আ ন্ত র্জা তি ক

কী ছিল হিরোশিমা-নাগাসাকির মরণযজ্ঞের উদ্দেশ্য

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৩, ২২:৩৬
ইতিহাসে যুদ্ধক্ষেত্রে একবারই সক্রিয়ভাবে আণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে সর্বশেষ দিনগুলোতে, ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট তারিখে, প্রথমে জাপানের হিরোশিমা শহরে ও পরে ৩ দিনের ব্যবধানে অপর জাপানি শহর নাগাসাকিতে আমেরিকানরা পর পর দু-দু’টি আণবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল। এই ঘটনা সম্পর্কে একটি গুরুতর প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হলো— এটি কী ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সর্বশেষ পদক্ষেপ, নাকি তা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর ঠাণ্ডা যুদ্ধ সূচনার প্রথম পদক্ষেপ? হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকার আণবিক বোমা নিক্ষেপ ছিল ইতিহাসের অতীব নিকৃষ্ট একটি ঘটনা। ইতিহাসের এই ঘটনা ভুলে থাকাটা হবে মহাপাপ। মনে রাখতে হবে—ইতিহাসকে ভুলে গেলে ইতিহাস তার প্রতিশোধ নিতে ভুল করে না। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমার হামলায় নিমিষে করুণ মৃত্যু হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষের। সভ্যতার ইতিহাসে এটিই ছিল সময়ের এককের হিসেবে সবচেয়ে বড় গণহত্যা। এক বন্ধু ফেইসবুকে লিখেছেন, ‘টেন টু দি পাওয়ার ফাইভ,— এ শুধু অংকের একটি সংখ্যা মাত্র নয়। এ হলো হিরোশিমা-নাগাসাকিতে জ্বলে যাওয়া মানুষের প্রাণের হিসাব।’ ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় আণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের জিজ্ঞাসা হলো, এই মানব বিধ্বংসী নতুন অস্ত্র ব্যবহারের আদৌ কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল কী? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণ বা সেই যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য এর দরকার আদৌ ছিল কী? এর জবাবের জন্য এই বোমাবর্ষণের আগের ঘটনাবলীর দিকে প্রথমে দৃষ্টি দেয়া যাক। ১৯৪৫-এর আগস্টের কিছুদিন আগে, জুলাইয়ের শেষদিকে, আমেরিকানরা টোকিও শহরের ওপর বিধ্বংসী বোমাবর্ষণ করেছে। টোকিও ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। জাপানের সামরিক শক্তি প্রায় সম্পূর্ণরূপে চুরমার হয়ে গেছে। মে মাসে বার্লিন মুক্ত হওয়ার পর জার্মানির নািস বাহিনী পরাজয় মেনে নিয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছে। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট—ইতালি শেষ। ইউরোপে যুদ্ধ শেষ! পূর্ব ইউরোপের দেশে দেশে কমিউনিস্টরা সরকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের দুর্জয় ‘রেড আর্মি’ ইউরোপের রণাঙ্গন ত্যাগ করে দুর্ধর্ষ সমরনায়ক মার্শাল জুকভের নেতৃত্বে এশিয়ার যুদ্ধে যোগদানের জন্য রওনা হয়ে গেছে। জাপানের ভূ-খণ্ডে যৌথ অভিযানের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জাপানের সেনাবাহিনীকে আত্মসমর্পণের জন্য ২৬ আগস্ট পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়ে আলটিমেটাম দেয়া হয়েছে। জাপানের হাই কমান্ড আত্মসমর্পণের কথা ভাবতে শুরু করেছে। ইউরোপের পর এবার এশিয়া যুদ্ধও শেষ হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে। এসবই হলো প্রামাণ্য তথ্য। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে, জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য কিংবা এশিয়ার যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার জন্য হিরোশিমা-নাগাসাকিতে এটম বোমা নিক্ষেপের কোনো প্রয়োজনীয়তা ছিল না। এই বোমা নিক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা ছিল অন্যত্র। কী সে প্রয়োজনীয়তা, কী সে কারণ, যে কারণে নিমিষে ‘টেন টু দি পাওয়ার ফাইভ’ মানুষের প্রাণ হরণ করার মতো মারণাস্ত্র আমেরিকা ব্যবহার করেছিল? আণবিক বোমা আবিষ্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। অবশ্য আগেই কিছুটা আঁচ করা গিয়েছিল যে জার্মানরা এ ধরনের বোমা তৈরির জন্য গবেষণা চালাচ্ছে। ১৯৪২ সালে আমেরিকা ‘ম্যানহ্যাটন প্রজেক্ট’ নামে এ বিষয়ে গবেষণা কাজ শুরু করে। অত্যন্ত সংগোপনে কাজ এগিয়ে নিয়ে ১৯৪৫ সালের প্রথমার্ধে তারা পরীক্ষার জন্য ‘থিন ম্যান’ নামে পরিশুদ্ধ প্লুটোনিয়াম দিয়ে তৈরি একটি আণবিক বোমা প্রস্তুত করতে ও তা পরীক্ষা করতে সক্ষম হয়। একই প্রযুক্তিতে আরো বড় একটি বোমা ‘ফ্যাট ম্যান’ নাগাসাকিতে ব্যবহার করা হয়। তবে আগে কোনো পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ব্যতিরেকেই, পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে তৈরি ভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও ট্রিগারিং ব্যবস্থা সম্বলিত ‘লিটল বয়’ বোমাটি হিরোশিমায় নিক্ষেপ করা হয়। এক্ষেত্রে ব্যবহূত ট্রিগারিং প্রযুক্তি বিপদ সৃষ্টি করতে পারে জেনেও সেটিকেই প্রথমে ব্যবহার করা হয়। সমস্ত বিষয়ে তাড়াহুড়ো ও ঝুঁকি নেয়ার ব্যাপারটি বেশ তাত্পর্যপূর্ণ। ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট রাত ভোর হওয়ার আগেই ২টা ৪৫ মিনিটে ‘এনোলা গে’ নামের একটি বি-৫৯ বোমারু বিমান মেরিয়ানার টিনিয়ান দ্বীপ থেকে জাপান অভিমুখে রওনা দেয়। বিমানটির বিশেষভাবে নির্মিত বোমার খাঁচায় ছিল ‘লিটল বয়’ সাংকেতিক নামের ৯ ফুট লম্বা, ২ ফুট ব্যাসের ও ৯ হাজার পাউন্ড ওজনের একটি আণবিক বোমা। স্থানীয় সময় ৮টা ১৬ মিনিটে হিরোশিমার মাটি থেকে প্রায় ২ হাজার ফুট উপরে থাকা অবস্থায় বোমাটি বিস্ফোরিত করা হয়। বোমাটি ছিল পরিশুদ্ধ ইউরেনিয়াম-২৩৫ দ্বারা তৈরি। ইউরেনিয়ামের প্রধান একটি বড় খণ্ড থেকে কয়েক ফুট দূরে, বোমার অপর মাথায়, তার আরেকটি ছোট অংশ রাখা ছিল। ছোট অংশটিকে ট্রিগারের সাহায্যে বড় অংশে প্রবেশ করানো মাত্র ইউরেনিয়ামের ‘ক্রিটিক্যাল ম্যাস’ অতিক্রম করায় সেখানে ১৪০ পাউন্ড ইউরেনিয়ামে পারমাণবিক ফিশন প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ০.০২১ আউন্স ইউরেনিয়ামের ম্যাস মুহূর্তের মধ্যে গতি, তাপ, আলো প্রভৃতি ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে অভাবনীয় এক বিস্ফোরণের জন্ম দেয়। বিস্ফোরণের শক্তি ছিল ১৫ হাজার টন টিএনটি-র সমান। বিশাল ব্যাঙের ছাতার মতো কুণ্ডলি হিরোশিমার আকাশকে ছেয়ে ফেলে। মুহূর্তের মধ্যে শহরের ৯০ শতাংশ মাটির সাথে মিশে যায়। নিমেষেই মৃত্যু হয় ৭৫ হাজার মানুষের। ডিসেম্বরের মধ্যে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার। এর তিনদিনের মাথায় ‘বকস্কার’ নামের অপর একটি আমেরিকান বি-২৯ বোমারু বিমান দক্ষিণ-পশ্চিম জাপানের কাইউসু দ্বীপের কোকুরা অভিমুখে উড়ে আসে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সে তার গতিপথ পরিবর্তন করে নাগাসাকি শহরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সে বহন করেছিল ‘ফ্যাট ম্যান’ সাংকেতিক নামের আণবিক বোমা। এই বোমার ‘কোর’টিতে ছিল তেজস্ক্রিয় প্লুটোনিয়াম। সেটির চতুর্দিক ছিল তার দিয়ে সংযুক্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক পদার্থ। এসব বিস্ফোরক একসাথে বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে ‘কোরের’ প্লুটোনিয়ামে পারমাণবিক ফিশন-এর চেইন রিএ্যাকশন শুরু হয়ে যায় এবং বৃহত্তর আণবিক বিস্ফোরণটি ঘটে। সেই বিস্ফোরণের মাত্রা দাঁড়ায় ২২ হাজার টন টিএনটির বিস্ফোরণ-শক্তির সমান। লম্বায় ১২ ফুট ও ব্যাসে ৫ ফুট আয়তনের ‘ফ্যাট ম্যান’ বোমাটিকে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ২ মিনিটে বিস্ফোরিত করা হয়। ০.০৩৫ আউন্স প্লুটোনিয়াম ম্যাস বিভিন্ন ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। হিরোশিমার বোমার চেয়ে শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও নাগাসাকির ভৌগোলিক কিছু বৈশিষ্ট্যের কারণে হতাহতের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কিছুটা কম ছিল। তবুও নিমিষে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ হাজার। গুরুতর আহত হয় ৭৫ হাজার মানুষ। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষিপ্ত শুধু দু’টি বোমাতেই লক্ষাধিক মানুষ নিমিষে প্রাণ হারিয়েছিল। দেড় লক্ষাধিক মানুষ গুরুতর আহত হয়েছিল। কয়েকদিনের মধ্যে তাদেরও মৃত্যু হয়। বোমার তেজস্ক্রিয়তা বিকিরণের ফলে অচিরেই ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। হিরোশিমা-নাগাসাকির বীভত্সতার কথা বিশ্ববাসী প্রথম জানতে পারে চার সপ্তাহ পরে। আমেরিকা একথা অনেকদিন গোপন রাখে যে এটি একটি তেজস্ক্রিয় এটম বোমা ছিল। ফলে আণবিক তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করার সুযোগ থেকে মৃত্যুপথযাত্রীদের বঞ্চিত করা হয়েছিল। ফলে ডাক্তাররাও সঠিক ধারায় চিকিত্সা কাজ অগ্রসর করতে পারেনি। শুধু এ কারণেই মৃতের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। বোমার আঘাত ছিল বীভত্স, কিন্তু তার চেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল আমেরিকান ‘নীরবতার’ ফলাফল। অস্ট্রেলিয়ার সাংবাদিক উইলফ্রেড গ্রাহাম বুর্চেট এটম বোমা নিক্ষেপের এই ঘটনার চার সপ্তাহ পর ২ সেপ্টেম্বর টোকিও থেকে হিরোশিমা পৌঁছান। পরে তিনি তার চোখে দেখা বিবরণ পত্রিকার জন্য নিউজ ডেসপ্যাচ আকারে প্রেরণ করেন। সেই ডেসপ্যাচে বুর্চেট লিখেন, ‘তিরিশতম দিনে হিরোশিমায় : যারা পালাতে পেরেছিলেন তারা মরতে শুরু করেছেন।... চিকিত্সকরাও কাজ করতে করতে মারা যাচ্ছেন। বিষাক্ত গ্যাসের ভয়। মুখোশ পরে আছেন সকলেই।’ তিনি আরো লিখেন, ‘হিরোশিমাকে বোমা বিধ্বস্ত শহর বলে মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে, দৈত্যাকৃতির একটি রোলার যেন শহরটিকে পিষে দিয়ে গেছে।... পঁচিশ বা তিরিশ বর্গমাইল জুড়ে একটিও অট্টালিকা দাঁড়িয়ে নেই।’ তার ডেসপ্যাচে বুর্চেট আরো লিখেন, ‘বোমায় অক্ষত থাকা মানুষগুলো দিন কয়েক পরে অসুস্থ বোধ করতে শুরু করে ও হাসপাতালে যেতে থাকে। চিকিত্সকরা তাদের শরীরে ভিটামিন-এ ইনজেকশন দেয়। দেখা যায় যে, ইনজেকশনের জায়গায় মাংস পচতে শুরু করেছে। এমন মানুষদের একজনও বাঁচেনি। ৫ সেপ্টেম্বর বুর্চেটের ডেসপ্যাচটি ‘ডেইলি এক্সপ্রেস’ পত্রিকায় ছাপা হয়। সাহসী সাংবাদিক বুর্চেট নিজেই তেজস্ক্রিয় বিকিরণে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮৩ সালে ক্যান্সারে মারা যান। সে বছরই তার লেখা ‘শ্যাডো অফ হিরোশিমা’ বইটি প্রকাশিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণের শেষ নেই। টার্গেটের কেন্দ্রে তাপমাত্রা বেড়ে কয়েক হাজার সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। মানব দেহসহ সবকিছু মুহূর্তে সম্পূর্ণ ‘নাই’ হয়ে যায়। ভূ-পৃষ্ঠের পাথরে বা কংক্রিটে কেবল মানব-মানবীর দেহ অবয়বের একটি অস্পষ্ট ছায়াচিহ্ন থেকে যায়। চোখ ধাঁধানো আলো ও মহাপ্রলয়ঙ্করী ঝড় বয়ে যায়। ছাই-ভস্মসহ সবকিছু উড়ে যায় ঊর্ধ্বাকাশে—এটম বোমার বিস্ফোরণের সিম্বল, ব্যাঙের ছাতা আকৃতির ধোঁয়ার বিশাল কুন্ডলিতে। হিরোশিমা-নাগাসাকির এই কুকীর্তির বোঝা আটষট্টি বছর পরেও বয়ে চলেছে সেখানকার সন্তান-সন্ততিরা। প্রতিটি মাকে ভয়ে ভয়ে দিন গুনতে হয়, যে সন্তানটি তার ভূমিষ্ঠ হবে সে বিকৃত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অবয়ব নিয়ে জন্মাবে না তো! হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনাটি জাপানকে যুদ্ধে পরাজিত করার জন্য করা হয়নি। এর আগেই জাপান পরাজয় মেনে নিয়ে আত্মসমর্পণের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময়টিতে হিরোশিমা-নাগাসাকিতে এ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করলো কেন? কী ছিল উদ্দেশ্য? হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকার এ্যাটম বোমা নিক্ষেপের পেছনে প্রথম উদ্দেশ্য ছিল, ইয়ালটা চুক্তি অনুসারে ইউরোপে যুদ্ধ শেষের পর সোভিয়েত রেড আর্মি যেন এশিয়ার যুদ্ধে প্রবেশ করতে না পারে তার ব্যবস্থা করা। রেড আর্মি জাপানে বড় রকম অপারেশন শুরু করার আগেই আমেরিকার কাছে একতরফা জাপানি আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করা। এশিয়াকে কমিউনিজমের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার প্রয়াসের অংশ হিসেবেই আমেরিকাকে জরুরি ভিত্তিতে এটম বোমা নিক্ষেপ। কমিউনিজম বিরোধী মার্কিন এই ক্রুসেডের স্বার্থে লাখ লাখ নিরপরাধ জাপানি বেসামরিক নাগরিককে নিমিষে বলি দিতে মার্কিনীরা কুণ্ঠিত হয়নি। হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আমেরিকা এটম বোমা ফেলেছিল দ্বিতীয়ত যে কারণে তা হলো, নতুন উদ্ভাবিত এই অস্ত্রটি বাস্তব যুদ্ধক্ষেত্রে প্রয়োগের একটি পরীক্ষা চালিয়ে দেখা ও দেখানো। এর পরে হাজার হাজার পারমাণবিক বোমা তৈরি ও মজুদ করা হলেও এবং অনেক বড় বড় যুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও কোনো ক্ষেত্রেই এখনো সক্রিয়ভাবে এটম বোমা ব্যবহার করা হয়নি। এমনকি ভূ-পৃষ্ঠে আণবিক বোমার সবধরনের পরীক্ষাও বহু দশক ধরে নিষিদ্ধ রয়েছে। তাড়াহুড়ো করে আমেরিকা তার নব উদ্ভাবিত আণবিক বোমা ব্যবহার করেছিল তৃতীয় যে কারণে তা ছিল রাজনৈতিক। এ্যাটম বোমার মনোপলি তার হাতে থাকায় সেটিকে কাজে লাগিয়ে সোভিয়েত (ও বিশ্বের অন্যান্য সব দেশকে) ভয় দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার উদ্দেশ্যটি ছিল আমেরিকার প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু সে পরিকল্পনা বেশিদূর অগ্রসর হয়নি। অচিরেই সোভিয়েত ইউনিয়ন আরো শক্তিশালী পারমাণবিক বোমা তৈরির সক্ষমতা অর্জন করেছিল ও আমেরিকার আণবিক একাধিপত্য ভেঙ্গে দিয়েছিল। কিন্তু মানব ইতিহাসের যা ক্ষতি হওয়ার তা ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। আত্মঘাতী পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন যে পরিমাণ পারমাণবিক বোমা আছে তা বিস্ফোরিত হলে এই ভূ-মণ্ডল ১৪ বার সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাবে। সব পক্ষের হাতে এই মারণাস্ত্র থাকায় এবং বেশি বেশি করে থাকায় কেউ এটি ব্যবহার করতে সাহসী হবে না—এই ডেটারেন্ট (অর্থাত্ অপরকে নিবৃত্ত রাখা) তত্ত্বকে যুক্তি হিসেবে এক্ষেত্রে তুলে ধরার চেষ্টা হয়। ডেটারেন্ট তত্ত্বকে MAD (Mutually Assured Destruction) নীতি বলে বলা হয়ে থাকে। পৃথিবী আজ আগ্নেয়গিরির মুখে রয়েছে। সব আণবিক বোমা ধ্বংস করে ফেলাসহ পরিপূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, তথা অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠা করা ছাড়া ভূ-মণ্ডল ও বিশ্ব সভ্যতাকে বিপদমুক্ত করা যাবে না। বিশ্ববাসীকে আজ বজ্র নিনাদে গর্জে উঠে বলতে হবে, ‘...ধ্বংস ও যুদ্ধ— আর না, আর না!’ লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি E-mail : [email protected]