বিদ্যমান গণতন্ত্র লইয়া সুধী মহলের হতাশা

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪২
রাজধানীতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এক উপদেষ্টা বলিয়াছেন যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের খোলস আছে, প্রাণ নাই। গণতন্ত্রের নামে এইখানে চলিতেছে ‘নির্বাচিতদের স্বেচ্ছাচার’। বিদ্যমান গণতন্ত্র লইয়া সুধী মহলের এই হতাশা ও আক্ষেপ নূতন নহে। দীর্ঘদিন যাবত্ সুধী সমাজের কতিপয় সদস্য নানাভাবে এই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করিয়া আসিতেছেন। ইহাও সুবিদিত যে, তাহাদের মধ্যে সত্ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিদগ্ধ ব্যক্তি যেমন আছেন, তেমনি অসত্ উদ্দেশ্যতাড়িত সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির সংখ্যাও একেবারে নগণ্য নহে। বিদগ্ধজনের আলোচনা-সমালোচনা গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য হিতকর। ফলে সকল গণতান্ত্রিক সমাজেই তাহা বিশেষ প্রশ্রয় পাইয়া থাকে। তবে পরিকল্পিতভাবে গণতন্ত্র, রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের হেয় করার মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা কিংবা অগণতান্ত্রিক শক্তিকে ক্ষমতা গ্রহণে প্ররোচিত করার অশুভ প্রবণতাও যে আমাদের দেশে কম প্রবল নহে—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। এই রূঢ় বাস্তবতার কারণেই গণতন্ত্র কিংবা রাজনীতি প্রসঙ্গে বিভিন্ন সময়ে প্রদত্ত সুধীজনের বক্তব্যের ভিত্তি যতো জোরালোই হউক না কেন—জনমনে তাহা তেমন প্রভাব ফেলিতে পারে না। অন্যদিকে, যেই গণতন্ত্র ও রাজনীতির সমালোচনায় সুধীসমাজ মুখর, দেখা গিয়াছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাহারা নিজেরাও ইহার উর্ধ্বে নহেন। বরং তাহাদের মধ্যেও অসহিষ্ণুতা ও রাজনৈতিক বিভাজন এতোটাই প্রবল যে, খুব কম ক্ষেত্রেই তাহারা একমত হইতে পারেন। বলা হইয়াছে যে, বাংলাদেশে গণতন্ত্রের খোলস আছে, প্রাণ নাই। কথাটি অসত্য নহে। কিন্তু প্রশ্ন হইল, গণতন্ত্র ছিল কখন? গণতন্ত্র চর্চা দূরে থাকুক, তাহার পরিপূর্ণ অবয়বটি অবলোকন করার সুযোগও কি কখনো জুটিয়াছে এই জনপদের মানুষের ভাগ্যে? স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকের বাস্তবতা বিষয়ে কমবেশি সকলেই অবহিত। স্বাধীনতার আগের বাস্তবতাও কি ভিন্ন? ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হইয়া পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয়ের পূর্ব পর্যন্ত আমরা ছিলাম ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বেড়াজালে বন্দী। পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ মানুষের গণতন্ত্র চর্চার অবকাশই বা কোথায়? গণতন্ত্রের অঙ্গীকার ও আকাশচুম্বী প্রত্যাশা লইয়া যেই পাকিস্তানের যাত্রা শুরু হইয়াছিল—অচিরেই প্রাসাদ ষড়যন্ত্র ও সামরিক স্বৈরশাসন তাহাকে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলিয়াছিল। আর তাহার সর্বাপেক্ষা অসহায় শিকারে পরিণত হইতে হইয়াছিল এই জনপদের মানুষকে। ফলে সাতচল্লিশ হইতে একাত্তর অবধি দীর্ঘ দুই যুগ ধরিয়া এদেশের মানুষকে শুধু আন্দোলনই করিতে হইয়াছে—কখনো ভাষার জন্য, কখনো বা সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। বলা বাহুল্য, পাকিস্তানি শাসনামলেও বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়াছে সামরিক-বেসামরিক দুঃশাসনে। আর গণতন্ত্র সোনার হরিণের মতো অধরাই থাকিয়া গিয়াছে। স্বাধীনতার জন্য এদেশের মানুষ বিপুল ত্যাগ স্বীকার করিয়াছে। সেই স্বাধীনতারও অন্যতম প্রধান প্রেরণা ও অঙ্গীকার ছিল গণতন্ত্র। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হইলেও সত্য যে, স্বাধীনতাপরবর্তী গত চার দশকের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি সময় অতিবাহিত হইয়াছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সামরিক শাসনে। গণতন্ত্রে উত্তরণের চেষ্টা হইয়াছে সত্য, কিন্তু বারংবার তাহা মুখ থুবড়াইয়া পড়িয়াছে। সম্মুখীন হইয়াছে দৃশ্য-অদৃশ্য নানা বাধার। সেই বাধা কতোটা প্রবল তাহা অনুধাবনের জন্য শুধু একটি উদাহরণই যথেষ্ট— সেইটি হইল—বিশেষ ক্ষমতা আইন। এই আইনটির জন্য এখনও অনেকে রূঢ় ভাষায় বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করেন। অথচ বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ইতিমধ্যে প্রায় তিনযুগ অতিবাহিত হইয়া গিয়াছে। এই সময়ে তাঁহার ঘোর সমালোচকদের অনেকেই ক্ষমতাসীন হইয়াছেন। কিন্তু কেহই আইনটি বাতিল করেন নাই। অতএব, মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা যতো সহজ, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে তাহার যথাযথ অনুশীলন ততো সহজ নহে। অনেকে বিস্মৃত হন যে, গণতন্ত্র শ্লোগানের বিষয় নহে। বস্তুত গণতন্ত্র হইল শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ব্যবস্থা—যাহা একই সাথে নাগরিকদের সর্বপ্রকার ভীতি ও অনিশ্চয়তামুক্ত পরিবেশে নির্ভয়ে বাঁচার স্বাধীনতারও নিশ্চয়তা বিধান করে। আমরা যে ইহার কোনোটাই নিশ্চিত করিতে পারি নাই অদ্যাবধি তাহাতে সন্দেহ নাই। তবে ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, গণতন্ত্রের জন্য চারদশক মোটেও বেশি সময় নহে। অতএব, অধৈর্য কিংবা হতাশ হইবার কিছু নাই।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন