সম্প্রতি প্রকাশিত হলো উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল। ছাত্র-ছাত্রীরা প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে ভর্তি হওয়া যায় পছন্দের একটি প্রতিষ্ঠানে, আর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি নিচ্ছে কিভাবে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে আয় করে নেয়া যায় মোটা অংকের টাকা!
আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়/ মেডিক্যাল কলেজসমূহে ২০১৪ শিক্ষাবর্ষে লেভেল-১ সেমিস্টার-১/১ম বর্ষে এ ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। আমাদের দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, একই পরীক্ষার্থীকে একাধিক প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। কেউ কেউ আবার একটি পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয়ে/ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের ভর্তি পরীক্ষায়ই অংশগ্রহণ করে। আর প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হলে ১ জন ছাত্র-ছাত্রীকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তি ফি প্রদান করে ফরম পূরণ করতে হয়। পরবর্তীতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে যাওয়া-আসা, থাকা-খাওয়াসহ অনেক প্রকার ভোগান্তি পোহাতে হয় (ছাত্রী হিসেবে এই কষ্ট কয়েকগুণ বেশি পোহাতে হয়। কারণ তার সাথে অন্তত ১ জন অভিভাবক থাকেন)। আর এভাবে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে চাইলে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রী ও তাদের পরিবারের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি কষ্টকর ও ব্যয়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে। তার সাথে প্রতিবছরই পাল্লা দিয়ে বাড়ানো হচ্ছে ভর্তি ফরমের দাম। আমরা অবশ্যই অস্বীকার করতে পারব না যে, ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীরা আমাদের দেশের খুব সাধারণ পরিবারের সন্তান, যারা অভিভাবকের স্বল্প আয়ের উপর নির্ভরশীল। আবার কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করার পরও আবেদনকৃতদের সকলেই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে না (যদিও সকলের কাছ থেকে আবেদনের জন্য নির্ধারিত ফি নেয়া হয়)। এর ফলে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষককেই আবেদনকারী/অভিভাবকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়, যা একান্তই অনাকাঙ্ক্ষিত। আর এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির জন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়/ প্রতিষ্ঠানসমূহের ভর্তি নীতিমালাই এককভাবে দায়ী। এতে করে দেশের সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহের শিক্ষক সমাজ এবং সামগ্রিকভাবে প্রতিষ্ঠানসমূহের ভাবমূর্তি ও উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াসহ ব্যবসায়িক মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছে। কোন উচ্চশিক্ষার পবিত্রতম স্থান থেকে এমন আচরণ কারো কাছেই কাম্য নয়।
প্রতিবছরই ভর্তি ফরমের দাম বাড়ানোর পিছনে কারণ হিসেবে বলা হয় ভর্তি-সংশ্লিষ্ট ব্যয় মেটানোর জন্য। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে কোন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা/প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ভর্তি ফরমের দাম সর্বোচ্চ ১৫০ থেকে ২০০ টাকা নেয়া যেতে পারে। যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়/ প্রতিষ্ঠানসমূহের বছরব্যাপী নিজস্ব আয় বাড়ানোর চেষ্টা না করে প্রতিনিয়ত পদের অধিক/অতিরিক্ত নিয়োগ দিয়ে যাচ্ছে (বিভিন্ন সময় পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী), ঠিক তখনি আয় বাড়ানোর জন্য দেশের সাধারণ জনগণ/তাদের ছেলে-মেয়ের কাছ থেকে ভর্তি ফরমের দাম বাড়িয়ে অধিক টাকা নিচ্ছে। এটা রীতিমত হাস্যকর। আমি কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের সাথে (যাদের কেউ কেউ আমার সরাসরি ছাত্র) কথা বলে বুঝেছি, অনেক সময় উনারা বেশ গর্ব ও আগ্রহভরে বলে থাকেন যে, আমরা তো ভর্তি পরীক্ষার সময়...টাকা পারিতোষিক পাই (যা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় অনেক বেশি)। কিন্তু আমার বিবেকে প্রশ্ন জাগে, যে দেশের গরিব মানুষের টাকায় আমার বেতন হচ্ছে, আমার পরিবার-পরিজন চলছে, সেই মানুষের ছেলে-মেয়েকে আমার বিশ্ববিদ্যালয়/ প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসার ১টি দিনেই আমাকে এতটা(!) আয় করতে হবে? আমরা কি এই একটি দিন/কয়েকটি ঘণ্টা বিনা পয়সায় কাজ/দায়িত্ব পালন করতে পারি না? আর সেটিও যদি না পারি তাহলে অন্তত যতটুকু সময় কাজ করি ততটুকু সময়ের পারিতোষিক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান নিয়মানুযায়ী প্রদান করলেও/নিতে রাজি হলেও ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের খরচের পরিমাণ অনেকটাই কমে যেত।
সেইসাথে আমাদের সামাজিক দায়িত্ববোধটুকুও পালন করা হতো। অন্যভাবে, যদি “Umbrella Examination”-এর মাধ্যমে ভর্তি পরীক্ষা নেয়ার ব্যবস্থা করা যেত (যেমন- কৃষি শিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তির জন্য ১টি পরীক্ষা, প্রকৌশল শিক্ষার প্রতিষ্ঠানসমূহে ভর্তির জন্য ১টি পরীক্ষা...) তাহলে ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের কষ্ট ও খরচের পরিমাণ বহুলাংশে কমানো যেত (সম্প্রতি শাবিপ্রবি ও যবিপ্রবি এমনি একটি উদ্যোগ নিয়েছে। যার ফলে এই দুটি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য ১টি পরীক্ষা দিলেই চলবে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার)। কিন্তু ভর্তিচ্ছুক ছাত্র-ছাত্রীদের হয়ে এই গুরুদায়িত্বটুকু পালন করবে কে—শিক্ষা মন্ত্রণালয়, নাকি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন?
লেখক :সহযোগী অধ্যাপক, ফুড টেকনোলজি ও গ্রামীণ শিল্প বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
Email:iqbal21155¦bau.edu.bd
