মাঠের ফসল পুড়িয়া গিয়াছে। বৃক্ষ-গুল্মের মরণদশা। পত্র-পল্লব শুকাইয়া গিয়াছে। ঝাঁঝরা হইয়া গিয়াছে ঘরের টিনের চাল। এই চিত্র কালিয়াকৈর উপজেলার মধ্যপাড়া ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রামের। দোয়ারিচালা, রায়েরচালা, বড়চালা, ফকিরচালা ও জামালপুর— পাশাপাশি এই পাঁচটি গ্রাম বসবাসের অযোগ্য হইয়া গিয়াছে প্রায়। এই পাঁচ গ্রামের ঘরে ঘরে শ্বাসকষ্টসহ নানান অসুখ-বিসুখ লাগিয়াই আছে। মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রহিয়াছেন তাহারা। আট বত্সর আগে দোয়ারিচালা গ্রামে স্থাপিত একটি রং তৈয়ারির কারখানা হইতে এসিড নিঃসরণের পরিণতিতে পার্শ্ববর্তী পল্লী জনপদে নামিয়া আসিয়াছে এই মারাত্মক বিপর্যয়। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এই সংক্রান্ত খবরে অভিযোগ করা হইয়াছে যে, ঐ কারখানায় রং নয়, আসলে এসিড উত্পাদন করা হইয়া থাকে। এলাকার ভুক্তভোগীদের কেহ কেহ এমনও অভিযোগ করিতেছেন যে, কারখানা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে সময়ে-অসময়ে বাতাসে এসিড ছাড়িয়া দেন। উদ্দেশ্য, অসহ্য হইয়া জমিজমা বিক্রয় করিয়া এলাকাবাসী যাহাতে অন্যত্র চলিয়া যান। এই ধরনের কোনো হীনপরিকল্পনা কাহারও থাকিতে পারে না এমনটি এই কালে এই দেশে নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। সে যাহাই হউক, কারখানার একজন পরিচালক স্বীকার করিয়াছেন যে, উত্পাদনের সময় এসিডের চাপ বাড়িয়া গেলে পাইপ লিক হইয়া কখনও কখনও বাতাসে মিশিয়া যাইতে পারে। তাহার অভিমত, ইহাতে এলাকার মানুষের কোনো সমস্যা হয় না। কিন্তু এই ধারণা যে সঠিক নয়, তাহা ইতিমধ্যে প্রমাণিত। মানুষ গ্রাম ছাড়িতে শুরু করিয়াছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হইবার উপক্রম হইয়াছে। এই বেগতিক পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী কারখানাটি অন্যত্র সরাইয়া নেওয়ার দাবি জানাইয়াছেন। কিন্তু কোনও প্রতিকার পাইতেছেন না। কর্তৃপক্ষ নির্বিকার।
দেশে কলকারখানা হইবে ইহাতে কাহারও আপত্তি থাকিবার কথা নয়। উত্পাদন ও কর্মসংস্থানের প্রয়োজনেই শিল্পের প্রসার প্রত্যাশিত। ইহার মানে এই নয় যে, নিয়ম-নীতি না মানিয়া যত্রতত্র কারখানা স্থাপন করিয়া জনজীবন বিপর্যস্ত করা হইবে। বাংলাদেশে বিবিধ প্রতিকূলতার মধ্যেও শিল্প- কারখানা চলিতেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটিতেছে। ইহা আশার কথা নিঃসন্দেহে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে নীতি-নৈতিকতার প্রশ্নটি উপেক্ষিত থাকিয়া যাইতেছে। শহরের আবাসিক এলাকায়, পল্লীর জনবসতিপূর্ণ এলাকায় কারখানা স্থাপন করা হইতেছে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গার্মেন্টস কারখানা হইয়াছে। ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ও বারিধারার মত আবাসিক এলাকাসমূহেও চলিতেছে বহু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। গ্রামাঞ্চলে জনবসতির মধ্যে এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ইটের ভাটা স্থাপন করা হইয়াছে—এমন দৃষ্টান্তের অভাব নাই। সব কারখানা হইতেই কমবেশি বর্জ্য নিঃসরণ হইয়া থাকে। কোনো কোনো কারখানা হইতে মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিকের নিঃসরণ ঘটে, যাহা পরিবেশ এবং জনজীবনের জন্য বিপজ্জনক। এই ক্ষেত্রে শিল্প ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন অত্যাবশ্যকীয় এবং বিদ্যমান নীতির যথাযথ বাস্তবায়ন একান্ত প্রয়োজন। সেইসঙ্গে দরকার শিল্প ও বাণিজ্যের ধরনানুযায়ী এলাকা চিহ্নিত করিয়া দেওয়া। শহর বা গ্রামের আবাসিক এলাকায় শিল্প বা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কালিয়াকৈরের পল্লী জনপদে একটি রং বা এসিড তৈয়ারি কারখানা স্থাপনের অনুমতি কোন্ বিবেচনায় দেওয়া হইয়াছে, তাহা আমাদের বোধগম্য নয়। প্রয়োজনীয় অনুসন্ধানপূর্বক কালিয়াকৈরের পাঁচ গ্রামের মানুষ যে সমস্যায় পড়িয়াছেন তাহার প্রতিকারের আশু পদক্ষেপ নেওয়া কর্তব্য।
