জিব্রাল্টার ইস্যু

ব্রিটেন-স্পেন সম্পর্কে টানাপড়েন

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২০:২৯
কাছের চেয়ে দূর ভাল। প্রতিবেশীর কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করব; কিন্তু আনুগত্য প্রকাশ করব অন্যের প্রতি— এমন নীতিই হয়ত গ্রহণ করেছে জিব্রাল্টারিয়ানরা। আর এ জিনিসটিই সহ্য হয় না স্পেনের। কারণে-অকারণে ক্যাঁচাল বাধিয়ে দেয় তারা। এ নিয়ে প্রায়ই মন-কষাকষি চলে ব্রিটেন ও স্পেনের। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পর্ব শেষ হয়ে পরিস্থিতি কিছুদিন ঠাণ্ডা থাকে, তারপর আবার শুরু হয়। এমন খেলা চলছে তিনশ’ বছর ধরে। জল ঘোলা হওয়ার সর্বশেষ কারণ হচ্ছে, জিব্রাল্টার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। জিব্রাল্টার কৃত্রিম শৈলশ্রেণী তৈরি করাতেই এমন ব্যবস্থা। যদিও তারা বলছে ভিন্ন কথা— মানি লন্ডারিং এবং তামাক ও অন্যান্য জিনিসের চোরাচালান বেড়ে যাওয়াতে বাধ্য হয়ে এমন উদ্যোগ। কিন্তু কারণ যাই হোক, সীমান্তে কঠোরতাকে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না ব্রিটেন। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, স্পেনের এমন আচরণের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তারা। জিব্রাল্টার যুক্তরাজ্যের অধীনস্থ এলাকা, যেটি স্পেনের দক্ষিণে এবং আটলান্টিক মহাসাগর থেকে ভূমধ্যসাগরের প্রবেশপথে অবস্থিত। জিব্রাল্টার নামটি আরবী নাম “জাবাল আল তারিক” (তারিকের পাথর/শিলা/পাহাড়)-এর স্প্যানিশ অপভ্রষ্ট রূপ। ৭১১ সালে উমাইয়াহ খলিফাদের বার্বার গোত্রীয় সেনানেতা তারিক ইবনে জিয়াদ স্পেন বিজয়ের উদ্দেশে উত্তর আফ্রিকা থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী পার হয়ে এখানে প্রথম পদার্পণ করেন। স্প্যানিশ থেকে ইউরোপের অন্যান্য ভাষাতে এবং সেই সূত্রে বিশ্বের অন্য সব ভাষায় “জিব্রাল্টার” শব্দটি এসেছে। এমনকি আধুনিক আরবিতেও এটিকে জিব্রাল্টারই বলা হয়। সীমান্ত অতিক্রম করে কেউ স্পেন যেতে চাইলে তাকে সীমান্ত রক্ষীবাহিনীর কঠিন তল্লাশির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর তার জন্য পর্যটক ও স্থানীয় লোকজনকে পাঁচ-ছয় ঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জানিয়ে দিয়েছেন, এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর একে অন্যের প্রতি আচরণের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা এ অবস্থা নিরসনের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের দ্বারস্থ হবেন। স্পেন ব্রিটেনকে আরো ক্ষেপিয়ে দিয়েছে এই বলে যে, জিব্রাল্টারিয়ানদের সীমান্ত অতিক্রম নিয়ন্ত্রণ ও বিমান নিষেধাজ্ঞার চিন্তা-ভাবনা করছে তারা।। সেজন্য উচ্চ করারোপ করা হবে এবং তা হতে পারে গাড়িপিছু ৫০ ইউরো। উপরন্তু স্পেনের হোসে গার্সিয়া মার্গাল্লো ঘোষণা দিয়েছেন, জিব্রাল্টারকে ফিরে পেতে তারা আন্তর্জাতিক ফোরামে বিষয়টি উত্থাপন করবেন। এ ব্যাপারে স্পেন ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে ব্রিটেনের সঙ্গে বিরোধ থাকা আর্জেন্টিনার সঙ্গে জোট বাঁধছে। ধারণা করা হচ্ছে, আর্জেন্টিনা বর্তমানে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হওয়ায় বাড়তি সুবিধা পাওয়া যাবে। তবে মুখে স্বীকার করুক আর নাই করুক, বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটেন-স্পেন বর্তমান শীতল সম্পর্কের মূল হেতু হচ্ছে ওই কৃত্রিম শৈলশ্রেণী। এতে করে স্পেনের মাছ ধরার নৌকাগুলোর যাত্রাপথে বাধার সৃষ্টি হবে। কিন্তু জিব্রাল্টার বলছে, শৈলশ্রেণীটি স্বাভাবিক, ওখানে কোন কংক্রিট ফেলা হচ্ছে না। তাদের মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছেন, অহেতুক স্পেন জিব্রাল্টারের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার মত আচরণ করছে। সমুদ্রে মাছ ধরা নিয়েও প্রায়ই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এর কারণ হচ্ছে, জিব্রাল্টারের সমুদ্রসীমা ৩ নটিক্যাল মাইল না-কি ১২ নটিক্যাল, এ বিষয়টি পরিষ্কার নয়। ব্রিটেনের ওভারসীস (সমুদ্র ছাড়িয়ে) রাজ্যাংশ জিব্রাল্টার। এর নামানুসারেই জিব্রাল্টার প্রণালী। এটিই তাদের সবচে’ ক্ষুদ্র উপনিবেশ। আয়তন মাত্র ৬.৮ কিলোমিটার। লোকসংখ্যা ৩০ হাজার। স্পেনের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে ১.২ কিলোমিটার। ধারণা করা হয়, প্রায় ৫০ হাজার বছর আগে নিয়ানডারথাল মানবরা এখানে প্রথম বসত গড়েছিল। জিব্রাল্টার নিয়ে দ্বন্দ্বের সূচনা অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে। ১৭০৪ সলে ব্রিটিশ ও ডাচ বাহিনী এ অঞ্চলটি দখল করে নিয়েছিল। ১৭১৩ সালে উটরিখ্ট চুক্তির ১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে স্পেনের রাজা এটি ব্রিটেনের কাছে হস্তান্তর করেছিল। জিব্রাল্টার বর্তমানে স্ব-শাসিত। তবে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট বিভাগ ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে। এর পাশ দিয়ে প্রায়ই ব্রিটেনের যুদ্ধজাহাজ চক্কর দেয়। স্পেনের কাছে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের প্রশ্নে ১৯৬৭ সালের সেপ্টেম্বর ও ২০০২ সালের নভেম্বরে গণভোটের আয়োজন করা হয়েছিল জিব্রাল্টারে। কিন্তু দুবারই জিব্রাল্টারিয়ানরা তা প্রত্যাখ্যান করে। তারা যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। ১৯৮১ সালে এখানকার লোকজনকে ব্রিটিশ নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। অঞ্চলটিকে স্পেনের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়ার প্রশ্নে তাদের নীতি হল— স্থানীয় লোকজন চাইলে মিশতে পারে আর না চাইলে কখনোই নয়। কিন্তু স্পেন তাদের হাতের নাগালের এ অঞ্চলটিকে ফের মুঠোবন্দী করতে চায় যে কোনো উপায়ে। ১৭০৩ সালে জিব্রাল্টার দখল হওয়ার পর স্থানীয়দের মাত্র পঞ্চাশজন সেখানে থেকে গিয়েছিল। অবস্থানগত কারণে জিব্রাল্টারের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। এখান থেকে আটলান্টিক থেকে ভূমধ্যসাগরের দিকে যাওয়া জাহাজের গতিবিধির উপর নজর রাখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জিব্রাল্টার থেকেই ভূমধ্যসাগরের জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতো তারা। সেজন্যই জিব্রাল্টারিয়ানদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে অঞ্চলটিকে হাতছাড়া করতে চায় না তারা। এখানকার লোকজন নিয়মিতভাবে স্পেনে যাতায়াত করলেও স্প্যানিয়ার্ডদেরকে শত্রু ভাবে। অথচ অনেকেরই স্পেনে বাড়ি ও ব্যবসা রয়েছে।