ব্রিটিশ শাসনামলে বিভিন্ন প্রকার সামাজিক কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে ভারতবর্ষের মানুষকে যে সকল মানুষ আলোর পথে চলতে সাহায্য করেছেন তাঁদের মধ্যে উইলিয়াম কেরী ছিলেন অন্যতম একজন। ১৭৬১ সালের ১৭ আগস্ট কেরী ইংল্যান্ডের নর্দাম্পটনশায়ারের পলার্সপুরী নামক এক গ্রামের চার্চের পাদ্রী এডমান্ড ও তাঁর স্ত্রী এলিজাবেথ কেরীর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৭৯৩-এর ১৩ জুন স্বদেশ ত্যাগ করে তিনি সপরিবারে ঐ বত্সর ১১ নভেম্বর কলকাতায় পৌঁছান। কেরীর একটা বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক। তিনি যখন এদেশে আসেন তখন শিল্প বিপ্লবের ঢেউ ইউরোপের সর্বত্র নাড়া দেয়। ইউরোপের নাবিকেরা ইতিমধ্যে পেয়েছিল নানান দেশের সন্ধান। ফ্রান্সে সম্রাট ও জমিদারদের শোষণের শৃঙ্খল ভেঙ্গে সাধারণ মানুষ সাম্য, মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের শ্লোগানে হয়েছিল মুখর। আমেরিকাও হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত। ধর্মীয় ক্ষেত্রেও ইউরোপের চার্চে এসেছিল এক নতুন জাগরণ, মধ্যযুগের অনেক গোঁড়ামি ও কুসংস্কার থেকে সংস্কারকগণ করেছিলেন চার্চকে মুক্ত। ধর্মতত্ত্ব প্রচারের সংগে সংগে মানবপ্রেমিক কেরী তাঁর বৈচিত্র্যময় কর্মতত্পরতা দিয়ে দরিদ্র মানুষের উন্নতির জন্য সমাজ সংস্কার, শিক্ষা, কৃষিকর্ম, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, ইত্যাদি ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখে গেছেন। ১৭৬৫ সালে ভারতবর্ষে প্রবর্তিত দ্বৈত শাসনের কুফলে ১৭৭০ বাংলায় ঘটে এক দুর্ভিক্ষ। তার আঘাত মানুষ ভুলতে না ভুলতেই লর্ড কর্নওয়ালিস জারি করেছিলেন কুখ্যাত “চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত”। যার ফলে কলকাতার শ্বেতাঙ্গ বণিক ও দেশীয় জমিদাররা সাধারণ মানুষকে শোষণ করার সুযোগ গ্রহণ করতে থাকে।
একজন মিশনারীরূপে খ্রিস্ট ধর্মের শিক্ষা প্রচার করতে করতে বাংলার সাধারণ দরিদ্র ও শোষিত মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য অনেক কাজ তিনি সাধন করেছেন। তথাকথিত নিম্নবর্ণের দুর্বল মানুষের উপরে তথাকথিত উচ্চবর্ণের মানুষের অবহেলা ও অত্যাচারের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনভারে তারা যেন পরিণত হয়েছিল ক্রীতদাসে। ১৭৯২ সালে প্রচলিত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফলে তাদের উপরে জমিদারদের অত্যাচার যায় বেড়ে। ঐসব দরিদ্র চাষিকে আর্থিক সাহায্যের লক্ষ্যে ১৮২০ সালে কেরী শ্রীরামপুরে প্রতিষ্ঠা করেন “সঞ্চয় ব্যাংক” নামে একটি ব্যাংক। মহাজনী ঋণের বোঝার হাত থেকে বাঁচার একটা উপায় সেদিন পায় অনেক দরিদ্র কৃষক। আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা সমন্বিত ব্যাংক যদিও ভারতবর্ষে তার অনেক আগে ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল, তথাপি সমাজে মহাজনী ঋণের অভিশাপ তার দ্বারা খর্ব হয়নি। একদিকে ধর্ম ও সামাজিকতার অপব্যাখ্যাজনিত অনেক কুসংস্কার, অন্যদিকে সেই অর্থনৈতিক শোষণ। সবকিছু মিলে সাধারণ মানুষের জীবন হয়ে উঠে বোঝাস্বরূপ। সতীদাহ প্রথা, বানফোঁড়া, গঙ্গায় শিশু বিসর্জন, রথের চাকার নিচে ফেলে শিশু হত্যা, চরক পূজা, অন্তর্জলি, অস্পৃশ্যতা, কন্যাশিশু হত্যা, শিশু বিবাহ, কুষ্ঠরোগীকে পুড়িয়ে মারার মতো অনেক কুসংস্কার জগদ্দলের মতো সমাজের উপর চেপে বসে।
এদেশের ভাষা, সংস্কৃতি মাটি ও মানুষকে তিনি এতই ভাল বেসেছিলেন যে, তিনি এদেশের বিষয়ে লিখতে গিয়ে বলেছিলেন— “I see one of the finest countries in the world....” বাংলা ভাষার বিষয়ে সেই যুগেই তাঁর কথা ছিল আরো চমত্কার, “One of the most expressive and elegant languages of the East ”.
১৮১৬ সালেই তাদের স্থাপিত ১০০ অবৈতনিক ও পাঠশালায় দশ হাজার ছাত্র লেখাপড়া শিখত। কেরীই প্রথম ভারতে সাধারণ পর্যায়ে স্ত্রী শিক্ষার প্রচলনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কেরীর সহকর্মীরা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ উত্তর ও উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক স্থানেই প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বোর্ডিং স্কুল স্থাপন করেছিলেন এবং ঐসব স্কুলে শিক্ষার মাধ্যম ছিল মাতৃভাষা। ধর্মের নামে শতরকমের গোঁড়ামি, দুঃশাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সচেতন করার লক্ষ্যে সেদিন কেরী অনুভব করেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের। তারই ফলশ্রুতিতে কেরী ও তাঁর সহকর্মীরা ১৮১৮-এর ১৫ আগস্ক কেরী স্থাপন করেন শ্রীরাম কলেজ। আজও যা সমগ্র এশিয়ায় শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। ঐ কলেজের ঘোষণাপত্রে কেরী বলেন—“এই কলেজের উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য—সকল ছাত্র-ছাত্রীর মেধা ও মননের সীমাকে যতদূর সম্ভব সম্প্রসারণ করা এবং সেই লক্ষ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের এমনভাবে শিক্ষিত করে তোলা, যাতে ভারতবর্ষের কল্যাণ হয়।” ডেনমার্কের রাজা ষষ্ঠ ফ্রেডারিক কলেজের প্রথম গভর্নর ও ইংল্যান্ডের ভাইসরয় লর্ড হেস্টিংস হন প্রথম পৃষ্ঠপোষক। ভারতবর্ষে শ্রীরামপুর কলেজই সর্বপ্রথম রাজকীয় সনদপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্গীয় রেনেসাঁর ক্ষেত্রে এই বিদ্যাপীঠের ছিল অনেক বড় প্রভাব । তদানীন্তন বাংলা তথা ভারতবর্ষের অগণিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষের দুঃখ ও ব্যথার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত উইলিয়াম কেরীর মহাজীবন দুর্বল মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য আমাদের প্রেরণা দিক।
লেখক :কলেজ অফ খ্রিস্টিয়ান থিওলজি বাংলাদেশ ও অধ্যক্ষ
