ঐশীর ঘটনা আমাদের সবার জন্য এক বড় সতর্ক বার্তা

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:২৭
আমরা নিশ্চিত করেই বলতে পারি পৃথিবীতে এখন সবচেয়ে দুঃখী মানুষ প্রিয় পিতা-মাতার খুনের দায়ে অভিযুক্ত মেয়ে ঐশীর নিকটতম আত্মীয় স্বজনেরা। যারা এই মেয়েটিকে কোলে পিঠে করে অপার আদর-স্নেহ দিয়ে মানুষ করেছেন। যাদের চোখের সামনে ঐশী তরতর করে বড় হয়েছে। সবারই নিশ্চিত প্রত্যাশা ছিল তাদের মেয়ে ঐশী একদিন আলো ছড়াবে তাদেরই চারপাশে। কিন্তু সেই ঐশী আজ পিতার সহকর্মীদের হাতে বন্দী, নিজ পিতা-মাতাকেই খুনের অভিযোগে। সত্যিই এ এক করুণ নির্মম ট্রাজিডি। সবার জীবনেই এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। স্বচ্ছল, শিক্ষিত পরিবারের কোনো আদরের মেয়ে নিজের মা এবং বাবাকেই খুন করতে পারে এমন ঘটনা রাজধানীতে নিকট অতীতে ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই। শুধু রাজধানী বলেও নয়, দেশের কোথাও ঘটেছে বলে প্রমাণ নেই। স্বভাবতই প্রিয় কন্যার হাতেই যখন পিতা-মাতার নৃশংস খুনের খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন নগরবাসী অবাক এবং বিস্মিত না হয়ে পারেনি। এরপর ঐশীর স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ, পুলিশের কাছে তার জবানবন্দী, খুনের লোমহর্ষক কাহিনী-সবকিছুই নগরবাসীকে এক নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করেছে বলেই সত্য। শুধু এই নয়, ঐশী আজ তাদের মতো তরুণীদের পরিবারের মাঝেই সন্দেহ আর আশংকার ঢেউ ছড়িয়ে দিয়েছে। সন্দেহ আর আশংকার মূল কারণ ঐশী যা কিছু করেছে তার সাথে অতিমাত্রায় মাদকাসক্ত হওয়ার ঘটনাই মূল। ঐশী মাদকাসক্ত ছিল এবং উচ্ছৃঙ্খলতা তাকে চরমভাবে পেয়ে বসেছিল। নিয়মিত মাদকসেবন এবং উচ্ছৃঙ্খলতার মিশেলে ঐশী শেষ পর্যন্ত হন্তারকে পরিণত হয় এবং নাটকীয় কায়দায় নিজ পিতামাতাকে হত্যা করে এক নিন্দিত চরিত্রে উপনীত হয়। ঐশীর ঘটনা আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থাকেই একটা বড্ড ঝাঁকুনি দিয়েছে এবং সমাজ ও পরিবারের একটি অংশের ভেতরটা ফাঁস করে দিয়েছে। আমাদের সামনে তাই এখন অনিবার্য প্রশ্ন-আমাদের প্রিয় কন্যাসন্তানেরা কেন একজন ঐশীতে পরিণত হচ্ছে। ঐশীর পারিবারিক পরিচয়ে বুঝা যায়, একেবারেই মধ্যবিত্ত এক পরিবারের প্রতিনিধি সে। মধ্যবিত্তের সুখ-দুঃখের মাঝেই তার জন্ম। কিন্তু ঐশীর জীবনের সুন্দর পথের বাঁক বদলে যায় নেশাগ্রস্ত বা মাদকাসক্ত হওয়ার কারণেই। স্কুলের গণ্ডি পেরুনোর আগেই ঐশী নিজেকে মাদকের মাঝে ডুবিয়ে ফেলেন। স্বভাবতই ঐশীর শ্বেতশুভ্র আকাশ থেকে সরে যায় সব স্বপ্ন। অন্ধকারের মাঝে নিজেকে ডুবিয়ে নিজের জীবনকে সে নিজেই দ্রুত বিপদাপন্ন করে তোলে। আর সেই বিপদাপন্নতা এতোটাই তীব্র হয়ে উঠে যে, মরণ নেশা তাকে দাঁড় করিয়ে দেয় অভিভাবকের মুখোমুখি। পত্রিকা পড়ে বুঝেছি—মা-বাবা মেয়েটিকে ভালো পথে, সুস্থ সুন্দর পথে আনার জন্যে ক্লান্তিহীন চেষ্টা করেছেন কিন্তু পারেননি। মেয়ে যখন যা আব্দার করেছে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সবই বিফলে গেছে। বুঝা যায়, মায়ের বড় বেশি অভিমান ছিল মেয়ের ওপর। হবে না কেন? যখন চারপাশের মেয়েরা ভালো রেজাল্ট করছে, জিপিএ পেয়ে উল্লাস করছে তখন নিজ মেয়ের দৈন্য অবস্থা দেখে মায়ের বুক ভরা অভিমানতো থাকাই স্বাভাবিক। তবে ঐশীর এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, ঘরে ঘরে নীরবে-নিভৃতে আরো অনেক ঐশী তৈরি হচ্ছে। আইনের দৃষ্টিতে ঐশী ভীষণরকম অপরাধী। আইনই বলে দেবে সামনে ঐশীর জীবনের পরিসমাপ্তি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে। আইনগত বাধ্যবাধকতার মধ্যে তাকে থাকতেই হবে। কিন্তু ঐশীরা কেন বিপদাপন্ন হচ্ছে, খুনী হয়ে পিতা-মাতাকে খুন করছে—এর দায় কী শুধুই ঐশীদের সে প্রশ্নও এখন অণিবার্য। যে সমাজ প্রক্রিয়ায় ঐশীরা তৈরি হচ্ছে সেই প্রক্রিয়া কী রাষ্ট্রযন্ত্র বন্ধ করতে পারছে? এটি পরিষ্কার যে ঐশী যা কিছু করেছে সেটা তার অতিরিক্ত মাদকাসক্ত হওয়ার কারণেই। মাদক তাকে এতোটাই গ্রাস করেছিল যে, ঐশী জীবনের সুন্দর পথ আগেই হারিয়ে অন্ধকার পথে পা বাড়িয়েছিল। সেই পথকে তাই তার ফিরিয়ে আনার সাধ্য আর কারো ছিল না। আর এ কারণেই নিজ পিতামাতাকেই নিজের কাছে ঐশী এক নম্বর শত্রু হিসেবে পরিগণিত করেছিল। ঐশীদের জীবন বড় বিপদাপন্ন করে তুলেছে মাদক-ই। আজ মরণনেশা সব হাতের কাছেই। আর উত্সুক তরুণ-তরুণী নানাভাবেই এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। উচ্চবিত্ত পরিবারের তরুণ-তরুণীদের মাঝে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। নামী দামী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের তরুণ-তরুণীদের একটা অংশ যে শখ বা দুঃখের বশেই হোক, কিংবা আভিজাত্যের কারণেই হোক মাদকাসক্তের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। দেশের নামি-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের কাছে ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক পাওয়া যায় এমন অভিযোগ অমূলক নয়। ঐশী মাদকাসক্ত হওয়ার পেছনেও আমরা এরকম ঘটনার সম্পৃক্ততা দেখতে পাই। তবে এটা সত্য মাদক আমাদের বড় অংশের তরুণ-তরুণীদের জীবনকে ভীষণরকম বিষিয়ে তুলছে। মাদকের প্রসার এবং মাদকাসক্তের হার যে অনেক অনেক বেড়েছে তার প্রমাণ ঢাকা শহরে এখন প্রচুর সংখ্যক মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র গড়ে উঠা। অনেক মাদকাসক্ত কেন্দ্রে গিয়ে দেখেছি স্বচ্ছল পরিবারের অভিভাবকেরা বসে বসে কাঁদছেন। ছেলে বা মেয়ের নিরাময় প্রার্থনা করে কেন্দ্রের পরিচালক বা সমন্বয়কারীর হাত-পা পর্যন্ত ধরছেন। কিছুদিন আগে সোশাল মিডিয়া মারফতে জানলাম জনপ্রিয় মডেল শ্রাবস্তী দত্ত তিন্নির দুরাবস্থার কথা। মাদক-ই এই সদা হাস্যোজ্জ্বল মুগ্ধ মোহনীয় চেহারার মেয়েটির জীবনের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। মিষ্টি মেয়ে তিন্নিকে সেই আগের চেহারায় চেনা যায় না। তিন্নির চেহারা দেখে ভক্তরা অনেকেই চোখের জল ফেলেছেন। যদ্দুর শুনেছি তিন্নির উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা পিতা মেয়েকে সুস্থ সুন্দর পথে আনার জন্যে শত চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার সবচেষ্টাই ব্যর্থতায় পরিণত হয়েছে। আসলে সমাজের ভেতরে হাত বাড়ালে এরকম অজস ঘটনার সন্ধান পাওয়া যাবে। অজস ঐশী, তিন্নি আজ মারাত্মকরকম বিপদাক্রান্ত, বিপদাপন্ন। মোহাম্মদপুর রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের বর্তমান প্রিন্সিপ্যাল ব্রিগেডিয়ার মুসলেহউদ্দীন আহমেদ। সেনাবাহিনীর মানুষ হলেও ভদ্রলোক বিনয়ী বন্ধুবত্সল। আবেগের চেয়ে যুক্তি দিয়ে কথা বলতে ভালোবাসেন। শুনেছি গতবছর স্কুলে অভিভাবকদের এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, আপনারা শুধু ছেলেমেয়েদের রেজাল্ট নিয়ে বেশি চিন্তা করেন। কিন্তু রেজাল্টের চেয়েও জরুরি বিষয় আপনার ছেলেটি সুস্থ পথে আছে কিনা, সে নেশাাসক্ত হয়ে পড়লো কিনা, খারাপ বন্ধুদের সাথে মেলামেশা করছে কিনা—এ সব বিষয়ে বেশি সতর্ক থাকা। তিনি আরো বলছিলেন একটি ছেলে খারাপ হয় যদি তার বন্ধুরা খারাপ হয়। আর কেউ তাকে খারাপ করতে পারবে না। সুতরাং স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পর ছেলেটি কোথায় যায়, কার সাথে মেলামেশা করে এ বিষয়ে খেয়াল রাখতে হবে। রেজাল্ট কমবেশি ভালো খারাপ করলে সেটা নিয়ে মন খারাপ করবেন না। প্রিন্সিপ্যাল ব্রিগেডিয়ার মুসলেহউদ্দীন আহমেদ-এর এই বক্তব্য আমি বিশ্বাস করি। ভালো ফলাফলের জন্যে অহেতুক চাপ প্রয়োগ না করে সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যত্ নির্মাণে পারিবারিক সতর্কতা বৃদ্ধি করা দরকার। আমাদের অনেকেই নাগরিক জীবনের নানা ব্যস্ততায় সংসার ও সামাজিক জীবন ভুলে যান। ছেলে-মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কোন বন্ধুদের সাথে মিশছে সে খবর রাখেন না। কিন্তু সেই পুরনো প্রবাদই সত্য ‘সত্ সঙ্গ স্বর্গবাস, অসত্ সঙ্গ সর্বনাশ’। ঐশীর ঘটনাও প্রমাণ করছে মাদক আর অসত্ সঙ্গ তাকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে। তার জীবনকে কতোটা বিপন্ন ও বিষাদময় করেছে। সবশেষে ঐশীর প্রতি ঘৃণা নয়, মমত্ব নিয়ে বলবো-মেয়েটির যে পরিণাম রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার কেউই সে দায় এড়াতে পারে না সত্য তেমনি খুন হয়েও সে দায় রেখে গেলেন তার মা-বাবাও। জীবন চলার পথে শত ভুল মা-বাবারও ছিল। আর শত ভুল, অজ্ঞতা, অবজ্ঞা ছিল বলেই এক চরম নির্মমতার কাছে তাদের পরাস্ত হতে হয়। পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন না করায় নিজ পরিবারের মাঝেই তাই নিজেরা নিরাপত্তাহীন হয়ে উঠে। তবে ব্যক্তিগত কোনো ঘটনায় রাষ্ট্রের দায়ের চেয়ে পরিবারের দায়-ই বড় আকারে দেখা হয়। আবারও বলছি ঐশীর ঘটনায় রাষ্ট্র কাঁদবে না। সারাজীবন যেমন কাঁদবে ঐশীর পরিবার তেমনি এ কলঙ্কতিলকও বয়ে বেড়াতে হবে তাদেরকেই। ঐশীর ঘটনা আমাদের সবার জন্য এক বড় সতর্ক বার্তা। আসুন, জীবনের নানা ব্যস্ততার মাঝেও সন্তানসন্ততিকে সময় দিই। পরম যত্ন আর স্নেহ মমতায় ওদেরকে কাছে রাখি। এখানে-ওখানে বেড়াতে নিয়ে যায়। খেয়াল রাখি ও কোথায় কার সাথে বেড়াচ্ছে। আজেবাজে বন্ধুদের কাছ থেকে দূরে রাখি। পরিবারের মাঝেই একটা নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলি। ঐশীর ঘটনায় আমি বুঝেছি-সন্তান আমার, দায়িত্বও আমার। এখানে রাষ্ট্রের ওপর বিমুখ হয়ে নিজের নিরাপত্তা কাম্য করা অনর্থক। রাষ্ট্রকে আমরা যত গালি দিই কাজে আসবে না। নিজের সমস্যা নিজেকেই বুঝতে হবে এবং সমাধান করতে হবে। সবশেষে বলবো-ঐশীর ঘটনায় আমরা যেনো সত্যিই নিজ নিজ সতর্কতা অবলম্বন করি। সন্তান ভুল পথে গেলে রাষ্ট্র নয়, চোখের পানি ঝরবে ক্ষতিগ্রস্তদেরই। ঐশীকে মমতার চোখে দেখে আমরা আরো সতর্ক হই। লেখক :চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন