কী ব্যক্তি জীবনে, কী সৃজনশীলতায়—মুর্তজা বশীর গড়ে তুলেছেন নিজের পথ। তাঁর জীবনে নেই কোনো অবসর। যখন ছবি আঁকেন না তখন তিনি নিজের সংগ্রহের মুদ্রা, টাকা, ডাকটিকেটের মধ্যে নিমগ্ন হয়ে যান। আবার তিনিই মুদ্রার মধ্যে খোঁজেন ইতিহাসের অলি-গলি। এ অন্বেষণের ভেতর দিয়ে এই অঞ্চলের জীবন বাস্তবতার পরম্পরা পায় নতুন মাত্রা। অন্যদিকে তিনি কলম ধরলে শুধু নিজেকেই মেলে ধরেন।
এ সবকিছুর মধ্যেও তিনি ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনকে অগ্রাহ্য করেন না। বাজারে গিয়ে তিনিই মাথা পরীক্ষা করে খোঁজেন তাজা মাছ। আবার পরিবারের সদস্য থেকে শুরু করে পরিচিতজনদের প্রতি রয়েছে তাঁর সুনজর। কেউ কোনো পরামর্শ ও নির্দেশনা চাইলে তিনি সঠিক রাস্তাটিই বাতলে দেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো কিছু গড়তে হলে, সৃষ্টি করতে হলে নিজের ক্ষমতা দিয়েই করতে হবে। এ কারণেই বাঙালি, বাংলাদেশ, বাংলার মানুষ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। আপনার কাছে আমাদের অনুরোধ—এই ভাবনাকে লিপিবদ্ধ করে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিন।
শিল্পী মুর্তজা বশীরের কাছে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই মূল্যবান। তাইতো তিনি কোনোকিছুকেই বৃথা যেতে দেন না। এমনকি তাঁর কাছে বিশ্রাম নেয়াও হয়ে যায় সৃজনশীলতার অংশ। প্রতিটি মুহূর্তকেই তিনি উপভোগ করেন। তাঁর সৃজন ভুবনের দিকে তাকালে আমরা দেখবো—কতভাবেই না তিনি নিজের সৃজন ক্ষমতাকে ভেঙ্গেছেন-গড়েছেন। ‘বিমূর্ত বাস্তবতাবাদ’ বলে আলাদা শিল্প রীতির জন্ম দিয়ে তিনি পৃথিবীর শিল্প ইতিহাসকে করেছেন সমৃদ্ধ। আমরা আশা করি, ভবিষ্যতে এই ধারণা আরো নানাভাবে বিকশিত হবে। তাঁর আঁকা ‘পাখা’ সিরিজ উল্লেখিত ধারণার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। তিনি শুধু ‘বিমূর্ত বাস্তবতাবাদ’ রীতি নিয়ে নিরীক্ষা করতে ‘পাখা’ আঁকেননি; ‘পাখা’র মাধ্যমে তিনি মানুষের আশা জাগানিয়া মনকে অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছেন।
প্রায়ই তিনি বলেন, শিল্পের একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। তাই যখন তিনি ছবি আঁকেন—বিশ্বের শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে অবগত হয়ে শক্তি নিয়েই নিজের জমিনের ওপরে দাঁড়ান। তাঁর আঁকা ‘নারী’ আমাদের সেই কথাই প্রমাণ করে। এভাবেই তিনি নিজেকে নিজেই ছাড়িয়ে যান। এর ফলে কতভাবেই না তিনি ছবি এঁকেছেন—করছেন নিজেকে সবার চেয়ে আলাদা। হয়তো এ কারণেই তিনি তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে এঁকেছেন ‘আত্মপ্রতিকৃতি’। তাঁর আঁকা বহুমাত্রিক ‘আত্মপ্রতিকৃতি’র সংখ্যা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে শিল্পরসিক মাত্রই অবগত আছেন।
এভাবেই তিনি জীবনের আট দশক অতিবাহিত করেছেন। আগামীকাল তিনি ৮৩ বছরে পদার্পণ করবেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমাদের তা মনেই হবে না তাঁর এত বয়স হয়েছে। বরং তিনি প্রতিনিয়ত নিজেকে প্রকাশ করতে উদ্গ্রীব—করতে চান নতুন কিছু। আমরাও তাঁর নতুন সৃজন ভুবন দেখার অপেক্ষা করছি। তাঁর এই নতুন কিছু করার স্পৃহা আমাদের কাছে অনুপ্রেরণা ও অনুকরণীয়। শিল্পী মুর্তজা বশীরকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।
লেখক :সাংবাদিক
