরনের বিভেদ, যাহার প্রতিক্রিয়া হইতে আমরা আজও মুক্ত হইতে পারি নাই। প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বকে ঘিরিয়াই আমরা গত শতাব্দীর মধ্য-ষাট দশক হইতে শোষণ-বঞ্চনা হইতে মুক্তিলাভের স্বপ্নে বিভোর হই। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল হইয়া উঠি। একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বর বহুকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা অর্জিত হইবার পর ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ তিনি পাকিস্তানের বন্দীদশা হইতে মুক্তিলাভ করিয়া স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে সগৌরবে পদার্পণ করেন। তখন সারাদেশে জাগিয়া উঠিয়াছিল রোমাঞ্চ। আমরা কবিগুরুর কথার প্রতিধ্বনি করিয়া লিখিয়াছিলাম, ‘ঐ মহামানব আসে’। লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মদান ও সম্পদ-সম্পত্তির সীমাহীন ক্ষয়-ক্ষতির মধ্য দিয়া বিশ্বসভায় ও মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের অভ্যুদয় হয়। এই অভূতপূর্ব ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে আমাদের সম্মুখে অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলিয়া দেয়। যাবতীয় ভেদ-বৈষম্য দূর করিয়া একটি ন্যায়ভিত্তিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা সেদিন বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করিয়াই অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিকভাবে মুক্ত হইয়া বিশ্বে মাথা উঁচু করিয়া দাঁড়াইতে চাহিয়াছিলাম। তিনি ষাট দশকের রাজনীতির পটভূমিতে এমনই এক বিস্ময়কর ও ক্যারিশমেটিক জাতীয় নেতায় পরিণত হইয়াছিলেন যাহাকে কোনকিছুর বিনিময়ে পরাস্ত করা সম্ভব ছিল না। এভাবে জাতি ও নেতা এক বিন্দুতে আসিয়া মিলিয়া যায়, এক মোহনায় আসিয়া একাকার হইয়া যায়। ১৯৬৯, ’৭০ ও ’৭১ সালে আমরা বঙ্গবন্ধু ও জনতার এই একাকার রূপ দেখিয়াছি। তবে পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তর দশকে বিশ্বে দ্বিমেরুকরণের যুগে বিপরীতমুখী দুই আদর্শ পুঁজিবাদ ও সমাজতন্ত্রের শীতল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এককালের উপনিবেশ তথা তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অকুতোভয় ও নিরাপোষ জাতীয় নেতাদের ঘায়েলের চেষ্টা চলিয়াছে। জনপ্রিয় ও জনদরদী নেতাদের হত্যা করিতেও প্রতিপক্ষ কসুর করে নাই। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিরিখে দেখিতে গেলে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড তাহারই ধারাবাহিকতার অংশ। তিনি তখনকার কোল্ডওয়ার বা ঠান্ডা লড়াইয়ের নৃশংসতার শিকার হইয়াছেন, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। যদিও ইহার সহিত সরাসরিভাবে জড়িত ছিল এই দেশীয় বৈরি শক্তি। সেসময় এক পক্ষ ভারত ও রাশিয়ার প্রভাববলয়ে প্রণীত সংবিধানের মূলনীতি গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদকে পুরাপুরি মানিয়া নিতে পারে নাই। অন্য পক্ষ শেষের দিকে পাকিস্তানে অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর যোগদান ও মধ্যপ্রাচ্যসহ মুসলিম দেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে ভাল চোখে দেখে নাই। ইহারই প্রেক্ষাপটে ঘটে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকান্ড। এই ক্ষেত্রে একটি লক্ষণীয় বিষয় হইল, ‘৭১ সালের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বের কাহারও স্বাভাবিক মৃত্যু হয় নাই। ইহাও গভীর চিন্তা ও গবেষণার বিষয় বৈকি। সত্তর দশকে বঙ্গবন্ধুর ন্যায় একইভাবে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার হন কঙ্গোর লুলুম্বা ও চিলির আলেন্দে। এভাবে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলিতে নেপথ্য শক্তি ফায়দা হাসিল করিয়াছে এবং জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে ধ্বংসের চেষ্টা চালাইয়াছে। ইহার পরিণামে এসব দেশে অনেক সময় হত্যার রাজনীতি হত্যাকেই ডাকিয়া আনিয়াছে। ফলে সংশ্লিষ্ট দেশটির স্থিতিশীলতা যেমন নষ্ট হইয়াছে, তেমনি জাতিও বহুধাবিভক্ত হইয়াছে। নব্বই দশকের দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দৃশ্যত সেই ঠান্ডা লড়াইয়ের অবসান হয়। তাহার পর পৃথিবীতে অপ্রতিরোধ্য হইয়া ওঠে একক শক্তির প্রভাব। ইহার মধ্যে আফগানিস্তান ও ইরাক আক্রমণসহ ঘটে নানা ঘটনা। এখন মাল্টিপোলার বা বহুমেরুকরণের যুগ। এই যুগে চীন ও ভারতসহ কয়েকটি আঞ্চলিক শক্তি বৃহত্ শক্তির আকার ধারণ করিতে যাইতেছে। উঠতি শক্তিগুলিও প্রভাব বলয় বিস্তারে সক্রিয় রহিয়াছে। এমতাবস্থায় উন্নয়নশীল দেশ ও এতদঞ্চলের জাতীয়তাবাদী নেতাদের আরও সতর্ক হইবার সময় আসিয়াছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আপাদমস্তক একজন আপোসহীন জাতীয়তাবাদী নেতা ছিলেন। তিনি এই দেশের সর্বস্তরের মানুষকে মনেপ্রাণে ভালবাসিয়াছিলেন। এই দেশ গরীব হইতে পারে, কিন্তু তাঁহার আত্মসম্মানবোধ ছিল প্রখর। ইহারই মূল্য তাঁহাকে দিতে হইয়াছে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে। এভাবে ক্ষুদ্র ও দুর্বল দেশের রাষ্ট্রনায়করা যখনই জাতীয় স্বার্থের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন, তখনই জন্ম দেওয়া হইয়াছে ভয়াবহ ঘটনার। কিন্তু দেশ ও বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসাবে বঙ্গবন্ধুর নাম লেখা থাকিবে স্বর্ণাক্ষরে। আমরা আজ শোকাবহ এই দিনে গভীর শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেই সঙ্গে তাঁহার ও ১৫ আগস্টে নিহত সকলের রুহের মাগফিরাত কামনা করি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন