ঐশী এবং সামাজিক বাস্তবতা

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০১৩, ২১:৩৪
বিপথ-গমন (Deviance) মানবাচরণ বা সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানী ডুর্খেইম (Durkheim) তাঁর anomie তত্ত্বে উল্লেখ করেন “সমাজে যদি তড়িত্ গতিতে পরিবর্তন সূচিত হয় তবে ব্যক্তি পুরানো মূল্যবোধের স্থলে নতুন কোন মূল্যবোধ অনুসরণ করবে তা বুঝতে না পেরে বিপথ-গমনের আচরণে তত্পর হয়।” পুরানো মূল্যবোধ যেমন আবেদন হারায়- আবার ব্যক্তিও জানে না সমাজ তার কাছে কোন ধরনের আচরণ আশা করে। এ অবস্থায় বিপথ-গমন পথ প্রশস্ত হয়। কোন কোন তাত্ত্বিক বলেন, বিপথ-গমন পুঁজিবাদী সমাজের ফসল। আজকের ঐশীও এর ব্যতিক্রম নয়। ১৮৫৭ সালে উপমহাদেশে বৃটিশরা আফিমের চাষ করে তা ইউরোপে নিয়ে যেত। স্থানীয় কৃষক-শ্রমিকদের একটি অংশ আফিমের চাষ করতে করতে আফিম সেবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে উপমহাদেশে মাদকের প্রচলন শুরু হয়। কালের বিবর্তনে মাদক একটি অন্যতম সমস্যায় পরিণত হয়েছে আজকের বাংলাদেশে। মাদকাসক্ত হয়ে কত মেধাবী তরুণ বিপথগামী হচ্ছে; কত পরিবার ভেঙ্গে যাচ্ছে; কত কর্মক্ষম প্রাণ ঝরে যাচ্ছে; কত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে- তার কোন ইয়াত্তা নেই। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, গত চার বছরে দেশে মাদক সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা এক লক্ষ ৩৮ হাজার ২১৫টি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, মাদকসেবীর ৮০ ভাগ তরুণ-যুবক; যাদের ৬১ ভাগই বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমেই মাদকাসক্ত হয়েছে। ঐশীও প্রাথমিকভাবে বন্ধু-বান্ধবের মাধ্যমে মাদকাসক্ত হয়েছে। অন্যান্য সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সালে এক লক্ষ ৩০ হাজার, ২০১০ সালে ৮ লক্ষ ১২ হাজার এবং ২০১১ সালে ১৪ লক্ষ ইয়াবা ধরা পড়ে। ধরা পড়া ইয়াবার বাইরে আরও কত মাদক দেশে ঢুকেছে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। মাদক শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি অবৈধ পথে আমদানির ফলে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রাও হারাচ্ছে দেশ। পুলিশের কর্মকর্তা হিসেবে সমাজে আইন-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব তাদের, ঐশীর ঘটনা থেকে তারা কি শিক্ষা নেবেন? পুলিশ কি দুই হাতে উপার্জনের কাছে অন্ধ হয়ে যাবে, নাকি তারা তাদের সন্তানেরা যে সমাজে বসবাস করে ও করবে সেই সমাজে সুস্থতা ফিরিয়ে আনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকবেন? আজ পরিবারিক, সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ সর্বত্রই হারিয়ে যেতে বসেছে। পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতার অসচেতনতা, আর্থ-সামাজিক ও বহুমাত্রিক কারণে ঐশীরা কখনও নিজেকে বিসর্জন (পদস্খলন), কখনও অন্যকে বিসর্জিত করার মত সিদ্ধান্ত নেয়। ঐশীর বয়স নিয়ে রিমান্ডে নেয়ার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হলেও ঐশী বা ঐশীর মত শিশু-কিশোরদের প্রতি পরিবার-সমাজ কি রকম আচরণ; তাদের মানসিক স্বাস্থ্য যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্ব না দিয়েই বিধি-নিষেধ আরোপ করেন; যা ফলপ্রসূ না হয়ে সম্পূর্ণরূপে হিতে বিপরীত হয়। ঐশীর মত দেশের অনেক ছেলে-মেয়েই এখন সিগারেট, গাঁজা, হেরোইন, প্যাথেড্রিন, অ্যালকোহল ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক সেবন করছে। অনেক তরুণ-কিশোরেরা সিগারেটকে একটি মাদক হিসেবে চিহ্নিত না করে নিজের স্মার্টনেস প্রকাশের জন্য প্রাথমিকভাবে সিগারেট নামক মাদকটি হাতে নেয়। তারপর ক্রমশ অন্য মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সামাজিক বাস্তবতায় তাদের নিয়ে পরিবার-সমাজ বিপদে রয়েছে। বহুমাত্রিক কারণে শিক্ষিত হলেও সঠিকভাবে মানুষ হিসেবে গড়ে উঠছে না। এক সময়ে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ইয়াবা সম্রাজ্ঞী পুষ্পিতা ও নিকিতাকে ঘিরে। সম্ভবত তখনই আমাদের দেশে ইয়াবার বহুল প্রচলন শুরু হয়। সেই সময় ইয়াবা সেবন ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে সঠিকভাবে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ইয়াবা নামক মাদক থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হত। কিভাবে কোমলমতি ছেলে-মেয়েদের হাতে অতিরিক্ত টাকা-পয়সা আসে; সে টাকা-পয়সা কোন খাতে ব্যয় হয়; পরিবার সেক্ষেত্রে চরম উদাসীন। মাদক এতটা সহজলভ্য কী করে হলো, কী করে তা এত ছোট ছেলে-মেয়েদের হাতে পৌঁছে, কেন টিনএজরা এত বেশি এর প্রতি ঝুঁকে পড়ছে। সমাজ ব্যবস্থায় এ অপরিকল্পিত পরিবর্তন ও বিবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গির দায় কে বহন করবে। আমাদের দেশে মা-বাবারা সন্তানদের বয়ঃসন্ধিক্ষণে তাদের কতটা সময় দেন, তাদের কতটা বুঝতে পারেন বা বোঝার চেষ্টা করেন, সেটি একটি বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকের বাস্তবতায়। উঠতি বয়সের ছেলে-মেয়েরা অভিভাবকের আর্থ-সামাজিক; নীতি-নৈতিকতা; মা-বাবার আয়ের উত্স; সততা-অসততার মাত্রাসমূহকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। মা-বাবারা যত বেশি সন্তানের দিকে নজর রাখবেন, তাদের আপন করে নেবেন, তাদেরকে সময় দেবেন, তত বেশি তারা ভালো থাকবে। সন্তানদের সাথে অধিকতর বন্ধুসুলভ আচরণ সমাজে প্রত্যক্ষ করা দুরূহ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ব্যবস্থা, পরিবার ও সামাজিক ব্যবস্থাপনায় এই বিষয়গুলো যথাযথ গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয় না। নৃবিজ্ঞান বা সমাজ বিজ্ঞানের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, আমাদের দেশে পরিবার, পরিবার কাঠামো, পারিবারিক বন্ধন, ক্রমশ নিম্নের দিকে ধাবিত হচ্ছে। আগের একান্নবর্তী পারিবারিক সংস্কৃতি আর নেই। শহরের পাশাপাশি গ্রামেও এ চিত্র গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। মনস্তাত্ত্বিক, পারিবারিক, শিশু বেড়ে ওঠার পরিবেশ এবং জেনেটিক কারণে মানুষের আচার-আচরণ পরিবর্তন হচ্ছে। আদর্শচ্যুতি এবং পারিবারিক শৃঙ্খলা শিথিল হয়ে পারিবারিক সংঘর্ষ-কলহ ও হত্যাকাণ্ড বেড়ে চলেছে। ডিভোর্সের সংখ্যা আনুপাতিকহারে শহর ও গ্রামে একই হারে বেড়ে চলেছে। এক ধরনের পারিবারিক অস্থিরতা বা পারিবারিক সমস্যার মধ্যে সমাজ ব্যবস্থা চলছে। নৃবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীদের এ সম্পর্কিত বিষয় গবেষণার মাধ্যমে পরিবার-সমাজ ও সংস্কৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। ঐশী যদি পূর্ব থেকেই সঠিক চিকিত্সা এবং কাউন্সিলিংয়ের সুযোগ পেত, তাহলে হয়তো এমন বিপর্যয় ঘটতো না। অভিভাবকরা তার অস্বাভাবিক বিষয়গুলোর প্রতি আরও গভীরভাবে খেয়াল রাখলে হয়তো এমন ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। পারিবারিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় থাকলে এরকম ঘটনা আমাদের দেখতে হতো না। মোবাইল, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপি, ইন্টারনেট ও বিদেশি-আকাশ সংস্কৃতির প্রতি কেন এত আসক্তি তা এ সময়ের ভাবনার বিষয়। সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষার অনেকটা অপরিকল্পিত প্রভাবে তরুণ সমাজ বিপথগামী হচ্ছে। দেশের সামাজিক-পারিপার্শ্বিক রীতি-নীতির মধ্যে অন্য দেশের সংস্কৃতি ধারণে বিপত্তি ঘটাটাই তো স্বাভাবিক। দেশীয় সংস্কৃতির উপর গুরুত্বারোপ, নৈতিক শিক্ষার ওপর জোরদার, ধর্মীয় রীতি-নীতির অনুসরণে সমাজ নিয়ন্ত্রণের উপায় (means of social control) প্রয়োগের মাধ্যমে পারিবারিক ও সামাজিক সমপ্রীতি বজায় রাখা সম্ভব। এখন সময় এসেছে নিজের জন্য, সমাজের জন্য, রাষ্ট্রের জন্য আরও সচেতন হবার। লেখক :বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ইমেইল ঃ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন