বাংলাদেশে ‘ভেনামি’ চিংড়ি চাষ :খাল কেটে কুমির আনা?

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০১৩, ২১:১০
বাংলাদেশে বাগদা ও গলদা চিংড়ির চাষ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে একটি বাণিজ্যিক একোয়াকালচার পদ্ধতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এটি পোশাক শিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। দুই প্রজাতির চিংড়ির মধ্যে বাগদা চিংড়ির অবদান প্রায় ৭০ শতাংশ এবং এর চাষ পদ্ধতি উপকূলীয় লোনা পানির বিস্তীর্ণ এলাকার ২,২০,০০০ হেক্টর জমিতে বিস্তৃত। বাগদা চিংড়িকে ইংরেজিতে ব্ল্যাক টাইগার শ্রিম্প বলা হয়, যার বৈজ্ঞানিক নাম Penaeus monodon, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় এর দৈর্ঘ্য ৩৩ সেমি. এবং ওজন ১০০-১২০ গ্রাম। ইন্দো-পশ্চিম-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এদের প্রাকৃতিক আবাস। বাংলাদেশসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ইত্যাদি দেশে বাগদা চাষ বহুকাল আগে থেকে প্রচলিত। এদিকে ভেনামি এক প্রকার হোয়াইট-ল্যাগ শ্রিম্প যার বৈজ্ঞানিক নাম Litopenaeus vennamei, পূর্ণাঙ্গ অবস্থায় এর দৈর্ঘ্য ২৩ সেমি. এবং ওজন ৩০-৪০ গ্রামের মতো। প্রাপ্তবয়স্ক ভেনামি গভীর সমুদ্রে অবস্থান করে এবং জুভেনাইল বা শুক অবস্থায় এরা মোহনা অঞ্চলে বিচরণ করে। ভেনামি মেক্সিকোর সোনরা প্রদেশের স্থায়ী জলজ ক্রাস্টাসিয়া গোত্রের প্রাণী, যেখানে সারা বছর তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের বেশি থাকে। গত শতাব্দীর শেষ অবদি পর্যন্ত ভেনামি ফিসারি মেক্সিকান জেলেদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবিকার উত্স ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে একে চাষের আওতায় আনা হয়। ফলে এর বিস্তার অনেক দেশে চিংড়ি মহামারীর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশে চিংড়ি চাষকে অধিক উত্পাদনশীল করার জন্য ভিনদেশি ভেনামি চিংড়ি আমদানি করে চিংড়ি চাষ এলাকা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একে চাষের আওতায় আনার প্রক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইন্টারনেটভিত্তিক সি ফুড তথ্য সম্পর্কিত পত্রিকা ফিস ইনফরমেশন ও সার্ভিসেস (http://fis.com)-এর গত ১৯ জুলাই ২০১৩-এর খবরে দেখা যায়, সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভেনামি চিংড়ি আমদানির প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। এক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থা বাংলাদেশ শ্রিম্প ও ফিস ফাউন্ডেশনের (BSFF) বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সংস্থাটি চিংড়ি আমদানির বিষয়ে সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং এ ব্যাপারে একটি কোম্পানির সাথে চুক্তিও সম্পন্ন করেছে । ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে পরিচালিত সাসটেইনিং ইথিক্যাল একোয়াকালচার ট্রেড প্রোজেক্ট (www.seatglobal.eu) কর্তৃক বাংলাদেশসহ এশিয়ার প্রধান সি ফুড উত্পাদনকারী দেশ যেমন চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম থেকে রফতানিকৃত সি ফুড বাণিজ্য টেকসইকরণ বিষয়ে ইন্টারডিসিপ্লিনারী গবেষণার সুবাদে বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি চাষের প্রতি আগ্রহ সংক্রান্ত বিষয়টি নজরে পড়ে। যার কিছু ভয়াবহ দিক এখানে তুলে ধরা হলো। ভেনামি চিংড়ি আমদানির পর প্রথমেই যে সমস্যাটি দেখা দিবে তা হলো ব্রুড চিংড়ি অনুপ্রবেশের মাধ্যমে আমাদের দেশীয় চিংড়িতে ভাইরাসজনিত রোগের সংক্রমণ। গত কয়েক দশকের ইতিহাস থেকে জানা যায়, বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে ব্রুড চিংড়ি অনুপ্রবেশের কারণে ভাইরাসজনিত রোগ বিশেষ করে ‘হোয়াইট স্পট ডিজিস’ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। নির্দিষ্ট জীবাণুমুক্ত ব্রুড চিংড়ির প্রবেশের মাধ্যমে ভেনামির চাষ সম্ভাবনা পরীক্ষা করে দেখা যেতে পারে। কিন্তু একটু অসতর্কতার কারণে একবার রোগের রাস্তা খুলে গেলে দেশীয় বাগদা চিংড়ির অপার সম্ভাবনা চিরতরে বিনষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক বিধি-বিধান অনুযায়ী কোন জলজ প্রাণী একটি দেশে অনুপ্রবেশের সময় রোগ ছড়াতে পারে এ আশংকায় নির্দিষ্ট বন্দরে প্রাণীকে বিভিন্ন পর্যায়ে ৩ বছর পর্যন্ত কোয়ারেন্টাইন (জীবাণুমুক্তকরণ) ভিত্তিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। জলজ প্রাণী আমদানি করার ক্ষেত্রে আমাদের বন্দরগুলোতে এ ধরনের সুবিধা ও জনবল নেই। ইতিমধ্যেই EMS (Early Mortality Syndrome) নামে ভেনামিতে একটি মহামারী রোগ চীন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে ব্যাপক আকারে দেখা দিয়েছে, যার প্রধান লক্ষণ হলো চাষের প্রথম ৩৩ দিনের মধ্য ভেনামির ব্যাপক মৃত্যু ঘটা। অনেক গবেষণার পরেও এর কোনরকম জীবাণু শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। রোগের অন্যান্য লক্ষণ হলো চিংড়ির দৈহিক বৃদ্ধি কমে যাওয়া, চক্রাকারে সাঁতার কাটা, খোলস খসে পড়া এবং দেহ বিবর্ণ হয়ে যাওয়া। বাংলাদেশে প্রায় দুই লক্ষেরও বেশি ছোট ও মাঝারি আকারের চিংড়ি খামার রয়েছে, যা সাধারণত চাষি পর্যায়ে পারিবারিক সদস্য দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। যদি ভিনদেশি চিংড়ির মাধ্যমে আমাদের প্রচলিত চিংড়ি চাষের উপর কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তাহলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অসংখ্য খামারি ও সংশ্লিষ্ট বৃহত্ জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পতিত হবে। এখানে উল্লেখ্য যে, দেশে চিংড়ি চাষের সাথে প্রায় ৮,৪০,০০০ লোকের কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশে চিংড়ি উত্পাদনশীলতা তুলনামূলকভাবে কম। উত্পাদন বাড়ানোর জন্য আগে অধিক ঘনত্বে চাষের চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু তাতে ভাইরাসজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। কারণ বাগদা চিংড়ি অল্প ঘনত্বে চাষ করতে হয় এবং চাষিরা তাদের সম্পদের বায়ো-ফিজিক্যাল বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে এ ধরনের চাষ প্রক্রিয়ায় অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এরকম সাধারণ প্রচলিত উত্পাদন অবস্থা যেখানে উত্পাদন ২৫০-৩৫০ কেজি/হেক্টর, তা থেকে ভেনামি চাষের মাধ্যমে হেক্টর প্রতি উত্পাদন আরও বাড়াতে চাইলে সার্বিক চিংড়ি চাষ জীব-নিরাপত্তাজনিত সমস্যা, মাত্রাতিরিক্ত উপকরণ সরবরাহ সংক্রান্ত সমস্যা এবং অন্যান্য ঝুঁকির সন্মুখীন হবে, যা বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর মাধ্যমে মোকাবিলা করা সম্ভবপর নয়। উল্লেখিত সমস্যা এবং ঝুঁকিসমূহ শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর মাধ্যমে মোকাবিলা করতে পারলে ভেনামির দরকার নেই, বরং বাগদা চিংড়ি চাষ করেই খামারের উত্পাদনশীলতা অধিক পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব। সামপ্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ভেনামি আমদানি সাময়িকভাবে আর্থিক মুনাফা অর্জনের হাতিয়ার হতে পারে; কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সহজ হবে না। এশিয়ার অন্যান্য দেশ ভেনামি চিংড়ি উত্পাদনের দিকে ঝুঁকে যাওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে বাগদা চিংড়ির সরবরাহ কমে গেছে; কিন্তু বাগদার অপেক্ষাকৃত বড় আকার এবং বিশেষ স্বাদের কারণে বাজারে এর চাহিদা রয়েই গেছে, যেখানে বাংলাদেশের জন্য এ বাজারকে ধরে রাখা একটি বড় সুযোগ। বর্তমানে আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি লোবস্টারের বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে। কারণ বাগদা চিংড়ি আকারে প্রায় লোবস্টারের মতো বড় এবং পশ্চিমা বিশ্বে সামুদ্রিক জলাশয়ে লোবস্টারের পরিমাণ একেবারেই কমে গেছে। এ সমস্ত কারণে বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি চাষ মানে দেশীয় চিংড়ির সোনালী সম্ভাবনাকে হারানো এবং ভেনামির আন্তর্জাতিক বাজারে সবলের সাথে দুর্বলের প্রতিযোগিতা করা। বাংলাদেশ মত্স্য অধিদপ্তর কর্তৃক প্রণীত সরকারি নীতিমালা ও আইন অনুযায়ী বৈদেশিক কোন প্রজাতি বাংলাদেশে আনয়নের ক্ষেত্রে বিশেষ অনুমতি দরকার হয়। যে কোন মত্স্য প্রজাতি আমদানির অনুমতি প্রদানের ক্ষেত্রে যাতে বিষয়টিকে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা হয় সে ধরনের বিধি-বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রক্রিয়াগত অনেক দুর্বলতা যেমন আধুনিক কোয়ারেন্টাইন পদ্ধতি বন্দর বা অন্যান্য এলাকায় একেবারে নাই বললেই চলে। অনেকে গবেষণার জন্য বাংলাদেশে ভেনামি আনার আগ্রহ দেখাতে পারে। এতেও কিন্তু গবেষণাগারের স্বল্প পরিসর থেকে বাহিত ভাইরাসজনিত রোগ আমাদের দেশীয় চিংড়িসহ অন্যান্য মাছে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বাংলাদেশে ভেনামি আনার বিষয়টিকে সাময়িক আর্থিক লাভের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, বরং আমাদের দেশের ২,৫০,০০০ চিংড়ি চাষির ভবিষ্যত্ দেখতে হবে। সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে বিষয়টি সম্পর্কে অবশ্যই ভ্যালু-চেইনের সাথে সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের স্টেকহোল্ডার যেমন চিংড়ি হ্যাচারি মালিক, চিংড়ি চাষি, উপকরণ সরবরাহকারী, মধ্যস্বত্বভোগী, প্রক্রিয়াজাতকারী, পরিবেশবাদী সংস্থা, আইনজীবী সংস্থা, সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গবেষণা ও উন্নয়ন কর্মীদের সাথে মুক্ত সংলাপ হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশ শ্রিম্প ও ফিস ফাউন্ডেশন ভেনামি আনার প্রক্রিয়ায় এ ধরনের কোন সংলাপ বৃহত্তর পরিসরে করেছে কিনা আমাদের জানা নাই। ভেনামি আনার ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিকসমূহ কি কি, কারা লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, চাষি কতটুকু লাভবান হবে, বাংলাদেশি চাষিরা কি থাইল্যান্ডের চাষিদের সাথে আন্তর্জাতিক সি ফুড বাজারে প্রতিযোগিতা করতে পারবে, আমাদের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর কি প্রভাব পড়বে, ইত্যাদি আরও বিশদভাবে সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে এ ধরনের সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে এবং সেখানে অবশ্যই চিংড়ি চাষের সাথে যুক্ত অর্থনৈতিক, পারিবেশিক ও সামাজিক বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তাই বাংলাদেশে ভেনামি চিংড়ি আমদানি ও এদের চাষ সম্প্রসারিত করার পূর্বে এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেয়া প্রয়োজন। লেখক :প্রফেসর, একোয়াকালচার বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। Email: [email protected]