[ রা জ নী তি]

বিএনপি-মজীনা বৈঠক:বলা না-বলা বিষয়

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:০৯
সোমবার রাতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনার সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির শীর্ষ স্থানীয় কয়েকজন নেতার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বলা হয়েছে, মার্কিন রাষ্ট্রদূতের আগ্রহে বৈঠকটির আয়োজন করেছে বিএনপি। বৈঠক শেষে ড্যান মজীনা অপেক্ষমাণ সাংবাদিকদেরকে বৈঠকে আলোচিত বিষয়সমূহ সম্পর্কে অবহিত করেছেন। সাংবাদিকদের কিছু অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাবও তিনি দেন। পত্র-পত্রিকায় সংক্ষিপ্ত আকারে ড্যান মজীনার দেয়া বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে। তবে ড্যান মজীনার সঙ্গে বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বৈঠকটিকে ঢাকার কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক মহল নানা দিক থেকেই গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও ড্যান মজীনা সবেমাত্র ওয়াশিংটন থেকে ঘুরে আসার সময় পকেটে বয়ে আনা জিএসপি সুবিধা পাওয়া নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন, রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা যুক্তরাষ্ট্র আর দেখতে চায় না বলে উল্লেখ করেছেন। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা অন্যান্য দেশ কী ভাবছে, বিএনপির ভাবনা-চিন্তা কী, কী করতে যাচ্ছে দলটি—এসব বিষয়ে বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং ড্যান মজীনার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান কী—তা জানতে বেশি আগ্রহী ছিল। তবে কিছু কিছু প্রাথমিক ধারণা নেয়া-দেয়ার বেশি রাজনৈতিক গুরুত্ব সোমবারের বৈঠকে ছিল বলে মনে হয় না। ড্যান মজীনার কথাবার্তাতেও যে ধারণা পাওয়া গেছে তা এর চাইতে বেশি কিছু নয়- এমনটি স্পষ্ট। তবে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে বড় ধরনের কোনো আন্দোলনে গেলে তা সহিংসতার মাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে, তার পরিণতি কী হতে পারে, বিএনপির নিয়ন্ত্রণে সেই আন্দোলন কতোটা থাকবে, তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো যথেষ্ট পরিমাণ সন্দিহান ও শঙ্কায় আছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সমাধানের বিষয়টি দেখতে চায়—এর বেশি কিছু বলেননি। তার দেশ সহিংস কর্মসূচি দেখতে চায় না- রাষ্ট্রদূতের এ কথার মধ্যেই অনেক অর্থ নিহিত রয়েছে। নিকট-অতীতে এসব বিরোধী দলের আন্দোলনের নামে যে ধরনের সহিংসতা ঘটেছে, পোড়াপুড়ি, ভাংচুর, হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর ও মন্দিরে আগুন দেয়া, মূর্তি ভাংচুর করা সেসবের গোপন তথ্য মার্কিনসহ পশ্চিমা দেশগুলোর সরকারের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ রয়েছে, এসব কর্মকাণ্ডে কারা জড়িত ছিল, কারা সেগুলো অস্বীকার করেছে, তারা কারা, রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কী, সরকার, বিরোধী আসন্ন আন্দোলনে তারা কী করতে পারে, এই সহিংসতাকে তারা তখন কোন মাত্রায় ছড়িয়ে দিতে পারে—এসব বিষয়ে মার্কিনিদের তথ্য ভাণ্ডার ও নিজস্ব ধারণার অবস্থান মোটেও অন্যের ওপর নির্ভরশীল নয়। ফলে তারা যখন বলে, আন্দোলনের নামে সহিংস কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্র সরকার সমর্থন করে না তখন তারা দেশের রাজনীতির এসব বাস্তবতা মাথায় রেখেই তা বলে থাকে কেননা, এ ধরনের সহিংসতা বিএনপি হয়তো চাইবে না, কিন্তু আন্দোলনে অংশ নেয়া এমন কিছু গোষ্ঠী এমনভাবে চাইবে যা নিয়ন্ত্রণ করা বিএনপির পক্ষেও সম্ভব হবে না। সে ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য ভয়ানক হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখন যে ধরনের সরকারের অধীনেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন, কারচুপি করে কেউ জয়লাভ করতে পারবে না, সেই ব্যর্থ চেষ্টার ঝুঁকি কোনো সরকারই নিতে চাইবে না। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দেশ পরিচালনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা নিয়ে অনেক অভিযোগই করা যেতে পারে, অনেক অভিযোগের শক্ত ভিত্তি হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবেও, আবার বাংলাদেশে যতোটা না ঘটে তার চাইতে হাজারগুণ বেশি রটেও। ফলে এ নিয়ে চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বস্তবোচিত বিশ্লেষণ, মন্তব্য এবং ধারণা প্রতিষ্ঠায় যথেষ্ট ঘাটতি আছে। আওয়ামী লীগ এ ক্ষেত্রে কুপকাত হয়ে আছে। তবে দেশে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি, আন্দোলন এবং নিজেদের বলিষ্ঠ অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার দৃষ্টান্ত দলটি বরাবরই রেখেছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা, খাদ্যোত্পাদনসহ বিভিন্ন সূচকে ইতিবাচক অবদান রাখার কৃতিত্বও দলটি যথার্থই দাবি করতে পারে, একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জঙ্গিবাদ নিয়ে উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার জায়গায় আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশের জন্য একটি জায়গা করে নিয়েছে। বিষয়গুলো পশ্চিমা বিশ্ব, প্রতিবেশী দেশ ভারত কতোটা বিবেচনায় রাখে তা তারা মুখ খুলে কোনো দিনই প্রকাশ্য বৈঠকে না বললেও তাদের হিসাব ও বিবেচনায় বিষয়গুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ আছে এতে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা বাণিজ্যের পাশাপাশি ভূ-রাজনীতি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, উদার গণতন্ত্রের বিষয়গুলো তাদেরকে এখন বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে, তারা তা দিয়েইও থাকে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে থাকা দলগুলোর আদর্শ, কর্মকাণ্ড, তাদের আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি,ক্ষমতায় গিয়ে তাদের অবস্থান কী হতে পারে, অতীতে কী ছিল, এখন কেমন আছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গিয়ে বিষয়গুলো বাংলাদেশকে নিয়ে যারা ভাবেন, বাংলাদেশের সঙ্গে যাদের অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ-সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তারা অনেক বেশি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্মভাবে বিচার বিশ্লেষণ করে থাকেন, দেশের রাজনীতির ওপর সেভাবেই তাদের দৃষ্টি বা নজর থাকে। এ মুহূর্তে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্ব তাদের ঘনিষ্ঠ দেশ ভারত, আরবসহ রাষ্ট্রসমূহ বেশ মনোযোগের মধ্যে রেখেছে বললে মোটেও অত্যুক্তি করা হবে না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যাসন্ন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করা, দেখা ও পাওয়ার চাইতেও বিরোধী দলগুলোর কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি ভীষণভাবে প্রাধান্য পাচ্ছে। তাতে অবশ্য সবার দৃষ্টিভঙ্গি বা অবস্থানগত তাত্পর্য ও উদ্দেশ্য মোটেও এক নয়। কারো কারো উদ্দেশ্য বর্তমান সরকারের হাত থেকে কোনো প্রকারে ক্ষমতা অন্য কোনো সরকারের হাতে যাওয়াটিই একমাত্র লক্ষ্য, সে রকম পরিস্থিতিতে দেশে ভয়ানক কোনো প্রতিশোধ নেওয়ার আগুন বা হিংস্রতা সৃষ্টি হতে পারে— এমন আশংকাকে একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে নির্বাচনই শুধু বিপন্ন হবে না, দেশের বিদ্যমান গণতান্ত্রিক অর্জনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ এ মুহূর্তে চরম কিছু ইডিওলজিক্যাল শক্তির মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে যার গতিপথ কোনিদকে ছুট দেয় তা আমাদের দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ খুব একটা ধর্তব্যে নেন না। দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাকে তারা প্রায়শই হালকা চোখ দিয়ে দেখেন। তবে সেগুলোর কোনোটি যদি শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত হতে পারতো তা হলে বাংলাদেশে অন্যরকম জটিল পরিস্থিতিই আমাদেরকে এখন অতিক্রম করতে হতো। ফলে বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে বাস্তববোধের চাইতে কল্পনাবিলাসী রাজনীতির ডামাঢোলই বেশি বাজছে। তার ফলে ভবিষ্যত্ নির্বাচন নিয়ে সংঘাত শুরু হলে তার পরিণতি কারো জন্যই সুখকর হবে না। অথচ অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথে আমাদের অর্জনের বাস্তবতাকে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়, সেগুলোকে আরো বেশি ভিত্তি দেওয়ার জরুরি কাজগুলোর ওপর সরকার ও বিরোধী দলের অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কাজ করা উচিত। সে কাজগুলো তেমনভাবে করা হচ্ছে না। তাতে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা, ভিত্তি তৈরি করা কঠিন হয়ে উঠেছে। মনোযোগটা সেদিকে কেউ দিচ্ছে না। ফলে আন্দোলনের বিষয়টি শেষ বিচারে জোরজবর দস্তির দিকেই চলে যেতে পারে। তাতে দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট হতে পারে। মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নষ্ট হতে পারে। বাংলাদেশ একটি দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতময় অঞ্চলে পরিণত হতে পারে। এখানে রাজনীতিতে এখন ধর্মসহ নানা ইস্যু যেভাবে সমাজের তলদেশ থেকে মধ্য অবস্থান পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে বসেছে, নানা প্রচার প্রচারণা ও অপপ্রচার যেভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে উঠেছে, রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে— তাতে দেশে গণতান্ত্রিক ভাবাদর্শের রাজনীতি একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি অবস্থানে পড়েছে। বিএনপি যতই আধুনিক বা নতুন রাজনীতির রূপকল্পের কথা ফলাও করে প্রচার করুক বা ড্যান মজীনাকে শোনাক না কেন জোটগতভাবে ক্ষমতায় গিয়ে বিএনপির অবস্থান কতোটা সবল হবে তা ২০০১-২০০৬ সালের শাসনামল থেকে ধারণা নেওয়া যায়, তবে এর সঙ্গে হেফাজতসহ বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি পশ্চিমা বিশ্ব, ভারতসহ সকল শক্তিকেই ভাবিয়ে তুলেছে, এর পরিণতি কী হবে তা নিয়ে সকলেই শংকিত। পশ্চিমা বিশ্বের এমন আশংকাকে বিএনপি কীভাবে দূর করবে। নিজের অবস্থানে বিএনপি কখন আওয়ামী লীগের সত্যিকার প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের অবস্থান নেবে তা নিয়ে তারা অনেক বছরই অপেক্ষা করেছে। মনে হচ্ছে তাতে তাদের হিসাব নিকাশে গরমিল বেশি হচ্ছে, বিএনপি ক্রমেই দক্ষিণমুখিদের নির্ভরযোগ্য শক্তিতে পরিণত হয়ে উঠেছে। যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শেষ বিচারে হুমকির মুখেই ঠেলে দেবে। এর লক্ষণ স্পষ্ট হতে দেখেই পশ্চিমা বিশ্ব অতিমাত্রায় সতর্ক মন্তব্য করছে, বিএনপিকে সে ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে, আগামী দিনগুলোতে সেটিই দেখার প্রত্যাশা করছে সবাই। লেখক :অধ্যাপক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন