ইসরাইল-ফিলিস্তিন

আশা-নিরাশার শান্তি আলোচনা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:২৭
গত কয়েক দশকে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনা চলেছে আবার বার বার বন্ধ হয়েছে। তবে ২০১০ সালে ইসরাইল অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখন্ডে নতুন করে বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলে শান্তি আলোচনা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। তিন বছর পর এই অচলাবস্থার অবসান ঘটল কেরির কূটনৈতিক তত্পরতায়। তিনি গত ১৯ জুলাই আম্মান সফরকালে ঘোষণা দেন, ইসরাইল ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ ওয়াশিংটনে সরাসরি আলোচনায় বসছে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনকে আলোচনার টেবিলে বসানোর ব্যাপারে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির আন্তরিকতা দেখে অনেক বিশ্লেষক সন্তোষ্টি প্রকাশ করলেও বেশিরভাগ মানুষের ধারণা তারা শেষ পর্যন্ত সমঝোতায় পৌঁছতে পারবে না। এই নৈরাশ্যবাদী ধারণার কারণ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রীর বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং রাজনৈতিক মতাদর্শ, ১৯৮০ সাল থেকে আজ পর্যন্ত যার কোন পরিবর্তন হয়নি। নেতানিয়াহু বিশ্বাস করেন, পাশ্চাত্য ও সুসলিম সভ্যতার যে সংঘর্ষ তার কেন্দ্রবিন্দু ইসরাইল এবং আরব বিশ্ব এখনও ইসরাইল রাষ্ট্রটিকে মেনে নেয়নি। ফিলিস্তিন ইসরাইল সংঘাতের ব্যাপারে যারা কথা বলেন তাদের বেশিরভাগেরই এ বিষয়ে গভীর ধারণা নেই। নেতানিয়াহু এও বিশ্বাস করেন ১৯৬৭ সালে অধিকৃত ভূখন্ড ছেড়ে দিলেও সংঘাতের অবসান হবে না। ইসরাইলের চারপাশে এমন একটি সভ্যতা ঘিরে আছে যা রাষ্ট্রটিকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলতে চায়। নেতানিয়াহুর মন ভয় ও সন্দেহ দিয়ে আচ্ছন্ন। তবে তার ভয় শংকা উড়িয়ে দেয়া যায় না। এগুলোর কিছু ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। সিরিয়ায় গণহত্যার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব বিদ্রোহীদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে। কিন্তু বিদ্রোহীদের একটি বড় অংশ জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত। যদি সিরিয়া-ইসরাইল সীমান্তের এলাকাগুলো তারা দখলে নেয় তবে ইসরাইলে জঙ্গি হামলার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। এদিকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম উপকূল যদি হামাসের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় তবে গাজা ও লেবাননের মত সে জায়গাটিও রকেট হামলার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার হতে পারে। সেখান থেকে তেলআবিবের জনবসতি মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে। যদি এটাই হয়ে থাকে নেতানিয়াহুর দৃষ্টিভঙ্গি তবে আমরা কি আশা করতে পারি। কয়েক পর্বের আলোচনা শেষে ফিলিস্তিন আলোচনা বন্ধ করে দেবে কারণ ইসরাইল ফিলিস্তিন ভূখন্ডে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখবে। তাহলে এসব কিছুই কি শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে সন্তুষ্ট করার জন্য। কিছু কারণে ইসরাইল উপলব্ধি করছে যে পশ্চিম উপকূলে অব্যাহত অধিগ্রহণ দীর্ঘ মেয়াদে তার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। সম্প্রতি ইউরোপীয় ইউনিয়ন পশ্চিম উপকূলের সমস্ত ইসরাইলি প্রতিষ্ঠানের সাথে কোন প্রকার সংশ্লিষ্টতা না রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এটা ইসরাইলের ওপর বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সংকেত দিচ্ছে। ইসরাইলের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অর্থদাতা ইইউ। সম্প্রতি ইসরাইলের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর সাথে বৈঠক করেছেন নেতানিয়াহু। তারা অর্থনৈতিক ক্ষতির আশংকা ব্যক্ত করেছেন। চাপ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকেও। নেতানিয়াহু সব সময় চিন্তা করে এসেছেন যাই ঘটুক যুক্তরাষ্ট্র সবসময় ইসরাইলের পাশে থাকবে। তার এও বিশ্বাস ছিল তিনি যেকোন সময় যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করতে পারেন। কিন্তু তিনি ইতিমধ্যে হোঁচট খেয়েছেন। তার রাজনৈতিক গুরু আর্থার ফিনকেনস্টাইন তাকে আশ্বস্ত করেছিলেন ২০১২ সালের নির্বাচনে মিট রমনি ওবামাকে পরাজিত করবে কিন্তু তার ভবিষ্যদ্বানী সম্পূর্ণ ভুল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো বার বার সতর্ক করেছে যে পশ্চিম উপকূলে ইহুদি বসতি স্থাপন মার্কিন স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর কারণ এই ইস্যুটি মূলত মুসলিম বিশ্বকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ করছে। এটি মুসলমানদের কষ্টের একটি প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাই ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রতিষ্ঠা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাহলে আমরা কি আশা করতে পারি ইসরাইল ও ফিলিস্তিন একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে? দু’টি পৃথক রাষ্ট্র সৃষ্টি উভয়ের জন্যই মঙ্গলজনক। কিন্তু নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির বেশিরভাগ সিনেট সদস্য স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের বিপক্ষে। এছাড়া অধিকৃত ভূখন্ডে যারা বসতি স্থাপন করেছে তাদের পুনর্বাসন করা অত্যন্ত জটিল একটি ব্যাপার।