কল্পবিজ্ঞান আমাদের এমন বিস্ময়ের মুখোমুখি করে যে, ধরিয়াই লওয়া হয়, তাহা বিজ্ঞানকে মিশাইয়া কল্পগল্প মাত্র। কিন্তু মানুষের মস্তিষ্ক বোধকরি জগতের সর্বাধিক জটিল বস্তু—যাহার দ্বারা ‘অসম্ভব’ নামের শব্দটি ক্রমশ নিষ্প্রভ হইয়া যাইতেছে। এক্ষণে যদি এইরূপ হয় যে, মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়াইয়া যাইবে মানুষেরই তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তাহা হইলে সেই বুদ্ধিমত্তা কি শাসন করিবে মানুষকেও? কল্পবিজ্ঞানে এইরূপ কাহিনীর শেষ নাই। তবে বিষয়খানি যুক্তিগ্রাহ্যের সহিত একটু ভাবিয়া দেখা যাইতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিকাশের সহিত গবেষণায় নিযুক্ত মার্কিন গবেষক রে কার্জউইল সম্প্রতি বিবিসিকে বলিয়াছেন, আগামী দেড় দশকে এই প্রযুক্তি এতোটাই অগ্রসর হইবে যে, মানুষের বুদ্ধিমত্তার সমকক্ষ হইয়া উঠিবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এমনকি মানুষও তাহার শরীরের জিনগত পরিবর্তন ঘটাইয়া আয়ু বৃদ্ধি করিতে সক্ষম হইবে। শরীরের ভিতর অতিক্ষুদ্র (ন্যানো) রোবট বসাইয়া কোনো স্থান আক্রান্ত হইলে তাহা সারাইয়া তোলাও সম্ভবপর হইবে। বলা হইতেছে, এতদিন অনুমান করা হইতো, ২০৪৫ সাল নাগাদ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে ছাড়াইয়া যাইবে যন্ত্রের বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ যে হারে ঘটিতেছে তাহাতে অত দূর পর্যন্ত অপেক্ষা নাও করিতে হইতে পারে। ২০২৯ সালেই সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের বুদ্ধির সমপর্যায়ে চলিয়া আসিবে। প্রশ্ন হইল, মানুষের মতো বুদ্ধিমান কম্পিউটার বা রোবট কি আদৌ তৈরি করা সম্ভব? আর যদি তাহা হয়ও, তবে কম্পিউটারের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কী দাঁড়াইবে? যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কাজ করিতে পারে, তাই তাহা বিপজ্জনক নিশ্চয়ই। তবে কি ইহার গবেষণা বেশি দূর লওয়া উচিত নহে? তাহা বোধহয় মানুষের দুর্জয় ও দুঃসাহসী মানসিকতার বিপরীত এবং মানব সভ্যতাকে এই উত্কর্ষে আসীন করিবার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেও তাহা সাংঘর্ষিক।
মানুষ অনেক কিছুই পারে না, যাহা যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়। আকাশে ওড়া কিংবা সাগর তলে যাওয়া স্বাভাবিকভাবেই মানুষের পক্ষে সম্ভব নহে। রাইট ভ্রাতৃদ্বয় যখন বিমান আবিষ্কার করিয়াছিলেন, তখন অতি বিস্ময়ের সঙ্গে অতি ভীতিও মানুষকে বিপর্যস্ত করিয়াছিল। কারণ যন্ত্র বিকলে বিমান আকাশ হইতে জমিনে মুখ থুবড়াইয়া পড়িলে মৃত্যু প্রায় অবধারিত। এই ভাবিয়া সেইকালে বিমানকে আরো উন্নত করিবার গবেষণা বন্ধ রাখা হয় নাই। সকল জটিল প্রযুক্তির ক্ষেত্রেই ইহা সত্য। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়ন মানুষের সর্বাধিক উত্কৃষ্ট উদ্ভাবন, নাকি সর্বনিকৃষ্ট, এইরূপ তর্কের সমাধান সহজ নহে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে সহজতর করতেই রোবট, মেশিন বা ড্রোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার হইতে পারে নিকট ভবিষ্যতে। কিন্তু যেমনটি সিনেমায় দেখা যায়, মানুষের কাজের সুযোগ কমাইয়া বেকারত্ব ডাকিয়া আনিতে পারে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উচ্চমানের ব্যবহার, তাহা এযাবত্ অন্যসকল উন্নত প্রযুক্তির আবিষ্কারের পরিপ্রেক্ষিতে বাস্তবোচিত নহে। বলা যায়, শেষ অর্থে সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক মানুষই এবং প্রযুক্তির দ্বারা মানুষ তাহার জীবন ও জীবিকাকে আরো সহজতর করিয়া তোলে মাত্র।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যদি মানুষের নিকট হইতে নিয়ন্ত্রণের রাশ কাড়িয়া লয়, এমন যুক্তিযুক্ত ভাবনার বিপরীতে শুধু বলা যায়, মানুষ হইল সেই মুনির মতো যাহার নিকট একটি ইঁদুর শরণাপন্ন হইল বিড়ালের ভয়ে। মুনি তাহাকে বিড়ালে পরিণত করিলেন। এইভাবে তাহাকে কুকুর ও ব্যাঘ্রে পরিণত করিলেন। বাঘ হইয়া তখন সেই সামান্য ইঁদুর মুনিকেই ভক্ষণ করিতে চাহিলে মুনি তাহাকে লহমায় ইঁদুরে পরিণত করেন। মানুষ নিশ্চয়ই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চরম বিকাশের সহিত সেই মৃত্যুকবচ প্রস্তুত রাখিবে তাহার হাতে যদি তাহা ব্যাঘ্রের ন্যায় আচরণ করিতে চায়। অনন্ত আকাশের সমস্ত নক্ষত্রমণ্ডলীর অধিক মানুষের নিউরন, তাহা জটিলতা অনির্ণেয়তুল্য। সুতরাং, মানুষই শেষ অর্থে শেষ কথা কহিবে নিশ্চয়ই।
