দারিদ্র্য কি কেবলই মানসিক

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
দারিদ্র্য একটি মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। সম্প্রতি এই মন্তব্য করিয়াছেন রাহুল গান্ধী। তিনি এই মন্তব্যটি করিয়াছেন ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে। তাহা হইলেও ইহার মধ্যে সর্বজনীন আবেদন রহিয়াছে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্য লাঞ্ছিত দেশসমূহের বাস্তবতার নিরিখেও এই মন্তব্য সবিশেষ তাত্পর্য বহন করে। বিষয়টি লইয়া এরই মধ্যে বিতর্ক বেশ জমিয়া উঠিয়াছে। টুইটারে ঝড় উঠিয়াছে। একজন বলিয়াছেন, দারিদ্র্য যদি কেবলই মানসিক অবস্থা হয় তাহা হইলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সকলকে ভারতের মানসিক হাসপাতালগুলিতে পাঠাইয়া দেওয়া হউক, সুস্থ হইয়া ফিরিলেই তাহারা বড়লোক হইয়া যাইবে! রাহুলের রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বিপুল সম্পদের অধিকারী পারিবারিক ঐতিহ্যকে কটাক্ষ করিয়া আরেকজন লিখিয়াছেন, ‘তিনি দরিদ্র ঘরে জন্মাইলে অভাবের ঠ্যালা বুঝিতে পারিতেন!’ অবশ্য কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী, এলাহাবাদে দলিত রিসোর্স সেন্টার আয়োজিত আলোচনায়, সমাজের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীগুলির অগ্রগতিতে স্বনির্ভরতা সংগঠনগুলির প্রশংসা করিয়া দারিদ্র্য বিমোচনে আত্মবিশ্বাসের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। বস্তুত, দারিদ্র্য বলিতে খাদ্য ঘাটতি, অর্থাভাব কিংবা কোনো বস্তুগত অভাব বুঝায় না। কেউ যদি আত্মবিশ্বাস অর্জন করিতে পারে, তাহা হইলে দারিদ্র্যও জয় করিতে পারে।’ তাহাকে সমালোচনা করিয়া সম্পূর্ণরূপে খারিজ করিয়া দিবার পূর্বে আমরা কথাটি একটু গভীরভাবে ভাবিয়া দেখিতে পারি। আমরা বলিব রাহুলের কথাটিতে অনেকটাই সত্যতা আছে, তবে সবটুকু নাই। মানসিকতার পরিবর্তন হইলেই সব পরিবর্তন হইয়া যাইবে,- এমনও নহে। কারণ, মানসিকতা পরিবর্তনেরও পূর্বশর্ত লাগে। বাংলাদেশ বা ভারতের মতো উপনিবেশ-উত্তর তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে দারিদ্র্য উত্পাদিত হয়, একই সাথে দারিদ্র্যের হীনমন্য মানসিকতাও উত্পাদিত হয়। উদারনৈতিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ভিতরেই এমন কলকব্জা বসানো রহিয়াছে যে, উন্নত বিশ্বের সহিত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি অসম বাণিজ্যিক ও অনুদানের সম্পর্কে বাঁধা পড়িয়া থাকে। একই কারণে সমাজের নিরানব্বই ভাগ মানুষ প্রতিদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি খাটিয়াও নিজেদের অবস্থার উন্নতি ঘটাইতে পারে না- তাহাদের ঘরে নুন আনিতে পান্তা ফুরাইয়া যায়; কিন্তু একভাগ মানুষ সমাজের সকল সম্পদের অধিকারী হইয়া পড়ে- সকল আমোদ-প্রমোদ, ভোগ-বিলাস এবং ক্ষমতা তাহাদেরই আঙ্গুলের ফাঁকে খেলা করে। ফলে, বলা যাইতে পারে, ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির অর্ধশতাধিক বত্সর পরেও কাঠামোগতভাবেই আমাদের সমাজব্যবস্থা দারিদ্র্য উত্পাদন করিয়া চলিয়াছে। কিন্তু, এই কাঠামোটিকেই আমরা চিনিতে পারি না, ভাবিতে থাকি, ইহাই চিরন্তন, দারিদ্র্যই সমাজের সিংহভাগ মানুষের ললাটলিখন। সুতরাং দারিদ্র্য বিশেষ মানসিক অবস্থা তো বটেই। কিন্তু বৈষম্যমূলক কাঠামোর কথাটি উচ্চারণ না করিয়া কেবলই মানসিকতার কথা বলিলে সমাজের কিছু মানুষের হাতে সম্পদ কুক্ষিগত হইয়া পড়িবার কৌশল ও সুদীর্ঘ ইতিহাস আড়াল হইয়া যায়। এই কারণেই রাহুল সমালোচনার মুখে পড়িয়াছেন। যে কাঠামোগত বন্দোবস্ত সমাজে দারিদ্র্য টিকাইয়া রাখে, সেই একই কাঠামো দরিদ্র্যতার মানসিকতাও পুনরুত্পাদন করিয়া চলে সমাজের সুবিধাভোগীদের স্বার্থে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থাটি টিকাইয়া রাখিতে। আর এই পরিস্থিতি ও কাঠামোটি বদলাইতে হইলে, সত্যিকারের গণতন্ত্র, সুশাসন ও সাম্য প্রতিষ্ঠা করিতে হইলে সর্বাগ্রে আমাদের মানসিকতারই পরিবর্তন ঘটাইতে হইবে। নিজেদের অধিকার, স্বার্থ ও সুবিধা আদায় করিয়া লইবার মতো সচেতন ও সক্রিয় হইয়া উঠিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন