মঙ্গল গ্রহে মানুষ বসতি গড়িতে চাহিতেছে, তাহার তোড়জোড় চলিতেছে বেশ কয়েক বত্সর ধরিয়া। পৃথিবীর নিকট-প্রতিবেশী এই লোহিত গ্রহে বসতি গড়িবার আয়োজন করিয়াছে নেদারল্যান্ডসের প্রতিষ্ঠান মার্স ওয়ান। বিস্ময়ের কথা হইল আবেদনের আহ্বান জানাইবার মাত্র চার মাসের ভিতরে প্রায় এক লাখ মানুষ আবেদন করিয়াছে মার্স ওয়ান বরাবর। বিস্ময় এই কারণে যে, মঙ্গলে যাহারা যাইবেন তাহারা আর ফিরিয়া আসিতে পারিবেন না। উহা একতরফা অগস্ত্য যাত্রা। বলা যায় আমৃত্যুই তাহাদের লাল গ্রহে দিনাতিপাত করিতে হইবে। মার্স ওয়ানের পক্ষ হইতে নির্বাচিত চার ব্যক্তিকে শুধু মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইবে আর তাহাদের জীবনধারণের জন্য সরবরাহ করা হইবে প্রয়োজনীয় উপকরণ। পরবর্তীকালে মঙ্গলগ্রহের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়া ওই অভিযাত্রীদের নিজেদেরই চেষ্টা করিতে হইবে মঙ্গলে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য।
মানুষের এই দুঃসাহসিক অভিযান ও অভিলক্ষ্যের মানসিকতাই মানব সভ্যতা সৃষ্টি করিয়াছে। মানুষ তাহার সাধ্যের সীমাকে কখনো ‘আবদ্ধ’রূপে স্থান দেয় নাই। তাহা দৃশ্যত আবদ্ধ হইলেও মানুষ নাছোড়বান্দার মতো উপায় খুঁজিয়াছে নিরন্তর। আফ্রিকা হইতে সারা পৃথিবীতে ছড়াইয়া পড়িবার কারণও নূতন ও অজানার প্রতি তীব্র আকর্ষণ। তাহাতে প্রাণসংশয়ের প্রবল আশঙ্কা থাকিলেও মানুষ অদম্য কৌতূহলে তরী ভাসাইয়াছে মহাসমুদ্রে, আবিষ্কার করিয়াছে নূতন নূতন ভূখণ্ড। যখন বিজ্ঞান হাঁটিতেও শেখে নাই, তখনও মানুষ আপাত সমতল পৃথিবীকে নিজের ভিতরের গভীর চিন্তাশীলতার দ্বারা গোলাকার হিসাবে মনে সংশয় সৃষ্টি করিয়াছে। খুঁজিয়াছে তাহার সপক্ষের প্রমাণ, দূর আকাশের তারা-নক্ষত্রকে বৃত্তাকার দেখিয়া এই সংশয় আরো দৃঢ় হইয়াছে। কলম্বাস, ভাস্কো দা গামা, আমেরিগোসহ অসংখ্য অভিযাত্রী অথৈ সমুদ্রে তরী ভাসাইয়াছেন নূতন ও অজানার স্বাদ পাইতে। মানুষের এই অদম্য মানসিকতাই তাহাকে আকাশে উড়াইতে পারিয়াছে, সশরীরে লইয়া গিয়াছে রূপকথার চাঁদের দেশে। সেই অদম্য দুঃসাহসের অসংখ্য ধারাবাহিকতারই একটি এই মঙ্গল অভিযান।
মঙ্গলের এই মিশন সফল করিতে ২০১৪ সালে একটি যোগাযোগ উপগ্রহ পাঠানো হইবে মঙ্গলের কক্ষপথে। ২০১৮ সালে রোবট পাঠাইয়া নির্ধারণ করা হইবে মনুষ্যবসতির উপযুক্ত স্থান। ইহার ভিতরে খাবার, রসদ আর জীবন রক্ষাকারী সরঞ্জাম লইয়া উড়িয়া যাইবে একাধিক নভোযান। মঙ্গলের বুকে প্রথম বসতি স্থাপনকারীদের জন্য শক্তির জোগান দিতে সৌর প্যানেল বসানো এবং গ্রহের পরিবেশকে কাজে লাগাইয়া পানি ও অক্সিজেন তৈরির আয়োজনও সারিয়া ফেলা হইবে। সব ঠিক থাকিলে লাখ লাখ আবেদনকারীদের ভিতর হইতে নির্বাচিত চারজন নভোচারী মঙ্গলের উদ্দেশে যাত্রা করিবেন ২০২২ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর। প্রায় একমাস পর তাহারা পা রাখিবেন মঙ্গলের মাটিতে।
মঙ্গলে রহিয়াছে অতি ক্ষীণ বায়ুমণ্ডল। পৃথিবীর মতো তাহার চৌকম্বীয় ক্ষেত্র নাই। এই দুইটি অতি গুরুত্বপূর্ণ, কেননা, জীবনধারণের জন্য বায়ুমণ্ডল এবং মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি ও সূর্যের তেজস্ক্রিয় বিচ্ছুরণ হইতে বাঁচিতে চৌকম্বীয় ক্ষেত্র অপরিহার্য। মঙ্গলের ক্ষীণ বায়ুমণ্ডলের কারণে সেখানকার বায়ুচাপ এত কম যে, তাহাতে স্বাভাবিকভাবে পানি তরল অবস্থায় থাকিতে পারে না। অথচ মানুষের জীবনধারণের জন্য পানির কঠিন, তরল ও বায়বীয়— এই তিন অবস্থা একসঙ্গে বিরাজ করিবার মতো পরিবেশ অতি গুরুত্বপূর্ণ। তাহা ছাড়া মঙ্গলের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি পৃথিবীর তুলনায় মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ। এমন পরিবেশে কোনো বিশেষ উপায়ে মানুষ যদি-বা কোনোভাবে কয়েক প্রজন্ম টিকিয়া যায়, তবে দেখা দেবে বিবিধ জটিলতা। তাহার ভিতরে কিছু ঘটনাও ঘটিবে বেশ মজার। যেমন মানুষের উচ্চতা হইয়া যাইবে তাল গাছের কাছাকাছি। প্রকৃত বিপদ আরও অসংখ্য। এই অভিযানে অভিযাত্রীরা এইরূপ তেজস্ক্রিতার শিকার হইতে পারে যাহাতে তাহাদের প্রতি চার জনের এক জন আক্রান্ত হইতে পারে দুরারোগ্য ক্যান্সারে। আরও অসংখ্য প্রতিকূলতার কথা বলা যায়, যাহা মানুষের মতো স্পর্শকাতর প্রাণীর পক্ষে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণই। তাহার পরও মানুষ আরও উন্নততর প্রযুক্তি আবিষ্কার করিতে সচেষ্ট এবং এইসকল প্রতিকূলতা একদিন দূর করিতে পারিবে নিশ্চয়ই। এই অভিযান সফল হইলে তাহা হইবে মানব জাতির প্রথম বহির্গ্রহের উপনিবেশ। সৌরজগতের ভিতরকার কোনো একটি গ্রহে পা রাখিবার এই অভিযান সফল হইলে মানুষ অদূর ভবিষ্যতে পা বাড়াইবে সৌরজগতের বাহিরের কোনো সবুজ গ্রহে, যাহা হয়তো এখনো অনাবিষ্কৃত। ইহাই মানুষের বুদ্ধিপ্রতিভার সৌন্দর্য। মানুষ চিরকাল সেই সৌন্দর্যেরই পূজারি।
