ইরাকে সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে গেছে। বিশেষ করে গতমাসে এ সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী শুধু জুলাই মাসেই নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৭ জন। আহত হয় ২ হাজারেরও বেশি। সে কারণে ওই মাসকে মারাত্মক রক্তক্ষয়ী মাস বলে বিবেচনা করা হয়। আর একই ধারাবাহিকতা বর্তমানেও বজায় রয়েছে। কেননা প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও আত্মঘাতী বোমা হামলা, রাস্তার পাশে পেতে রাখা বোমার বিস্ফোরণ, কিংবা জাতিগত সংঘাতে কেউ না কেউ মারা যাচ্ছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন জাগে কেন এতো মৃত্যু, কেন এতো সারি সারি লাশ? কাদের ইন্ধনে কিংবা কাদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এসব করা হচ্ছে? এসবের নেপথ্য শক্তি কারা?
সম্প্রতি বিবিসিতে ইরাকের ভয়াবহ সহিংসতার পিছনের শক্তি কারা- এ সংক্রান্ত এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের দিকে ইঙ্গিত করে উঠে এসেছে আল-কায়েদার প্রসঙ্গ। সংগঠনটির প্রধান ওসামা বিন লাদেনের পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে মার্কিন বাহিনীর ঝটিকা হামলায় মারা গেলেও বলা হচ্ছে তাদের তত্পরতা বন্ধ হয়ে যায়নি। বরং তারা বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন কায়দায় ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জানান দিচ্ছে। একরকম বলা যেতে পারে তারা আবার সুসংগঠিত হয়ে উঠছে।
বিষয়টি আরো পরিষ্কার হয়ে উঠবে যদি আমরা সামপ্রতিক সময়ে ইরাকে দুটি কারাগার ভেঙ্গে বন্দী পালানোর ঘটনাটির দিকে দৃষ্টিপাত করি। সে সময়ে বাগদাদের উত্তরে তাজি ও পশ্চিমে আবু গারিব কারাগারে একদল বন্দুকধারী অতর্কিত রকেট চালিত গ্রেনেড ও মর্টার হামলা চালিয়ে কয়েকশ’ বন্দীকে মুক্ত করে নিয়ে পালিয়ে যায়। খবরে প্রকাশ এসব বন্দীর অধিকাংশই আল-কায়েদার কুখ্যাত নেতা ও দাগী আসামি। রয়েছে যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিও। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দেশটির এক নিরাপত্তা কর্মকর্তা তখন বলেছিলেন, হামলাকারীরা যে জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদার সদস্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। তাদের মূল টার্গেট ছিল দোষী সাব্যস্ত আল-কায়েদা সদস্যদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়া এবং সে লক্ষ্যে তারা সফলই হয়েছে।
ইরাকের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তর আফ্রিকা ও অন্যান্য আরব দেশ থেকে বিদেশি জঙ্গিরা সিরিয়া সীমান্ত অতিক্রম করে ইরাকে ঢুকে পড়ছে। তাদের বেশিরভাগ হামলার ধরনই হচ্ছে আত্মঘাতী। কখনো শরীরে বোমা বহন, কখনো গাড়ি বোমার হামলা কিংবা কখনো অন্য কোন উপায়ে তারা নিরীহ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা করছে। সিরিয়াতে আল-কায়েদা ইন ইরাক (একিউআই) নামে জঙ্গি গোষ্ঠী তত্পর। তারা সেখানে বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে তাদের স্বার্থ সিদ্ধি করছে। এ সংগঠনের প্রধানের নাম (হতে পারে ছদ্মনাম) আবু বকর আল বাগদাদী বা আবু দুয়া। অভিযোগ রয়েছে এখান থেকে দলে দলে জঙ্গি ইরাকে প্রবেশ করছে। শুধু ইরাকে কেন এই জঙ্গি গোষ্ঠী সারাবিশ্বে তাদের শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে নানাভাবে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে।
দেশটিতে অস্থিরতা সৃষ্টিতে রাজনৈতিক কারণও কম দায়ী নয়। আর এর ফায়দা লুটছে এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী। তারা নিজেদের স্বার্থের কারণে ছড়িয়ে দিচ্ছে জাতিগত সংঘাতের বিষবাষ্প। চলছে সেখানে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব। সুন্নীদের কিছু দল সেখানে আলাদা বসতভূমির জন্য আন্দোলন করছে। অনেকে তাদেরকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এতে করে পবিত্র ভূমি ইরাক ক্রমেই পরিণত হয়ে উঠছে এক সন্ত্রাসের জনপদে।
ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকি এসব ঘটনার পর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তার দেশকে সিরিয়ার মতো দুরবস্থায় ফেলার চক্রান্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, দুষ্কৃতকারীরা আবার ইরাকে সহিংসতা ফিরিয়ে এনেছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে তা শুধু এ ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা ছড়িয়ে পড়বে সীমানা পেরিয়ে অন্য ভূখণ্ডেও। তিনি এ সহিংসতার পেছনে অন্যের অর্থ ও পরিকল্পনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। তবে এর সঙ্গে কারা জড়িত সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে তিনি কিছু বলেননি।
প্রধানমন্ত্রী উগ্র আল-কায়েদা ও সাবেক শাসক সাদ্দামের অনুগত সন্ত্রাসীদেরকে ইরাকের প্রধান শত্রু হিসাবে অভিহিত করে বলেন, প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে যে সংকট চলছে ইরাকে তার প্রভাব পড়েছে। তিনি ইরাকের বর্তমান নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির জন্য প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের ষড়যন্ত্র ও ইন্ধনের অভিযোগ তুলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি সৌদি আরবের প্রতি ইঙ্গিত করেন। কারণ এ দেশটি গত কয়েক বছর ধরে আল-কায়েদা গোষ্ঠী ও নিষিদ্ধ ঘোষিত সাবেক বাথিষ্ট সন্ত্রাসীদের সহায়তায় ইরাকে হস্তক্ষেপ করছে। তিনি তুরস্কের দিকেও একই অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলেন, তারা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ইরাকের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা বিস্তারে ভূমিকা রাখছে। এক্ষেত্রে সরকার বিরোধী বিভিন্ন গ্রুপকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাক শুধু সাম্প্রদায়িক ও গোত্রীয় সংকটে পড়েনি, একই সঙ্গে দেশটি ভেতরে ও বাইরের বিভিন্ন মহলের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার। এসব ষড়যন্ত্রের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাথিষ্ট, আল-কায়েদাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং আমেরিকা ও কয়েকটি আরব দেশ জড়িত রয়েছে। ইরাকে গৃহযুদ্ধ বাধানো ও গোত্রীয় গোলযোগ সৃষ্টি করাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য যাতে শিয়া, সুন্নি ও কুর্দি জাতিগোষ্ঠীর ভিত্তিতে ইরাককে খণ্ড-বিখণ্ড করা যায়। ইরাক বিরোধী ষড়যন্ত্রে আইয়াদ আলাভির নেতৃত্বে দেশটির আল ইরাকিয়া জোটেরও বিরাট ভূমিকা রয়েছে। এই জোট ইরাকের বিভিন্ন এলাকায় সংকট করে সুন্নি অধ্যুষিত এলাকার জনগণকে বিভ্রান্ত করে তাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। এভাবে তারা ইরাকে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।
