ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৬
চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে অর্থাত্ চার শতাধিক বত্সর পূর্বে নির্মিত নয়দুয়ার মসজিদটি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইতেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পশ্চিমপার্শ্বে খইয়াছড়া ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের আধা কিলোমিটার দক্ষিণে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের স্মারক নয় দুয়ার ও নয় গম্বুজবিশিষ্ট এই মসজিদটি ভাঙ্গিয়া উক্ত স্থানে দুই কোটি টাকা বিদেশি অনুদানে নূতন মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে। পুরাকীর্তি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের শিকড়। আমাদের দেশে বিভিন্ন জনপদে ছড়াইয়া থাকা পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলি কালের সাক্ষী হইয়া রহিয়াছে। মহাস্থানগড়, ময়নামতি, পাহাড়পুর, জগদ্দল মহাবিহারের মতো আরও অনেক প্রত্ন-অঞ্চল রহিয়াছে যেগুলির বিজ্ঞানভিত্তিক খনন ও সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু তাহা করিবার মতো উদ্যোগ চোখে পড়িতেছে না। ব্রিটিশ আমলে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শনাক্ত করা অনেক প্রত্নস্থলের এখন হদিস খুঁজিয়া পাওয়া ভার হইবে। নিয়মিতই ইতিহাস-অচেতন ও স্বার্থান্ধ মানুষের ধ্বংসযজ্ঞ চলিতেছে। একই পরিণতি ঘটিতে যাইতেছে মুঘল শাসনামলের স্মৃতিবাহী এই মসজিদটির। জরাজীর্ণতার অজুহাত তুলিয়া ইতোমধ্যেই মসজিদটি অনেকখানি ভাঙ্গিয়া ফেলা হইয়াছে। তবে খবর পাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজাগ হইয়াছেন, মুঘল আমলের এই প্রাচীন নিদর্শনটি ভাঙ্গার কাজ বন্ধ করিতে সবধরনের ব্যবস্থা লইবেন বলিয়া জানাইয়াছেন। কিন্তু তাহার কথাতে আস্থা রাখিলেই মসজিদটি রক্ষা পাইবে কি! প্রশ্ন তোলা যাইতে পারে, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ মুঘল আমলের প্রাচীন এই মসজিদটি সংরক্ষণের কাজ ফেলিয়া কি নাকে তেল দিয়া ঘুমাইতেছিল, ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হইবার পূর্বেই কেন তাহারা ব্যবস্থা লইতে পারিল না? বাস্তবতা এরূপই, এদেশে এমন উদাসীনতাই স্বাভাবিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অযত্নে-অবহেলায় প্রত্নস্থাপনাগুলি পড়িয়া রহিয়াছে ও ধ্বংস হইতেছে, কিন্তু সরকারিভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা উত্খনন করিয়া ইতিহাস নির্মাণের কোনো প্রচেষ্টা নাই। অন্যদিকে, নিয়মিতভাবে দেশের অনেক মূল্যবান পুরাকীর্তি আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের মাধ্যমে বিদেশে পাচার হইতেছে, দুই-একটি চালান পুলিশের হস্তগত হইলেও চোরাচালান বাড়িয়াই চলিয়াছে। ইহার একটি প্রধান কারণ হইল, বাংলাদেশের প্রচলিত প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ বিষয়ক আইনটি কেবল পুরাতনই নহে, সমকালীন বাস্তবতাবর্জিত। ১৯০৪ সালের একটি আইন পরিবর্তন করিয়া ১৯৬৮ সালে আইনটি প্রণীত হয়, ১৯৭৬ সালে সামান্য সংশোধনও করা হইয়াছে। সংশোধিত সেই আইনে প্রত্নসম্পদ পাচার ও কেনাবেচা সংক্রান্ত অপরাধের শাস্তি হিসাবে ৩০ দিনের কারাদণ্ড অথবা ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। এই আইনটির বিধান একাধারে অ-যুগোপযোগী এবং অকার্যকর বটে। প্রত্নসম্পদ এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলির অপব্যবহার ও ধ্বংস রোধ করিয়া যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণের কাজটি প্রত্নসম্পদ বিভাগ কখনোই করিতে পারে নাই। সরকারের সদিচ্ছা এবং যথাযথ লোকবল ও সীমিত আর্থিক বরাদ্দ সবসময় বড় অন্তরায় হইয়া থাকিয়াছে। একটি দেশের অতীত, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসাবে কাজ করে ইতিহাসের নানা কালপর্বে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনা ও পুরাকীর্তি। প্রাচীন স্থাপনা ও পুরাকীর্তির মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্ম একটি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন আমলের জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প ও সৌন্দর্যবোধ সম্পর্কে অবহিত হইতে পারে। আমাদের প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। সেই ইতিহাস পুনর্গঠনের প্রয়োজনে, ইতিহাসের ওপর বহুদিক হইতে আলো ফেলিবার জন্য এবং সর্বোপরি সাংস্কৃতিক সংহতির জন্য, প্রত্নস্থলগুলি রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এখনো কিছুটা সুযোগ আছে। সরকারকেই এই কাজ করিতে হইবে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। প্রত্নসম্পদের যথাযথ আলোকচিত্র ও রেপ্লিকা তৈরি করিয়া বহুল প্রচারের বন্দোবস্ত করা যাইতে পারে। এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিষয়ে জনসাধারণের সচেতনতা এবং জাতীয় সম্পদের প্রতি আগ্রহকেই বৃদ্ধি করিবে। ব্রিটিশ মিউজিয়ামেও পুরাকীর্তির রেপ্লিকা তৈরি করিয়া উচ্চমূল্যে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর আইন ১৯৮৩-তে রেপ্লিকা তৈরি ও তাহা প্রচারের কথা বলা হইলেও তাহার যথাযথ প্রয়োগ নাই। ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বহুকাল আগে আক্ষেপ করিয়া বলিয়াছিলেন, বাঙালির ইতিহাস নাই। তিনি জাতীয় ইতিহাস লিখিবার তাগিদ দিয়াছিলেন। কিন্তু কে লিখিবে? তিনি বলিয়াছিলেন, আমি লিখিব, আপনি লিখিবেন, সকলেই লিখিবে। আর তবেই জাতি আগাইবে। কিন্তু আমরা সকলে মিলিয়া বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস লিখিতে বসা তো দূরের কথা, তাহা লিখিবার উপকরণ হিসাবে বিদ্যমান সকল স্মৃতি ও প্রমাণাদি ধ্বংস করিতেই এখনও ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছি!

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন