রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক লইয়া নূতন ভাবনা জরুরি

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২১:৫৯
রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির সার্বিক অবস্থা ভাল নহে বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি আরো বলিয়াছেন, পত্রিকায় এইসব ব্যাংকের খারাপ অবস্থার কথা লেখা হইতেছে বলিয়াই সংশ্লিষ্টদের সহিত বৈঠক করিয়াছেন। বৈঠকে এইসব ব্যাংকে আরো অর্থসুবিধা প্রদানের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত লওয়া হইয়াছে। অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তিতে ইহাই প্রতীয়মান হইতেছে যে, ক্রমেই খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাইতেছে ব্যাংকগুলি। ইহার নেপথ্যে কি কারণ রহিয়াছে, তাহা উদঘাটিত না করিয়া কেবল পুঁজি সরবরাহ করিলে পরিস্থিতির কখনো উন্নতি হইবে না। যদিও সরকারি ব্যাংকগুলিকে কোম্পানি করা হইয়াছে, সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইয়াছে, বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করিয়া বিপুল অর্থ ব্যয় করা হইয়াছে; কার্যত: এখন পর্যন্ত কোনটারই সুফল দেখিতে পাওয়া যাইতেছে না। বরং দেখা গিয়াছে, রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলিতে বাড়িয়াছে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের অঙ্ক। নানান অনিয়ম আর জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনাও নূতন নহে। সম্প্রতি রাষ্ট্রায়ত্ত চার বাণিজ্যিক ব্যাংক ও দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চেয়ারম্যানদের সহিত বৈঠক করিয়া অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানাইয়াছেন যে, ব্যাংকগুলির অবস্থা ভাল নহে। সেইখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ হইতে সার্বিক অবস্থাও তুলিয়া ধরা হয়। তাহাতে দেখা গিয়াছে, এইসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণ বাড়িয়াছে অস্বাভাবিক হারে। চলতি বত্সরের জুন শেষে ৬টি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়াইয়াছে ২৫ হাজার ৪০৫ কোটি টাকা। ইহাছাড়া বিভিন্ন অনিয়মের কারণে কয়েকটি ব্যাংক ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদ সংরক্ষণে ব্যর্থ হইয়াছে। ব্যাংকগুলির এই খারাপ অবস্থার কারণে দেশের রাজস্ব ও আর্থিক খাত ঝুঁকিতে পড়িয়াছে বলিয়া ইতিপূর্বে মন্তব্য করিয়াছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা সংস্থা (আইএমএফ)। কিন্তু দিনের পর দিন কেন এমন অবস্থা হইতেছে। অভিযোগ রহিয়াছে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ, বদলি-পদোন্নতিতে অনিয়ম স্বাভাবিক ব্যাপারে পরিণত হইয়াছে। পরিচালনা পরিষদ সদস্য নিয়োগেও যথাযোগ্য লোককে বাছাই করা যায় নাই। যাহার ফল হিসাবে বড় ধরনের কেলেংকারির ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে। ইহার পরও নীতিনির্ধারকদের টনক নড়ে নাই দেখিয়া সমালোচকরা বলিয়া থাকেন, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের ব্যাংকগুলি সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকদের সুবিধা দেয়ার জন্যই চালু রাখা হইয়াছে। স্বাধীনতার পর ব্যাংকগুলিকে জাতীয়করণ করা হইয়াছে। পরবর্তীতে বেসরকারি খাতেও যখন ব্যাংক ব্যবস্থা চালু করা হইয়াছে, তখন জনগণকে বাড়তি সেবা দেওয়ার জন্যই রাষ্ট্র নিজের কাছে কিছু ব্যাংক রাখিবার তাগিদ অনুভব করে। কিন্তু দেখা গিয়াছে, রাষ্ট্রের কাছে থাকিয়া যাওয়া এইসব ব্যাংক কেবলি লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হইয়াছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে, বিভিন্ন সময় দলীয় কিংবা গোষ্ঠীগত লোকদের সুবিধা দেওয়ার জন্যই যেন এই ব্যাংকগুলি পরিচালনা করা হইতেছে। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় থাকিবে, সেই সরকারই যেন তাদের নিজেদের লোকদের সুবিধা দিতে এই সব ব্যাংক ব্যবহার করিবে। আর এই নীতির কারণেই আমরা দেখি সমসময়ে বড় ধরনের কেলেংকারির ঘটনার পেছনে প্রভাবশালীদের হাত রহিয়াছে বলিয়া সংবাদ প্রকাশিত হয়। আর তাহাই যদি হয় তবে ব্যাংকগুলি কিভাবে ভাল করিয়া চলিবে। বরং ব্যাংকগুলির অবস্থা খারাপ হইবে, নূতন করিয়া সরকার অর্থ যোগান দিয়া যাইবে- ইহাই যেন নিয়মে পরিণত হইয়াছে। এইবারেও অর্থমন্ত্রী সেই কথাই বলিয়াছেন। তাহার মতে, ব্যাংকগুলিকে ৫ হাজার কোটি টাকার মত অর্থ যোগান দিতে হইবে। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক নয় যে, এইভাবে আর কতদিন চলিবে? জনগণের আমানতের টাকা কিংবা করের টাকা এই ভাবে নষ্ট হইতে দেওয়া যায় কি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আবশ্যিক এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলি লইয়া নূতন চিন্তা জরুরি বলিয়া আমরা মনে করিতেছি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন