[ প্র কৃ তি ]

সুন্দরবন ধ্বংস করে বাঘ বাঁচানো যাবে কি?

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০১৩, ২১:৪৮
আমাদের দেশ বিশ্ব দরবারে খ্যাত কিসের জন্য? ছোট বেলায়ও এ প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতো। তখন থেকেই এর জবাব জেনেছি। এদেশ বিশ্বখ্যাত প্রথমতঃ ‘সোনালী আঁশ’ বলে পরিচিত উন্নত পাটের জন্য। দ্বিতীয়তঃ তার খ্যাতি সুন্দরবনের ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগারের’ জন্য। ডোরা কাটা বিশাল আকৃতির এই ‘রয়েল বেঙ্গল টাইগার’ যেমন হিংস্র-ভয়ঙ্কর প্রকৃতির, তেমনি আবার তা অনিন্দ্য সুন্দরও বটে। দেশের নামে বাঘ। সেই বাঘ দিয়েই অনেকটা পরিমাণে বিশ্বময় দেশের পরিচয়। বাঘ নিয়ে এখন বিশ্বব্যাপী তোলপাড় চলছে। বাঘের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কারণ, বন-জঙ্গল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। শিকারীরা ব্যবসা করার লোভে নির্বিচারে বাঘ হত্যা করছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই বাঘ একটি বিরল প্রজাতির প্রাণী হতে হতে একসময় লুপ্ত হয়ে যাবে। এই পরিণতি রোধের জন্য আন্দোলন ও জনমত গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে গত ৪/৫ বছর ধরে দেশে-দেশে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালিত হচ্ছে। গত ২৯ জুলাই বাংলাদেশেও হৈ-চৈ করে ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’ পালন করা হলো। ঢাকা ও খুলনাতে বর্ণাঢ্য র্যালি ও পদযাত্রা হলো। আলোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হলো। এসব অনুষ্ঠানের খবরা-খবর গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হলো। এবার দিবসটির মূল শ্লোগানটিও ছিল খুবই আকর্ষণীয় ও হূদয়স্পর্শী—‘বাঘ বাঁচান, মায়ের মতো সুন্দরবনকে রক্ষা করুন’। বাঘ বাঁচাতে হলে সুন্দরবনকে যে রক্ষা করতে হবে তার স্বীকৃতি এই শ্লোগানে রয়েছে। কিন্তু তাতে আশ্বস্ত হওয়া যায় কি? বাঘের আবাস সুন্দরবন রক্ষা হবে কি? বাঘ বাঁচানো যাবে কি? সুন্দরবন হলো প্রকৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এর অভাবনীয় সৌন্দর্য্য ও অভিনবত্বের বিবরণ বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার ক্যাম্পেইনে আমরা কিছুদিন আগেও কম শক্তি ব্যয় করিনি। অল্প কিছু ভোটের জন্য সুন্দরবন বিশ্বের সেরা সাতটি অবাক করা প্রাকৃতিক স্থানের মাঝে তার জায়গা করে নিতে পারেনি। যে সুন্দরবন নিয়ে আমাদের এতো গর্ব তার গায়ে আঁচড় লাগার কোনো আশংকা দেশবাসীকে, এবং সেই সাথে বিশ্ববাসীকেও বিচলিত না করে পারে না। প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ অনিন্দ্যসুন্দর সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বিশাল আকারের কয়লা চালিত তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণের তত্পরতা সেরূপ আশংকারই জন্ম দিয়েছে। ‘বিশ্ব বাঘ দিবসে’ সরকারের আচরণ ও কথাবার্তায় ‘গাছের আগা কেটে গোড়ায় পানি ঢালা’ এবং ‘গরু মেরে জুতা দান’ প্রবচন দু’টির কথা মনে পড়ে যায়। বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় সুন্দরবনের মাত্র কয়েক কিলোমিটার দুরে ১৮৩০ একর ধানি জমিতে ১৩২০ মেগাওয়াট উত্পাদন ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সাথে চুক্তি করেছে। এটি প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প। অনুরূপ পরিমাপের আরেকটি জমজ প্রকল্প দ্বিতীয় পর্যায়ে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ন্যাশনাল থারমাল পাওয়ার কোম্পানি (NTPC) ও বাংলাদেশ বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ড (PDB)-এই দুই পক্ষ ইতোমধ্যে এবিষয়ে চুক্তির দলিল-পত্র স্বাক্ষর করেছে। প্রকল্প এলাকায় ধানি জমি বরবাদ হওয়া, জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা থেকে অনেক কৃষকের উচ্ছেদ হওয়া, বিশাল যান্ত্রিক প্রকল্পের ব্যবস্থাপনার অনেকটা স্বাভাবিক পরিণতিতে এলাকা জুড়ে দীর্ঘ দিনের প্রশান্ত সমাজ বাস্তবতায় লণ্ডভণ্ড করে দেয়া আধুনিকতার আকস্মিক তাণ্ডবের আবির্ভাব ইত্যাদি এই প্রকল্পের ভালোমন্দ হিসেব করার ক্ষেত্রে খুবই গুরুতর বিবেচনার বিষয়। তাছাড়া দু’দেশের এই যৌথ প্রকল্পে অর্থের জোগান কে দিবে, কয়লা জোগাড়ের দায়িত্ব কার হবে, উত্পাদন বন্ধ থাকলে ক্ষতির দায় কে নিবে, কে কি দামে কয়লার যোগান দিবে, কে কি দামে উত্পাদিত বিদ্যুত্ কিনবে, কারা কি হারের সুদে ব্যাংকঋণ সরবরাহ করবে, খরচের স্ফীত হিসাব প্রস্তুতের পথ বন্ধের জন্য কি ব্যবস্থা থাকবে, হিসাব পত্রে শেষ পর্যন্ত আদৌ কোনো নিট লাভ দেখানো সম্ভব হবে কি না, নিট লাভের ভাগাভাগি কি ভাবে হবে—এসব আর্থিক বিষয়গুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের ‘বড়’ অর্থনীতির প্রভাবের মুখে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে বহুলাংশে পদপিষ্ট করে চুক্তির শর্ত নির্ধারণ করা হলে তা ঠেকাবে কে? এসব বিষয়ে বহু গুরুতর কথা রয়েছে। কিন্তু আজকের নিবন্ধে সেসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। এই নিবন্ধে শুধু বাঘ ও তার আবাসস্থল সুন্দরবনের ওপর রামপালের কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের বিধ্বংসী প্রভাব সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের হিসেব মতে, পরিকল্পিত রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের মতো একটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমাণ বায়ুদূষণকারী উপাদান আশেপাশে ছড়িয়ে পড়বে। এক বছরে এসব দূষণ পদার্থের ধরন ও পরিমাণ হবে নিম্নরূপ: (১) ৮৪.৫ লক্ষ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড। এই পরিমাণ ৪২ কোটি গাছ কেটে ফেলার কারণে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোধন বন্ধ হওয়ার পরিমাণের সমান। (২) ৯৭.৫ হাজার টন সালফার-ডাই-অক্সাইড যা এসিড-রেইনের ক্ষতিকর উপাদান হিসেবে বিপর্যয় সৃষ্টি করে। তাছাড়া সালফার-ডাই-অক্সাইড বাতাসে ক্ষুদ্র কণিকার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে যা ফুসফুস ও হূদপিণ্ডের সমূহ ক্ষতি সাধন করে থাকে। (৩) প্রায় ২৭ হাজার টন নাইট্রোজেন-অক্সাইড। এই গ্যাস ফুসফুসের টিস্যুর ক্ষতি করে থাকে যার ফলে শ্বাসতন্ত্র নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। (৪) ১,৩২২ টন ক্ষুদ্র কণিকা। এগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার ফলে ব্রংকাইটিস এবং ফুসফুসের অন্যান্য রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়। (৫) ১,৯০০ টন বিষাক্ত কার্বন-মনো-অক্সাইড গ্যাস। বাতাসে এই গ্যাসের পরিমাণ মাত্রা ছাড়িয়ে গেলে তা মৃত্যুর কারণ হয়। (৬) প্রায় ৪৫০ পাউন্ড পারদ। ২৫ একর আয়তনের একটি পুকুরে এক চা-চামচের ৭০ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ পারদের মিশ্রণ ঘটলে সেই পুকুরের মাছ বিষাক্ত হয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে। পারদ ব্রেন ড্যামেজ ও স্নায়ুতন্ত্রের নানান রোগের জন্ম দেয়। (৭) ৫৯৪ পাউন্ড বিষাক্ত আর্সেনিক। আর্সেনিক একটি মারাত্মক বিষ। এর অতি সামান্য পরিমাণের ফলে আর্সেনিকোসিস ও ক্যান্সার রোগের বিস্তার ঘটে। (৮) ৩০১ পাউন্ড সীসা, ১০.৫ পাউন্ড ক্যাডমিয়াম ও বিভিন্ন পরিমাণের অন্যান্য ভারি ধাতু। এসবই পরিবেশ ও মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এতক্ষণ বায়ুমণ্ডলের দূষণের হিসেব তুলে ধরা হলো। এ ছাড়াও কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র থেকে বিপুল পরিমান কঠিন ও তরল বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এসবের মধ্যে প্রধান হলো (ক) কয়লা ধোয়ার পর পানির সাথে মিশে তৈরি হওয়া তরল কয়লা বর্জ্য (খ) কয়লা পোড়ার ফলে তৈরি হওয়া ছাই, যাকে ‘ফ্লাই অ্যাশ’ বলা হয়ে থাকে। এসব তরল ও কঠিন বর্জ্য খুবই বিষাক্ত। কারণ এসবের মধ্যে আর্সেনিক, পারদ, ক্রোমিয়াম এবং এমনকি তেজস্ক্রিয় ইউরেনিয়াম ও থোরিয়াম ইত্যাদি ঘণীভূত পরিমাণে উপস্থিত থাকে। ছাই বা ফ্লাই অ্যাশকে অ্যাশ পন্ডে বা ছাইয়ের পুকুরে গাদা করে রাখতে হয়। রামপালের প্ল্যান্টের মতো ১,৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ উত্পাদনের ক্ষমতা সম্পন্ন একটি কারখানায় বছরে ৩ লক্ষ টনের বেশি ছাই তৈরি হবে। সতর্কতা সত্ত্বেও এই বিপুল পরিমাণ ছাইয়ের অনেকটাই বাতাসে উড়ে গিয়ে বায়ু দূষণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিবে এবং ছাই ধোয়া বৃষ্টির পানি চুইয়ে মাটিতে ও নদীতে মিশে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে উঠবে। এরূপ আয়তনের একটি কারখানা থেকে বছরে ৫ লক্ষ টনের বেশি তরল বর্জ্য তৈরি হবে। এই তরল বর্জ্যকে উপযুক্ত ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে দূষণমুক্ত করার চেষ্টা করা হলেও তা বেশ দুরূহ কাজ। তরল বর্জ্য থেকেও দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে। কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রে জন্ম নেয়া দূষণের উপাদানগুলো ভূপৃষ্ঠের পানি (সারফোস ওয়াটার) ও ভূমধ্যের পানি (গ্রাউন্ড ওয়াটার)-এর সাথে মিশে বহুদূর ছড়িয়ে পড়বে। ফলে মাছ, জলজ প্রাণী, জলজ উদ্ভিদ ইত্যাদি হুমকির মুখে পড়বে। আশে পাশের নদ-নদী, খাল-বিল ছাড়াও এমনকি পুকুর, কুয়া, টিউবওয়েলের পানিও দূষণে আক্রান্ত হওয়ার বিপদ সৃষ্টি হবে। মানুষ ও সব ধরনের জীব-জন্তু, যারা এই পানির ওপর নির্ভরশীল, তারা সবাই বিপদাপন্ন হয়ে পড়বে। এসব রাসায়নিক ও জৈবিক দূষণ উপাদানের সাথে সাথে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্রের টারবাইন, কমপ্রেসার, পাম্প, কুলিং টাওয়ার, পরিবহনের যানবাহন, কনস্ট্রাকশন যন্ত্রপাতি ইত্যাদির কারণে আশেপাশের এলাকায় ব্যাপক শব্দ দূষণেরও সৃষ্টি হবে। রামপালের কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু রাখতে প্রচুর পানির সরবরাহ প্রয়োজন। পশুর নদীর মিঠা পানি পাম্প করে কারখানায় নিয়ে আসতে হবে। এর ফলে এই নদীর পানি প্রবাহ কমে যাবে যেটুকু, তা সমুদ্রের নোনা পানি এসে পূরণ করবে। পশুর নদীর পানিতে লবণাক্ততা বাড়বে। ট্রিটমেন্ট করে এই পানি দিয়ে পরিষ্কার পানির সবটুকু চাহিদা সামাল দেয়া যাবে না। বিদ্যুত্ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠাণ্ডা করার জন্য যে বিপুল পরিমাণ ঠাণ্ডা পানি দরকার সে জন্য গভীর নলকূপের সাহায্যে লবণাক্ততা মুক্ত বিশুদ্ধ পানি উত্তোলন করতে হবে। যন্ত্রপাতি শীতলায়তনের কাজে ব্যবহূত হওয়ায় এই পানি অনবরত গরম হতে থাকবে এবং বাষ্পায়িত হয়ে ও অন্যভাবে তার পরিমাণ কমতে থাকবে। এই কমে যাওয়া পানি পূরণ করার জন্য অনবরত make up water-এর প্রয়োজন হবে। গভীর নলকূপ দিয়ে পানি উত্তোলন অব্যাহতই রাখতে হবে। যে পরিমাণ নলকূপ বসিয়ে পানি উত্তোলন করতে হবে তাতে কয়েক কিলোমিটার জুড়ে ভূপৃষ্টের উপরের স্থরে পানিশূন্যতা দেখা দিবে। রামপালে পরিকল্পিত বিদ্যুত্ কেন্দ্রটি নির্মাণ করতে প্রতিদিন ১৩ হাজার টন কয়লা পোড়াতে হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ের জমজ প্রকল্প চালু করলে মোট ২৬ হাজার টন কয়লার প্রয়োজন হবে। বড় বড় জাহাজে করে এই কয়লা আনতে হবে। নাব্যতার কারণে কয়লা বহনকারী বড় জাহাজকে দক্ষিণের হিরণ পয়েন্ট হয়ে সুন্দরবনের মাঝ দিয়ে ৩০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আকরাম পয়েন্টে মাল খালাস করতে হবে। বছরে ৫৯ দিন বড় জাহাজকে কয়লা পরিবহন করতে হবে। আকরাম পয়েন্টের পরে বড় জাহাজ চলাচল করতে পারে না। তাই বড় জাহাজ থেকে কয়লা ছোট লাইটারেজ জাহাজ যোগে সুন্দরবনের মধ্যদিয়ে ৬৭ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে মংলা বন্দরে পৌঁছতে হবে। বছরে ২৩৬ দিন এসব লাইটারেজ জাহাজকে কয়লা পরিবহন করতে হবে। সুন্দরবনের নিস্তব্ধ পরিবেশ আলোড়িত হবে। বনের পশু-পাখি হতচকিত হবে। কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ থেকে কয়লা গুঁড়া, টুকরো কয়লা, তেল, জাহাজের দূষিত পানি সুন্দরবনের দূষণ ঘটাবে। এসবের ফলে চিরপরিচিত সুন্দরবন আর আগের সুন্দরবন থাকবে না। বিশ্বের ১৬০টি দেশের ১ হাজার ৯৭০টি প্রাকৃতিক জলাভূমি ‘রামসার এলাকা’ হিসেবে ঘোষিত। তার মধ্যে সুন্দরবন এবং টাঙ্গুয়ার হাওড় অন্তর্ভুক্ত আছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশ ‘রামসার এলাকা’ সমূহের প্রতিবেশ ব্যবস্থা সংরক্ষণের নিশ্চয়তা প্রদান করে আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। ইরানের রামসার শহরে এই চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কারণে এটিকে ‘রামসার চুক্তি’ বলা হয়। রামসার কনভেনশন কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সুন্দরবন এলাকায় কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন হলে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপন্ন হবে বলে উদ্বেগ জানিয়েছে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ বিশেষজ্ঞগণ সরজমিনে পর্যবেক্ষণসহ অনুসন্ধান ও গবেষণা করে বলেছেন যে রামপালে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করা হলে (১) সুন্দরবনের স্বাভাবিক চরিত্র বিনষ্ট হবে, তৈরি হবে অসংখ্য কয়লা ডিপো, শুরু হবে গাছ কাটা, আগুন লাগিয়ে বন পরিষ্কার করা, বাঘ-হরিণ-কুমির ইত্যাদি ধরা ও হত্যা করা। (২) কয়লা পোড়া গ্যাস ও ক্ষুদ্র কণিকার কারণে সুন্দরবনের জৈবিক পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, (৩) বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউজ গ্যাস নিঃসরণের কারণে ক্ষতিকর এসিড বৃষ্টি ঘটিয়ে বনাঞ্চলের সমূহ ক্ষতি সাধন করবে। পৃথিবীর কোনো দেশে আবাসিক এলাকা, কৃষি এলাকা, বনাঞ্চলের কাছাকাছি (১৫/২০ কিলোমিটারের মধ্যে) কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ উত্পাদন স্থাপনা নির্মাণের অনুমতি দেয়া হয় না। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম করার চেষ্টা হচ্ছে কার স্বার্থ রক্ষার জন্য? মানব বসতির ক্ষেত্রে যদি এই নীতি প্রযোজ্য হয় তাহলে বাঘসহ অন্যান্য বন্য প্রাণী বাঁচাতে তাদের বসতির ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করা হবে না কেন? যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ইতোমধ্যে বিলুপ্ত হওয়ার বিপদের মুখে, তার নিবাস, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, ধ্বংস করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে উদ্যত সরকার যখন একই নিঃশ্বাসে ‘বাঘ বাঁচাও’ শ্লোগান দিয়ে ঘটা করে কর্মসূচি পালন করে তখন সেই প্রতারণামূলক তামাশায় হাসির উদ্রেক না হয়ে পারে না। তবে এটি হেসে উড়িয়ে দেয়ার বিষয় নয়। বিদ্যুত্ উত্পাদনের এবং এমনকি কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের আরো পথ রয়েছে। সে সব প্রস্তাব সুনির্দিষ্টভাবে হাজির করা হয়েছে। সেগুলো অনুসরণ করা হোক। কিন্তু সুন্দরবন ধ্বংস করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করতে দেয়া যেতে পারে না। সুন্দরবন ও তার বাঘকে বাঁচাতে রামপালে কয়লা ভিত্তিক তাপ বিদ্যুত্ কেন্দ্র নির্মাণ প্রতিরোধ করতেই হবে। [তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুত্-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির প্রকাশনার সাহায্য নেয়া হয়েছে] লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন