৬৮ বত্সর ধরিয়া কোরিয়া দুই খণ্ডে বিভক্ত। একই ভাষা, একই সংস্কৃতি, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি একই। কিন্তু হইলে কি হইবে? রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিভেদে লিপ্ত দুই দেশ সরকারিভাবে সর্বদাই পরস্পরের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করিয়া থাকে। পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ এতটাই প্রবল যে, মাঝেমধ্যেই যুদ্ধ বাধিয়া যাইবার উপক্রম হয়। আর কথার লড়াইয়ের কথা তো বলাই বাহুল্য। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এহেন পরিস্থিতি হইলেও রাজনৈতিক সীমান্তের ডোরে কোরীয়দিগের আবেগকে বাঁধিয়া রাখা যাইবে কেমন করিয়া? দেশ ভাগ হইয়াছিল অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নানাবিধ সমীকরণে। দেশ ভাগের ডামাডোলে হাজার হাজার কোরীয় পরিবার ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হইয়া গিয়াছিল। একই পরিবারের কেহ উত্তরে, কেহবা দক্ষিণে থাকিয়া যাইতে বাধ্য হইয়াছিল। এই পরিবারগুলি যাহাতে পুনরায় মিলিত হইতে পারে সেই প্রস্তাব আসিয়াছে এইবার। ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসে ভাষণদানকালে প্রস্তাবটিতে আসিয়াছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের দিক হইতে। দেখা যাইতেছে যে, বিলম্ব না করিয়া প্রস্তাবটি সহমত পোষণ করা হইয়াছে। উত্তর সাড়া দিয়াছে দক্ষিণের প্রস্তাবে। এমন ঘটনা খুব একটা ঘটিতে দেখা যায় না। কিংবা উত্তরের প্রস্তাবে দক্ষিণ? তাহাও ঘটিতে দেখা যায় না। এইবার মনে হইতেছে দুই কোরিয়ার মধ্যে কিছুটা শুভবোধের উন্মেষ ঘটিয়াছে। উল্লেখ্য, বিচ্ছিন্ন হইয়া যাওয়া কিছু পরিবারের দেখা-সাক্ষাতের ঘটনা সর্বশেষ ঘটিয়াছিল ২০১০ সালে।
তৃতীয় পক্ষ নাক গলাইবার পূর্বেই বিষয়টি লইয়া দুই কোরিয়া আদৌ অগ্রসর হইতে পারিবে কিনা তাহা বলা যায় না। যে শুভবোধের প্রকাশ দেখা যাইতেছে তাহা পল্লবিত না হইবার আশঙ্কা অবশ্য দুই পক্ষের প্রাথমিক কথাবার্তার মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রকাশ হইয়া গিয়াছে। দক্ষিণ চাহিতেছে কোরীয় পরিবারগুলির পুনর্মিলনী বিষয়ক আলাপ-আলোচনাগুলি অনুষ্ঠিত হইবে দক্ষিণের পানমানজমে। পক্ষান্তরে পিয়ংইয়ং উত্তরের শৈলশহর কুমগাং-এর নাম প্রস্তাব করিয়াছে। কেবলমাত্র আলোচনার স্থল বাছাইকে কেন্দ্র করিয়া ভংগুর আশাবাদটি চূর্ণ হইবে কিনা বলা যায় না। কোরীয় পরিবারগুলি পুনর্মিলনের লক্ষ্যে ‘‘মন-প্রাণ খুলিয়া’’ আলোচনায় বসিবার জন্য উত্তরের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছে দক্ষিণ। এইদিকে উত্তর দিক হইতে পরিবার পুনর্মিলনীর আলোচনার সহিত উভয় দেশের মধ্যকার সর্বপ্রথম যৌথ প্রকল্প কুমগাং-পর্যটন প্রকল্প পুনরায় শুরু করিবার প্রসঙ্গটি টানিয়া আনা হইয়াছে। চালু থাকা অবস্থাতে ১৯৯৮ সাল হইতে ২০০৮ সাল পর্যন্ত হাজার হাজার কোরীয় দক্ষিণ হইতে উত্তরে ভ্রমণ করিতে আসিয়াছিল। প্রবেশ নিষিদ্ধ এলাকাতে ঢুকিয়া একজন দক্ষিণ কোরীয় নাগরিকের প্রাণ হারানোর ঘটনায় প্রকল্পটি বন্ধ হইয়া যায়। ইহাছাড়াও উত্তর কোরিয়ার কেইসং-এ দক্ষিণ কোরিয়ার বিনিয়োগে গড়িয়া উঠা শিল্প জোনটিও পুনরায় খুলিয়া দিবার বিষয়ে কথা বলিয়াছে পিয়ংইয়ং। এই দুই প্রকল্পকে দুই কোরিয়ার বিবাদভঞ্জন, ঐক্য, পুনরেত্রীকরণ ও উন্নতির স্মারক হিসাবে বর্ণনা করিয়াছে পিয়ংইয়ং। এইসব বক্তব্যে যুক্তি থাকিতে পারে; কিন্তু বিচ্ছিন্ন হইয়া যাওয়া পরিবারগুলির পুনর্মিলন প্রসঙ্গে এহেন বিষয় টানিয়া আনা কতখানি প্রাসঙ্গিক সেই প্রশ্ন থাকিয়াই যাইবে।
রাজনীতি রাজনীতির মত চলিবে। কিন্তু কোরিয়া উপদ্বীপে প্রায় সাত দশকব্যাপী অশান্তি নিরসন করিতে হইলে অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলিকে কেবল রাজনীতির দাবা খেলাতে জড়াইয়া থাকিলে কার্যসিদ্ধি হইবে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরিয়া বিচ্ছিন্ন হইয়া থাকা পরিবারগুলির আবেগ-অনুভূতি, ক্ষোভ-দুঃখগুলিকে যথাযথ সম্মান না দেখাইয়া কেবলমাত্র রাজনীতিক, অর্থনীতিক কিংবা নিরাপত্তা বিষয়ক ইস্যুগুলি লইয়া তত্পর হইয়া খুব একটা কূল-কিনারা পাওয়া যাইবে বলিয়া মনে হয় না।
