চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করার উপায়

আপডেট : ২১ আগস্ট ২০১৩, ২২:০০
সেদিন ছিল ১২ অগাস্ট, খবরের কাগজগুলো হাতে নিতেই প্রথমে চোখে পড়ল প্রথম আলোর একটা সংবাদ শিরোনাম, ‘চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ নারী প্রকৌশলীর মৃত্যু।’ এরপর দেখলাম ইত্তেফাকে শিরোনাম দিয়েছে, চলন্ত ট্রেনে ঢিল, কেড়ে নিল নারী প্রকৌশলীর প্রাণ। সংবাদের বিবরণটা একটু পড়া মাত্র মনে হলো, আমার দেহ-মন দুটোই একেবারে থেতলে গেছে। চলবার শক্তি নেই। সিঁড়িতে বসেই কেবল ঐ সংবাদের বিবরণটা বিষণ্ন মন নিয়ে অতি কষ্টে পড়া হল। আমার ভাল লাগা অনেক শব্দের মধ্যে প্রীতি একটি সুন্দর শব্দ। শব্দের অর্থটাও সুন্দর। প্রীতি নামে আমার বেশ কয়েকজন অতি কাছের মানুষ আছেন। চেনা-অচেনা সকল প্রীতিই আমার মতে সুকন্যা। যে প্রীতি অকালে ঝরে গেল, সে যে মেধাবি ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এমফিল করছিল, যোগ্যতার লড়াইয়ে মেধার পরিচয় দিয়েছে। চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারা, এটাকে পৈশাচিক আর বর্বরতা ছাড়া আর কী বলা যায়। প্রীতি নামের প্রকৌশলীর মর্মান্তিক অকাল মৃত্যু সংবাদটি আমাকে অনেক দিন আগের একই রকম একটি দুর্ঘটনার কথা মনে করিয়ে দিলো, প্রায় এক যুগ আগের কথা আমরা গোটা পরিবার কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতে আনন্দে কাটিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে ঢাকায় ফিরছি। আমাদের দলটা বেশ বড়। ফিরছি চেয়ার কোচে। ছোটরা নানা রকম আনন্দ করছে, গল্প করছে। আমি আর আমার স্বামী ড: খান উপভোগ করছিলাম ওদের কথাবার্তা। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দের সাথে প্রহর গড়িয়ে যাচ্ছে। হঠাত্ বলা নেই কওয়া নেই একটা ভারি পাথরখণ্ড এসে আঘাত করলো আমার ছোট বোনের একমাত্র ছেলে ধ্রুবর মাথায়। ধ্রুবর বয়স তখন আট বছর। কম্পার্টমেন্টে হৈ চৈ পড়ে গেল। যাত্রীদের মধ্যে একজন ছিলেন সেনাবাহিনীর মেডিক্যাল কোরের। পরিচয় দিয়ে এগিয়ে এলেন সেবা দিতে। আমাদের কাছে থাকা ঔষধপত্র, ঠাণ্ডা পানি ফাষ্ট এইডের আর যা যা দেয়া যায় আমরা সব দিলাম। মিরাক্কেল ঘটনা হলো ধ্রুবর মাথাটা চৌচির হয়নি। এত বত্সর পর প্রীতির মৃত্যুর খবর জেনে বুঝতে পারছি, সেদিন আমরা প্রকৃতই বড় ধরনের বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছিলাম। চলন্ত ট্রেনে প্রস্তর নিক্ষেপ করা বন্ধ করতেই হবে। এ মর্মান্তিক প্রবণতার পেছনের কারণটি আগে বোঝা দরকার। এই ঘটনা প্রমাণ করলো কোন কোন মানুষ নামক অমানুষের অন্যের ক্ষতি করার বিকৃত মানসিকতা থাকে। এর মূল উত্পাটন করা প্রয়োজন। এর হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটাই মাত্র পথ দেখতে পাচ্ছি। তা হল কোমলমতি শিশুদের সুশিক্ষা দেয়া। তবেই তারা সৃজনশীল মেধাবি হবে। তারপর কিশোর বয়সে “ছাত্রনং অধ্যয়নং তপ;” শিরোধার্য করে লেখাপড়ায় মন দিতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ গ্রহণের পাশাপশি শিক্ষকদের সাথে দল বেঁধে বেড়াতে যাবে, ভ্রমণ একদিকে আনন্দের অন্যদিকে শিক্ষণীয় বিষয়, কবিতা আবৃত্তি করবে, গান গাইবে, ছবি আঁকবে, সাঁতার কাটবে, শহরে বসবাসকারী বন্ধুরা মাঝে মাঝে গ্রামে যাবে, এ পাড়া সে পাড়া ঘুরে বেড়াবে, প্রকৃতিকে ভালবাসতে শিখবে, সমবয়সীদের সাথে খেলাধূলা করবে, এসব কিছুই তাদের মনের দীনতা দূর করে সাহসী করবে, তারা সংস্কৃতমনা হবে। তাদের মস্তিষ্কে স্থান করে নেবে সকল ধরনের ইতিবাচক দিকগুলো। মানবিক গুণাগুণের বসবাস স্থায়ী হতে হবে তাদের অন্তরে। অন্যের ক্ষতি হয় এমন কাজ সে কখনও করবে না। কথায় কাজে ও চিন্তায় তাকে নির্মল হতেই হবে। সে যে মানুষ হয়ে গড়ে উঠার সোপানগুলো ধাপে ধাপে পেরিয়েছে। সেকি অন্যের অনিষ্ট করতে পারে? না কক্ষণো পারে না। দামাল-দুরন্তপনা এক জিনিস, তার সাথে থাকে দল বেঁধে আনন্দ-উল্লাস করা, হই-হুল্লোড় করা। দল বেঁধে পরোপকার করা। অন্যের ক্ষতি করার মানসিকতা সেখানে অনুপস্থিত থাকে। কৈশর যদি বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়, যৌবন হবে তার বাকি জীবন পাথেয় সঞ্চয়ের সময়। এই সময়ে অর্জিত গুণাবলী ধ্রুবতারার মত মনের মাঝে বসে বসে সুসময়ে-দুঃসময়ে তাকে পথ দেখাবে তার জাগ্রত বিবেক। আর ধীরে ধীরে একদিন তাকে তো মানুষ হতেই হবে। বর্তমান অবস্থায় শিশু-কিশোরদের সংগঠনগুলোকে স্কুলে এবং স্কুলের বাইরে কর্মকাণ্ড হিসেবে গুরুত্ব দেয়া ব্যতীত তাদের অন্তরের কাছাকাছি যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা আমি দেখতে পাচ্ছি না। এটাই আমার দৃঢ়বিশ্বাস শিশুদের সৃজনশীল, মননশীল, সংস্কৃতমনা ও সমব্যথী হয়ে গড়ে উঠার জন্য সকল প্রাইমারী স্কুলে ও হাই স্কুলে গার্ল গাইডস, বয়েজ স্কাউট বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কিশোর অপরাধ দমনেও এটি সহায়ক। প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়ার পাশাপাশি ইতিবাচক ক্যারিকুলাম স্কুলে ও এলাকায় সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা এখন খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। এতে কিশোরদের অপরাধ অনেকটাই দমন করা যেতে পারে। এই ব্যবস্থাকে সামাজিক আন্দোলন হিসাবে গণ্য করতে হবে। নাম কাওয়াস্তে নয়। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একেবারে বন্ধ হতেও পারে বলে আমার কেন যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছা জাগছে। আমাদের বুঝতে-জানতে হবে কেন কোন কোন দেশে এ ধরনের প্রবণতা প্রায় শূন্যের কোঠায়। এসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, সমাজে শুধু কথায় নয় কাজেও সবার জন্য সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সুশিক্ষা ছাড়া মনুষত্ব অর্জন সম্ভব নয়। নারী প্রকৌশলী প্রীতির আত্মার শান্তি কামনা করছি। লেখক :সমাজকর্মী [email protected]