মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধু ঘাতকের নিষ্কম্প হাত

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৮
বাঙালিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ খৃ:-এ এই মহান বাঙালির মৃত্যু ঘটে এক নিদারুণ ট্র্যাজিক ঘটনার মাধ্যমে। তার সাথে শাহাদাত্ বরণ করেন তার প্রিয়তমা সহধর্মিণী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা। আসলে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুকে সরলীকরণ করে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক ও দেশীয় চক্রের সম্মিলনে তাঁর এই ট্র্যাজিক হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের ফলে দেশের উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল বাঙালির উন্নয়ন সাধন করা। তাঁর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পেয়েছি। এটি সহস্র বছরের অধিককাল ধরে বাঙালির চিন্তা-চেতনার মর্মমূলে ছিল। বাঙালি কখনো মাথানত করেনি। নূরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায় যে, বঙ্গবন্ধু না ছিলেন বামপন্থি, না ছিলেন ডানপন্থি—তিনি ছিলেন একজন খাঁটি বাঙালি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব। তিনি কিউবায় পাট রপ্তানি করেন। আবার যুদ্ধাপরাধীদের মধ্যে যারা খুন, ধর্ষণ দাঙ্গা করেছেন তাদের ক্ষমা করেননি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই দেশে ফিরে বাঙালির উন্নয়নের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন স্বনির্ভর, স্বাবলম্বী হোক রাষ্ট্র। দেশে ফেরার পূর্বেই ভারতে পৌঁছে তিনি কবে ভারতীয় বাহিনী কত স্বল্প সময়ে এ দেশ থেকে যাবে তার ব্যবস্থা করেছিলেন। গরীব-দুঃস্থ মানুষের প্রতি ছিল তার অকুণ্ঠ ভালবাসা। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন। সরকারি স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে সচেষ্ট ছিলেন। তিনি পল্লী অঞ্চলে আমানতের সুদের উপর ১% বেশি প্রদান এবং ঋণের সুদের উপর ১% কম প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। তিনি তেল, গ্যাস উত্তোলনের জন্যে বাপেক্স গঠন করেন। যাতে করে সমতা ভিত্তিক ও ন্যায় নীতি ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যায় সে জন্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। বিলনওয়ালার বদলে দৌহগ্রাম, আঙ্গরপোতা ছিটমহলের ব্যবস্থা করেন। সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্যে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর বিকল্প নেই। এদিকে তিনি যে বাকশাল গঠন করেছিলেন, তা আসলে দেশের মানুষের ত্বরিত উন্নয়নের জন্যে গঠন করা হয়েছিল। বস্তুত বাকশাল ছিল সাময়িক ব্যবস্থা। কেননা তিনি গণতন্ত্রমনা ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ভাবতে পারেননি যে, এরকম ইতিহাসের জঘন্যতম ঘটনা ঘটবে। তিনি ভাবতে পারেননি যে, নিজ দেশের সৈনিকদের হাতে তাকে চলে যেতে হবে। আসলে মহামানবরা দেশের কল্যাণে নিবেদিত থাকেন। তারা কখনো তাদের উঁচু মাথা হেট হতে দিতে চান না। তিনি অবিচল নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেছেন। ঘাতকেরা তলে তলে সংঘটিত হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের প্রতি যে নির্মম অবিচার করা হয়েছে তার কোন জুড়ি নেই। এই ধরনের পৈশাচিক আক্রমণ ও বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। প্রকৃত বাঙালি কখনো বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচারকে সমর্থন করেনি, বরং ঘৃণা ও ধিক্কার জানিয়েছে। তিনি ছিলেন পর ধর্মমত সহিষ্ণু ব্যক্তিত্ব। অসাম্প্রদায়িক এই ব্যক্তিত্ব ওআইসি সম্মেলনে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি নাস্তিকতাকে কখনো প্রশ্রয় দেননি। আর তাই তো দাউদ হায়দারকে দেশ থেকে বের করে দেন। তিনি ছিলেন মনে-প্রাণে একজন অসাম্প্রদায়িক চেতনাসম্পন্ন ব্যক্তি। সে জন্যই যার যার ধর্ম যথাযথ প্রতিপালনে বিশ্বাসী ছিলেন। যখন কেউ ভাল কাজ করেন তখন যারা ভাল কাজ দেখতে পারেন না তারা পেছনে লাগেন। ১৫ আগস্ট, ১৯৭৫-এর কালোরাত্রিরে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে ঘাতকেরা নৃশংসভাবে খুন করল। আসলে ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে অন্যায়কারীরা দীর্ঘদিন বেঁচে থেকে অন্যায় করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর মত মহীরুহের ছায়ায় দেশের যে উন্নয়ন সংঘটিত হচ্ছিল তা থেকে পিছিয়ে দেয়ার মানসে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। যে সমস্ত দেশি-বিদেশি চক্র এই হত্যাকাণ্ডের সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল তারা সাময়িকভাবেও রাষ্ট্রের বেশ ক্ষতি করেছিল। অথচ ইচ্ছে করলে তার বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র ছিল সেটি যথাসময়ে ফাঁস করলে তার ও তার পরিবারবর্গের করুণ পরিণতি হতো না। জীবনে কখনো মাথা নত করেননি এবং এদেশে স্বল্পকালে স্বকীয়তা দ্বারা শাসন পরিচালনা করেছিলেন। এখন বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথ ধরে। স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতাকারীরা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে উল্লসিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মূল শিক্ষা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িকতাসম্পন্ন মানুষ কিন্তু ধর্মহীন নয়; নারী-পুরুষ সমতাভিত্তিক উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো বিনির্মাণ, দেশের খনিজসম্পদকে দেশের উন্নয়নে ব্যবহার করা। বঙ্গবন্ধুর মহান নেতৃত্বে যে স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, তা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। গত বিয়াল্লিশ বছরে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজটি যে কোনভাবে হোক বর্তমান সরকারের আমলে অগ্রাধিকারভিত্তিতে সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে নির্মাণের কাজে অনতিবিলম্বে শুরু করতে হবে। ক্ষুদ্র ঋণের টাকা অন্য খাতে যারা ফাণ্ড স্থানান্তরিত করে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যে লাগাচ্ছে তাদের আইনের আওতায় আনা হোক। বঙ্গবন্ধুর আরেকটি শিক্ষা ছিল তিনি সকল দলের সহাবস্থানে বিশ্বাস করতেন। এ ব্যাপারে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেয়া উচিত। আশা করা যায় ইতিহাসের বাঙালির মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার কর্মের দেদীপ্যমানতায় সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবেন। পরিশেষে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যবর্গসহ যারা মৃত্যুবরণ করেছিলেন তাদের আল্লাহ জান্নাতবাসী করুন। লেখক: উপাচার্য প্রেসিডেন্সী বিশ্ববিদ্যালয় ও ম্যাক্রো ইকনোমিস্ট