আমরা মাদকের সাগরে ভাসিতেছি বলা যায়। হাত বাড়াইলে মাদক, কাগজ খুলিলেই কিছুদিন পর পরই দেখিতে পাই মাদকের কারণে খুন। ঐশীর ঘটনার রেশ প্রচ্ছন্ন থাকিতেই মাদক ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির অপরাধে খুন হইয়াছেন রামপুরার শ্রমিক লীগ নেতা মোক্তার হোসেন। পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তে মনে করিতেছেন, রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় মাদক ব্যবসায় বাধা সৃষ্টির কারণেই সংঘবদ্ধ ব্যবসায়ী চক্রের হাতে নিহত হইয়াছেন মোক্তার হোসেন।
কোনো দেশই মাদকের বিষবায়ু হইতে মুক্ত নহে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মাদকদ্রব্য ঠিকই সকল নিষেধ-বারনের ফাঁক গলিয়া আসন পাতে নেশাখোরদের করতলে। বিশ্বের অনেক দেশ তাহার তরুণ জনগোষ্ঠীকে মাদকের মাদকতা হইতে রক্ষা করিতে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করিয়া থাকে। সকল দেশেই মাদকের শিকার হয় সিংহভাগ তরুণ বয়সী ছেলেমেয়ে। আমাদের দেশের অনেক স্কুলপড়ুয়ারাও এখন ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিলে আসক্ত হইয়া পড়িয়াছে। এমনও দেখা গিয়াছে টিফিনের টাকা একত্র করিয়া সহপাঠীরা মিলিয়া-মিশিয়া হেরোইন-ইয়াবা সেবন করিতেছে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হইল মাদকের সহজলভ্যতা। একশ্রেণীর অর্থপিশাচ ব্যবসায়ী বিভিন্ন ব্যবসার আড়ালে চালাইয়া যান নানা মাদকের কারবার। নিম্নস্তর পর্যন্ত তাহাদের ছড়াইয়া রহিয়াছে অসংখ্য এজেন্ট। নানা হাত বদলের মাধ্যমে বহু মানুষ তাহাদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান খাত হিসাবে এই মাদক ব্যবসাকে আশ্রয় করিয়াছেন। দিন দিন তাহা রমরমা হইয়া উঠিতেছে। রাজধানীর অসংখ্য পয়েন্ট ছাড়াও দেশের প্রায় প্রতিটি শহর-বন্দর-গঞ্জে হাত বাড়াইলেই পাওয়া যাইতেছে চোলাই মদ, গাঁজা, ইয়াবা, ইনজেকশন, হিরোইন, আফিমসহ বিভিন্ন মাদক। এমনকি এখন উপজেলা পর্যায়েও একাধিক পয়েন্টে চলে মাদকের কেনাবেচা।
মাদকের এই ভয়াল বিস্তৃতিতে আমাদের তারুণ্য, মেধা, বিবেক, লেখাপড়া, মনুষ্যত্ব—সবকিছু ধ্বংস হইতেছে। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত মাত্র এক বত্সরের পরিসংখ্যান আমাদের চমকাইয়া দেয়। মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মা, ঘনিষ্ঠ স্বজন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হইতেছেন, নেশাখোর পিতা মাদক সংগ্রহে ব্যর্থ হওয়ার ক্রোধে নিজ সন্তানকে খুন করিয়াছে অবলীলায়। নেশার টাকা না পাইয়া স্ত্রীকে আগুনে পুড়াইয়া মারা, মাকে জবাই করা, আদরের সন্তানকে বিক্রি করিয়া দেওয়ার মতো মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটিতেছে আকছার। বিগত মাত্র এক বত্সরের ব্যবধানে নেশাখোর ছেলেদের হাতে অন্তত ২৭ জন পিতা-মাতা নৃশংসভাবে খুন হইয়াছেন। একই সময়ে মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ গিয়াছে ১৬ জন নারীর। অর্থাত্ মাদকের মূল্য শুধু তাহা ক্রয় করিবার টাকাতে নহে মাত্র। আরও অধিক চড়া মূল্য মাদক আমাদের নিকট হইতে ছিনাইয়া লইতেছে। তাহা বিনষ্ট করিয়া দিতেছে পরিবারের স্নেহ-মায়া, ভালোবাসার বন্ধন। পরিতাপের বিষয় হইল, এই সকল অপরাধের মূল সূত্র চিহ্নিত হওয়া সত্ত্বেও মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের উদ্যোগ লইয়া কিছু প্রশ্ন থাকিয়া যায় সকল সময়। বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া আমরা দেখিয়া আসিতেছি পুলিশ, র্যাব, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মাঝেমধ্যে অভিযান চালাইয়াছে। এইভাবে একাধারে অভিযানও যেমন চলে তেমনি মাদকের কেনাবেচাও চলে পাল্লা দিয়া, অভিযান বেশি হইলে নানা হাত বদল হইয়া বাড়িয়া যায় মাদকের দাম । অর্থাত্ মাদক কখনই দুষ্প্রাপ্য হয় না।
অনেক সময় মাদকসেবীরা ভুল করিয়া বিপথগামী হইলেও তাহা হইতে ফিরিয়া আসিবার পথ খুঁজিয়া পায় না। এই সমাজ ও পরিবার আমাদের নাগরিকদের যে পরিবেশ দিয়াছে, চারিদিকে যাহা দেখিতেছি নবীন তরুণরা, তাহাদের কোমল মন তাহা হইতেই শিক্ষা লইতেছে। তাই উচ্চবিত্ত মধ্যবিত্ত এমনকি বস্তির শিশুরাও তাহাদের মতো করিয়া নেশা করে। প্লাস্টিক ফুলিয়ে আঠা ও কালি মোচনের রাসায়নিক পদার্থও (হোয়াইট ফ্লুইড) শুকিয়া শুকিয়া বস্তির বালক কিশোরদের আমরা হরহামেশাই নেশা করিতে দেখি চক্ষের সম্মুখে। এই সকল শিশু কি জানে মাদকের ক্ষতিকারক দিক? শিশু-কিশোররা তো মাটির দলা, যেইভাবে পরিবার-সমাজ-রাষ্ট্র তাহাদের গড়িয়া উঠিবার পরিবেশ দিয়াছে তাহারা তাহাই হইতেছে। সুতরাং এই দায় সকলের।
