[ রা জ নী তি ]

অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করতে হবে

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
সংসদ নির্বাচন নিয়ে সংকট ও উত্কণ্ঠা ক্রমেই বাড়ছে। একদিকে সাংবিধানিক সংকট, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাত। সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দুটি সংকটই মোকাবিলা করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকট মোকাবিলায় যে কোনো ধরনের ভুল সিদ্ধান্তে পুরো জাতিকে চরম মূল্য দেয়ার আশঙ্কাও কম নয়। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে বাংলাদেশে যে বিতর্ক চলছে তার মূলে যতটুকু রয়েছে যুক্তি তারচেয়ে বেশি রয়েছে আবেগ। এ ধরনের বিতর্ক নতুন নয়, অনাকাঙ্ক্ষিতও নয়। বাংলাদেশে গণতন্ত্র অনেক পুরাতন। আগে ছিল, তারপর উধাও হয়েছে, এখন আবার এসেছে। তা রক্ষার জন্যই নানাবিধ সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। গণতন্ত্র যখন বিপন্ন হয় তখন তা রক্ষার্থে নতুন নতুন পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এমনই এক সংকট মোকাবিলায়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণমূলক সিদ্ধান্তে তা সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কখনো দীর্ঘজীবী হয়নি, বিভিন্ন সময়ে তা সংকটের আবর্তে বন্দী হয়েছে। আর গণতন্ত্রের রাজনীতি রাজপথের আন্দোলনের খোরাক হিসেবেই কাজে লেগেছে সব সময়। এখন সরকার ও বিরোধী দল মুখোমুখি অবস্থানে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার প্রসঙ্গে। সরকার মনে করছে সাংবিধানিক গণতন্ত্র রক্ষায় সংবিধান মেনে না চলে উপায় নেই। সমপ্রতি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণাও করেছেন সংবিধানের বাইরে এক চুলও নড়া হবে না। সংবিধান মানলেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে। তবে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই সাংবিধানিক রীতি- নীতি মেনে চলার বিকল্প নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান কোনো অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ার সুযোগ সৃষ্টিতে সহায়ক হবে কিনা? যদিও বিশেষজ্ঞরা মতামত দিচ্ছেন সংবিধানের বিধানমতে অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় আসার সুযোগ নেই। কিন্তু এ কথাও মনে রাখতে হবে, সংবিধান মেনে কখনোই অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় আসে না। কাজেই সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই সংবিধান মেনে সামান্যতম কোনো সমঝোতাকেন্দ্রিক নির্বাচনমুখী হওয়াই যুক্তিসঙ্গত, নাকি আবেগের বশবর্তী হয়ে দেশ ও জাতিকে ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সংবিধানের ১২৩(৩) অনুচ্ছেদে (ক) উপধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ‘মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে।’ এক্ষেত্রে শর্তের কথা বলা হয়েছে যে, (ক) উপধারা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-ধারায় উল্লেখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত, সংসদ সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ সংবিধানের এই বিধানের কারণে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ বহাল রেখেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে। সংবিধান মোতাবেক নির্বাচন কমিশনও এই মেয়াদের অধীনে নির্বাচন আয়োজন করবে। ওই সময়ের মধ্যে সংসদ অধিবেশন হবে না। সংবিধানের ৫৭(৩) ধারায় বলা আছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদেও (সংবিধানে বর্ণিত) কোন কিছুই অযোগ্য করিবে না।’ তবে প্রধানমন্ত্রী নির্বাহী প্রধান হিসেবে রুটিনমাফিক কাজে ন্যস্ত থাকবেন। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে সংসদের অধিবেশন বসার ক্ষেত্রে ৬০ দিনের বেশি বিরতি থাকবে না বলে উল্লেখ আছে। নির্বাচনকালীন ৯০ দিনের ক্ষেত্রে এ বিধান প্রযোজ্য হবে না। তবে ওই সময়ে সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্বে থাকবেন। এমনকি আগের সংসদের মেয়াদ পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত নতুন সংসদেও নির্বাচিতদের শপথ গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সাংবিধানিক এসব বিধি-বিধানের মারপ্যাঁচে বিরোধী দল পা না ফেলে সোজাসুজি নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে অটল। বিরোধী দল এই সরকারের অধীনে অর্থাত্ কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে সরকারি দলও সংবিধানের বাইরে নতুন কোনো পদ্ধতিতে নির্বাচনে যাবে না বলে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এখন প্রধান দুই দলই নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে যার যার অবস্থানে হার্ডলাইনে। সরকার কোনোভাবেই সংবিধান সংশোধন করতে চাইছে না, অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি মানতে হলে সংবিধান সংশোধনের কোনো বিকল্প নেই। সংবিধানের ৫৬(৪) ও ৫৭(৩) অনুযায়ী অনির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন করার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার কারণে সংসদ ভেঙে গেলে যদি নির্বাচন নাও হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রিসভার দায়িত্ব পালন করে যেতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু কতদিন তারা ক্ষমতায় থাকবেন সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নেই। কাজেই সরকারি দলের ও বিরোধী দলের হার্ডলাইনের অবস্থানে গণতন্ত্রের যাত্রায় হুমকি হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন থেকে যায়। ইতিমধ্যেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ঘোষণা দিয়েছেন সমঝোতা না হলে সংঘাত অনিবার্য। আমরা বিগত এক বছরে দেশে চরম সংঘাতের পরিবেশ দেখেছি। এরচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করলে দেশ, জাতি ও জনগণ যে চরম সংকটের মুখোমুখি হবে সে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর যদি নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি অনিশ্চয়তা দেখা দেয় তাহলে সংঘাতের পরিমাণ আরো বশি বৃদ্ধি পাবে বলে আমার মনে হয়। সংঘাত নিরসনের অন্যতম উপায় হবে নির্বাচনমুখী পরিবেশ সৃষ্টি। এজন্য নির্বাচনমুখী সমঝোতা হতেই হবে। আর নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন সমঝোতামূলক পরিবেশ। আর সমঝোতা মানেই ছাড় দেয়ার মানসিকতা। প্রশ্ন হচ্ছে, কে ছাড় দিবে? সরকারি দল, নাকি বিরোধী দল অর্থাত্ আওয়ামী লীগ, না বিএনপি? গত ১৮ আগস্ট গণভবনে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী সংবিধান মোতাবেকই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে বলে পুনরায় ঘোষণা করেন। কোনো অসাংবিধানিক শক্তি যাতে ক্ষমতা দখল করতে না পারে সে বিষয়ে তিনি সতর্ক থাকার হুঁশিয়ারিও ব্যক্ত করেন। দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে যুক্তি উল্লেখ করেন। বর্তমান সরকারের প্রায় ৪ বছর ৮ মাস সময়ে ৫৭২৩টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এসব নির্বাচনে ৬৩৯৪১ জন জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন। কোনো নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য কারচুপির অভিযোগ উঠেনি। প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য যুক্তিসঙ্গত ও যথাযথ হিসেবেই উপস্থাপিত হয়েছে বলে মনে হয়। সমপ্রতি অনুষ্ঠিত পাঁচ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল নিশ্চয়ই কেউ ভুলে যায়নি। এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হলো, গণতান্ত্রিক সরকারেও জনগণের আস্থা রাখার যথেষ্ট সুযোগ হয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতার সময় খুবই কম। সংবিধানকেন্দ্রিক সমঝোতা কিংবা সংসদে আইন পাস করে আগামী ১২ সেপ্টেম্বর আহূত নবম সংসদের ১৯তম অধিবেশনে সংকট উত্তরণের সুযোগ রয়েছে। বিএনপি আগামী অধিবেশনে আলোচনার পরিবেশ তৈরির সুযোগ নিতে পারে। সরকারের উচিত হবে বিএনপিকে স্বাগত জানানো এবং গণতান্ত্রিক সহনশীল আচরণের মানসিকতা সৃষ্টি। গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষার্থে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধান থেকে মুছে ফেলা হয়। সংবিধানে বলা আছে যে, বাংলাদেশ হবে একটি গণতান্ত্রিক দেশ। যে বিধান সংবিধানে সংযোজন এবং পরবর্তীতে তা বিয়োজন করা হয় সেই বিধান আবার নতুন করে ভিন্ন আঙ্গিকে আনা কি সম্ভব? নাকি সংবিধান মোতাবেক গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সংবিধানে উল্লেখিত গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রচলন অর্থাত্ গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠান ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিধান অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের মতো বাংলাদেশেও তৈরি হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে আমরা ব্রিটেনের কথা বলতে পারি। সেখানে রেওয়াজ গড়ে উঠেছে যে, নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে ক্ষমতাসীন সরকার আপনা-আপনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে রূপ লাভ করে। এই সরকার নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এমন কোনো কাজ করে না বা করতে পারে না, যাতে ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে নিজের অনুকূলে তেমন সুবিধা নিতে পারে। কেবল দৈনন্দিন কাজ পরিচালনাই এই সরকারের কাজ। কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি কমনওয়েলথভুক্ত দেশে বহু আগেই এমন রেওয়াজ গড়ে উঠেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও অনেক সিনেটর অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য সিনেটরের ভূমিকা পালন করেন। ভারতের উদাহরণ না দিলেই নয়। নানা কারণে ভারতের রাজনীতির প্রসঙ্গ বাংলাদেশের রাজনীতির সাথে অতি প্রাসঙ্গিক। উপমহাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চায় ভারতের স্থান শীর্ষে। ভারতের সংবিধানে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বীকৃতি নেই। তবে সেখানেও সামপ্রতিককালে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অনেকটাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির বিধানের প্রসঙ্গ এসেছে। কিন্তু সেখানে কখনো কোনো প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী অপসারণনির্ভর নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি উঠেনি, যেমনটা বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় উঠেছে। আগামী ১৯তম জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সাংবিধানিকভাবে সমঝোতার সর্বশেষ অধিবেশন হতে পারে। সংবিধান মোতাবেক ২৫ জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা। সে হিসেবে আগামী ২৫ অক্টোবর ২০১৩ তারিখ থেকেই বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তীকালীন রূপরেখায় যাবে। সরকারি দল ও বিরোধী দলের সমঝোতামূলক সিদ্ধান্তের সময় ঘনিয়ে এসেছে। নিশ্চিত সংঘাত জেনে চুপ করে বসে না থেকে সঠিক সময়োপযোগী সিদ্ধান্তই দেশবাসীকে কল্যাণের পথ দেখাবে। কাজেই গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষা করতে গিয়ে কোনো অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক সম্ভাবনাকে গুরুত্বের সাথে মোকাবিলা করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় E-mail: [email protected]