ইউরোপের অর্থনীতিতে সুবাতাস বহিতেছে। বিশ্বমন্দা পরিস্থিতিতে হিমশিম খাইতে থাকা দেশগুলির অর্থনীতি পুনরুদ্ধার হইয়া আগাইয়া যাইতেছে, ইহাই স্বল্পোন্নত দেশগুলির জন্য সুখবর। বিশেষ করিয়া যেই সব দেশ ইউরোপের বাজারে রফতানি করিয়া প্রচুর অর্থ আয় করিয়া থাকে। বাংলাদেশও এমন একটি দেশ।
উল্লেখ্য, আড়াই বত্সরেরও বেশি সময় ধরিয়া ইউরো জোনের সদস্য দেশগুলি ঋণ সমস্যায় ভুগিতেছিল। গ্রীসসহ কয়েকটি দেশের অবস্থা খুবই খারাপ হইয়াছিল। ঋণ ভারে জর্জরিত অর্থনীতি জনগণের কোনো কল্যাণ বহিয়া আনিতে পারিতেছিল না। কর্মজীবীরা চাকুরি হারাইতেছিল। এই সময় মজুরি কমিয়াছে। কমিয়াছে পেনশনও। সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গ্রীসকে ঋণ সংকট হইতে কাটাইয়া উঠিতে কষ্ট করিতে দেখিয়া তত্কালীন ফরাসী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি বলিয়াছিলেন, ‘ঋণগ্রস্ত গ্রীসকে ইউরো জোনে অন্তর্ভুক্ত করাটাই ভুল হইয়াছে’। বলা আবশ্যক যে, গ্রীস ২০০১ সালে ইউরো জোনে যোগ দিয়াছে। তখন দেশটির অর্থনীতি ইউরো জোনের অন্যান্য দেশের সহিত এক কাতারে চলিবার সামর্থ্য ছিল না। বিশ্ব তখন দুরন্ত প্রবৃদ্ধির মধ্যে আগাইতেছিল। এই প্রতিযোগিতায় ইউরোপ ছিল সবচাইতে আগাইয়া। ইউরো নিয়াও এক ধরনের ক্রেজ ছিল ইউরোপীয়ানদের মনে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও ইউরোপের সর্ববৃহত্ অর্থনীতি জার্মানী গড়ে প্রায় ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করিয়াছে। ইউরোপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ফ্রান্সও ধনাত্মক প্রবৃদ্ধি হার অর্জন অব্যাহত রাখিতে সক্ষম হইয়াছে। তাই এই দুইটি দেশ পরবর্তীতে ইইউ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ত্রাণকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকও যথাযথ সহযোগিতার মাধ্যমে ইউরো অঞ্চলকে সংকট হইতে বাহির করিয়া আনিবার উদ্যোগ লইয়াছিল। কেননা, ইউরো জোন ও ইইউ’র ঋণ সংকট হইতে উত্তরণ বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সহিত সম্পৃক্ত। ঋণ সমস্যা কাটিয়া গেলে সরকারি ব্যয় বাড়িবে। উত্পাদন, কর্মসংস্থান, জনগণের আয় ও চাহিদা বাড়িবে। তাহাতে বাড়িবে আমদানিও। রফতানিকারক দেশগুলিতেও প্রবৃদ্ধি বাড়িবে। পাশাপাশি বৃদ্ধি পাইবে বিশ্ব বাণিজ্য।
যাহা হউক, সেই প্রত্যাশাই এখন পূরণ হইতেছে। সচল হইতে শুরু করিয়াছে ইউরো জোনের অর্থনীতির চাকা। এই অঞ্চলের দেশগুলিতে চলতি আগস্টে ব্যবসায়িক কার্যক্রম গত ২৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ গতিতে অগ্রগতি লাভ করিয়াছে। অর্থনৈতিক তথ্য জরিপ ও বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান মার্কিটের তথ্যে দেখা গিয়াছে, ইউরো জোনের কম্পোজিট পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স (পিএমআই) বা শিল্প উত্পাদন ও সেবা খাত সংক্রান্ত সূচক ৫১ দশমিক ৭ পয়েন্টে উঠে এসেছে। যাহা জুলাই মাসে ছিল ৫০ দশমিক ৫ পয়েন্ট। ইউরো জোনের অর্থনীতির চাকা গতিশীল হইবার খবরে ইউরোপের স্টক মার্কেটেও ইতিবাচক ধারা শক্তিশালী হইয়াছে। ইউরোপের পুঁজিবাজারগুলিতেও বেশ চাঙ্গা ভাব বিরাজ করিতেছে। ইহার ফলে, রফতানিকারক দেশ হিসাবে বাংলাদেশেরও লাভবান হইবার যথেষ্ট সুযোগ রহিয়াছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাকের বৃহত্ বাজার ইউরোপ। একইভাবে আমেরিকাও বাংলাদেশের শীর্ষ রফতানিকারক দেশ। সেখানেও অর্থনীতি আগাইতেছে। নূতন নূতন কর্মসংস্থান হইতেছে। মানুষের আয় বাড়িতেছে। আয় বাড়িলে ভোগে ব্যয় বাড়িবে ইহাই স্বাভাবিক। সেই অর্থে আমাদের রফতানিও বাড়িবে। যাহা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়ক হইবে। তবে এই সুযোগকে ভালভাবে কাজে লাগাইতে আমাদের রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ জরুরি হইয়া পড়িয়াছে। শুধু সীমিত সংখ্যক পণ্য উত্পাদন না করিয়া বহুমুখীকরণ করিলে আয় যেমন বাড়িবে, তেমনি কর্মসংস্থানও বাড়িবে। যাহা অর্থনীতিকেও আগাইয়া নিবে।
