বিশ্বায়নের এইকালে জাতিতে জাতিতে সম্প্রতি আর বন্ধন নিবিড় হবার কথা হলেও হয়নি। আমাদের ধারণা ছিল যোগাযোগ আর সখ্যতায় মানুষ একে অপরের কাছাকাছি আসার কারণে বিভেদ ঘুচবে, বিশ্বব্যাপী গড়ে উঠবে ঐক্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে আমরা তার বিপরীত চিত্রটি দেখতে পাই। এক সময় এ জাতীয় পরিস্থিতি বা আন্তর্জাতিক উত্তেজনা ও অশান্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে দায়ী করতো, বিশেষত তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়নকে দায়ী করে সারা দুনিয়ায় বন্ধু তৈরির চেষ্টা দেখেছি আমরা। একইভাবে পূর্ব ইউরোপ কেন্দ্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ আর পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে ছিল সক্রিয়। ভারসাম্যের সে দুনিয়ায় দোষারোপের রাজনীতি থাকলেও কোন কিছুই একপক্ষীয় ছিল না। আজ দুনিয়া অনেক মুক্ত, উদার ও দৃশ্যমান। মানুষ চলে এসেছে একে অপরের কাছাকাছি। কম্পিউটার, মোবাইল আরো কত বাহনে দূরত্ব গেছে ঘুচে। কিন্তু আজ ভারসাম্য বলে কিছু নেই। এই না থাকার কারণে একমুখী মুরুব্বী ও মুরুব্বীয়ানায় পৃথিবীর ভালো-মন্দ বা শত্রু-মিত্রের ব্যবধানও এখন ভিন্ন ধরনের। ছেলেবেলা থেকে অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা আর ধর্মনিরপেক্ষতায় বড় হয়েছি। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বা বৈষম্য নেই বা থাকতে পারে না, এই ন্যায়, এই নীতিতে যারা উদ্বুদ্ধ করেছেন তাদের অনেকেই জাতি বা সম্প্রদায়গতভাবে মুসলমান। সত্যি বলতে কি পঞ্চাশোর্ধ্ব এই জীবনে আমার আনন্দ-বেদনা, উত্থান-পতনে বাঙালি মুসলমানের যে ভালোবাসাও সাহচর্য পেয়েছি, অন্যরা তা দেয়নি বা দিতে পারেনি। অভিবাসী হবার পর অস্ট্র্রেলিয়ার মত বহুজাতিক দেশে আমার সখ্যতার বৃত্ত বড় হয়ে উঠলেও নিবিড়তায় এখনো তারাই আমাকে ঘিরে আছেন, বাঙালি বলে শুধু নয়, মধ্যপ্রাচ্য, মিশর, আফ্রিকা, ইউরোপসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে সখ্যতায় এটা বুঝেছি, মানুষ মূলত:শান্তিকামী। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে ভেদাভেদ থাকলেও মিলন প্রয়াসী, কিন্তু এককেন্দ্রিক বিশ্বে রাজনৈতিক কারণে মুসলিম সম্প্রদায়কে আজ কোণঠাসা করে ফেলার চেষ্টা দেখছি। মার্কিনী কৌশল, বিশ্বায়নের দৈত্য পাঠিয়ে যুব সমাজকে বিভ্রান্ত করে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার নানা দেশে গণ্ডগোল অব্যাহত রাখছে। সেটা যে কেবল তাদের ইচ্ছেয় হচ্ছে এমনও নয়। দীর্ঘকালের অপশাসন, রাজতন্ত্র উগ্র ধর্মান্ধতায় যে দেশগুলোর সমাজ অচলায়তন মানুষ তিতি বিরক্ত সেখানে এ জাতীয় উগ্রতা, জীবন নিঃশেষের সহজ উত্তেজনা আর মারদাঙ্গা থাকবেই, কিন্তু এ জাতীয় সমস্যা যাদের সৃষ্ট তারাই আজ বিপরীত ভূমিকায়। এ দেশ অর্থাত্ অস্ট্রেলিয়ার এক এমপিকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, মধ্যপ্রাচ্য ও আফগানিস্তান নিয়ে শংকা, আগ্রহ উদ্বিগ্নতার কারণ বুঝি, কিন্তু বার্মা, কঙ্গো, কলোম্বিয়া বা অন্য দেশের বেলায় শীতলতার কারণ বুঝি না কেন? স্মিত হাস্যে তিনি উত্তর দিয়েছিলেন আমরাও তো বুঝি না, উই জাস্ট ফলো আওয়ার মাস্টার। এই মাস্টার মাইন্ড যখন যা বোঝে বা করে সেটাই এখন দুনিয়ার রুলস বা নিয়ম। এককালে তার কালের তলায় থাকা উস্কে দেয়া জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ আজ তার পরম শত্রু। সে কারণে এক দিকে আফগানে তালেবান হত্যা বা দমনে আধুনিক গণতন্ত্রের কথা বললেও অন্য প্রান্তে লড়াই জিইয়ে রাখতে ঐ সেনা দলের সদস্যদের টাকা দিয়ে কেনা বেচার হিড়িক চলছে।
এই কঠিন বাস্তবতায় বাংলাদেশ পড়েছে মহাসংকটে। যে সব মুরুব্বীরা আমাদের দেশে কঠিন গণতন্ত্র, তাদের ভাষায় সুশীল সমাজের শাসন আর আধুনিকতা চান, তারাই মানবাধিকার বা অন্য কোন ছদ্ম নামে দমন বা শাস্তিদানের বিরোধিতা করেন, মানবতা বা মানবাধিকার সংস্থার নাম শুনলেই আমরা ভাবি এরাই নিয়ন্ত্রক বা প্রভাবশালী কিছু। এ ধারণা সঠিক নয়। বহু মানবাধিকার সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান আছে যাদের কাজই হচ্ছে ইস্যু বানিয়ে চাঙ্গা রেখে পৃথিবীর চোখে ধুলো দেয়া। এরা বাংলাদেশের ব্যাপারে অযাচিত সজাগতা দেখালেও স্লোডান, এ্যাসেঞ্জ বা অন্য বিষয়ে নীরব। এক যাত্রায় পৃথক ফলে বিশ্বাসী এদের কারণে আজ আমরাও দ্বৈত সত্তা আর বিভক্তিতে ভুগছি।
বিশ্বায়নের নামে খুলে যাওয়া দুনিয়ায় যা দেখছি তাই যেন সত্য বলে মেনে না নেই। কোথাও একটি লেখায় পড়ছিলাম দুনিয়ার মানচিত্রটি পর্যন্ত ইউরোপ আমেরিকার আদলে তাদের খেয়ালমত আঁকা হয়েছে, অন্যথায় নাকি শুরুটা পূর্ব প্রান্ত থেকে করাই হতো নিয়ম মাফিক, তাই তারুণ্যকে সজাগ থাকতে হবে। জানতে হবে বিশ্বভাতৃত্ব ধর্ম মানবিকতা যাদের মুখের বুলি তারাই আমাদের বিভক্তি শিখিয়েছে। যে কারণে কাছাকাছি আসার পরও পৃথিবী কোন বিন্দুতে এক হতে পারে না, পারছে না।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা আর অগ্রগতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ দুশমনের সংখ্যাও কম নয়। কেবল মাড়োয়ারী বা পাকিরা নয়। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়লে শ্বেতাঙ্গরাও ছাড় দেয় না, সে জায়গাটার গভীর গোপন ষড়যন্ত্র আজ না বুঝলেও ভাবী প্রজন্মকে একদিন না একদিন তার মোকাবেলা করেই এগুতে হবে। তাই আমরা রাজনৈতিক সংঘাত, দলাদলি আর অনৈক্যের পরিবর্তে দেশ-বিদেশের বাংলাদেশিদের ভেতর ঐক্য ও সম্প্রীতি কামনা করি। বিশ্বায়নের ইলেকট্রনিক্স বাহনগুলো নয়, আমাদের আস্থার স্থল হয়ে উঠুক পুরো বিশ্বের খুলে যাওয়া মনোজগত্ আর আধুনিকতা। তাহলেই আমরা এগুতে শিখবো।
লেখক :সিডনি থেকে
